ফল-ফসল
সাদেকুর রহমান
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৮ এএম
বাংলাদেশের মাটি খুব উর্বর। ভৌগোলিক অবস্থান হতে পারে এর অন্যতম কারণ। এই দেশের আবহাওয়া মৌসুমি ভাবাপন্ন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যেমন বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনি মাটির ক্ষেত্রেও ভিন্নতা রয়েছে। এই দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের মাটি দোআঁশ। কিছু এলাকার মাটি লালচে রঙের রয়েছে। মাটির ভিন্নতার কারণে এই দেশে নানা ধরনের ফসল উৎপাদিত হতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষির অবদান ১১.৩০ শতাংশ। কৃষির ৪টি উপ-খাত রয়েছে। এগুলো হলো : ১. শস্য ও শাকসবজি, ২.পশুপালন, ৩. বন ও ৪. মৎস্য। এগুলোর মধ্যে বেশি ভূমিকা রেখে চলেছে শস্য ও শাকসবজি খাত। এই খাতের অবদান হলো ৫.৩০ শতাংশ।
মানুষ এখন স্বাস্থ্য সচেতন। যেকোনো খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। বিশেষত, শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করার ব্যাপারে অনেকের অনাগ্রহ রয়েছে। এখন মানুষ মোটা হতে চায় না। বরং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে চায়। একজন মানুষের প্রতিদিন ২০০ গ্রামের মতো সবজি খাওয়া দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ মাত্র ৭০ গ্রাম সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। খাদ্য হিসেবে সবজির জনপ্রিয়তা প্রতিদিন বাড়ছে। এর কারণ হলো সবজির পুষ্টিমান নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। শাকসবজির মধ্যে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, লৌহ, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন রয়েছে। সবজি খাদ্য হজমের কার্যকারিতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে।
সাধারণত বাংলাদেশে সারা বছর শাকসবজি পাওয়া যায়। আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশের মাটিতে উৎপাদিত হওয়া শাকসবজিকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথাÑ ১। গ্রীষ্মকালীন সবজি ও ২। শীতকালীন সবজি। উৎপাদিত মোট সবজির মধ্যে ৩০ ভাগ উৎপাদিত হয় গ্রীষ্মকালে। গ্রীষ্মকালীন সবজিগুলো হলোÑ মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, শসা, চিচিঙ্গা, পটোল, করলা ইত্যাদি। এই সময় সবজির ক্ষেত্রে কম বৈচিত্র্য দেখা যায়। বৈচিত্র্য কম হলেও পরিমাণে বেশি পাওয়া যায়।
শীতকাল বাংলার মানুষের মনে উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। নানা ধরনের পিঠার উৎসব এই সময় দেখা যায়। শুধু তাই নয়, বাজারে দেখা মেলে নানান ধরনের শাকসবজির। ঘরের খাবারের পাতে সবজির বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের মোট সবজির ৭০ ভাগই উৎপাদিত হয় শীতকালে। কারণ শীতকালের আবহাওয়া সবজি চাষের জন্য অধিক উপযোগী। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য সবজিগুলো হলো ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শিম, মুলা ইত্যাদি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট সবজি উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ তালিকার শীর্ষে আছে চীন।
দেশে এখন প্রায় ৯৫ ধরনের সবজি চাষ হয়। এগুলো চাষ হয় শূন্য দশমিক ৯২ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে।। জনপ্রিয় সবজির মধ্যে আছে বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, কুমড়া, শসা, মুলা, শিম, গাজর, পালংশাক, লালশাক, বরবটি, সজনে ও কচু।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সবজি চাষ বেশি হয়ে থাকে। সবজি চাষের জন্য খুব বেশি জায়গায় দরকার হয় না। অল্প জায়গাতেই অনেক সবজি উৎপাদিত হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় বাড়ির উঠানে শাকসবজি চাষ করা হয়। বিশেষ করে শীতকালে শিম, লাউÑ এগুলোর বীজ রোপণ করা হয়। অনেকে বাড়ির উঠানে লালশাক, পুঁইশাক, ডাটা শাকের চাষও করে থাকেন। অনেকেরই বাগান করার শখ রয়েছে। অনেকেই বাগানে এইসব সবজি চাষ করে থাকে। মাটির উর্বরতার কারণে আলাদা করে সার, কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না।
আমাদের দেশে এখনও শাকসবজি চাষ বাণিজ্যিকভাবে করা হয় না। সময় পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও এখন বাণিজ্যিকভাবে শাকসবজি চাষের মাত্রা বাড়তেছে। এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাই কৃষি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষই বাণিজ্যিকভাবে শাকসবজি চাষ করতে আগ্রহী। ধানের তুলনায় সবজি চাষ অধিক লাভজনক। সবজি হলো নগদ ফসল। অল্প সময়ের মধ্যেই এটির পিছনের বিনিয়োগ উঠে আসে। কৃষিপ্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেক উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রচুর শাকসবজি উৎপাদন করা যায়।
দেশে অনেক আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। কিন্তু এগুলোর সঠিক ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৪৫ ভাগ জমির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। মাটির উর্বরতা শক্তির ভিন্নতার জন্য একেক জেলায় একেক সবজি বেশি হয়ে থাকে। জেলা হিসেবে যশোর জেলাতে সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদিত হয়। একসময় সবজি শুধু একটি মৌসুমে হতো। এখন বছরব্যাপী হয়ে থাকে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, নরসিংদীতে সবজি ভালো চাষ হয়।
দেশের মানুষের সবজির চাহিদা কম। প্রতিবছরই দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। আমাদের দেশে প্রায় ৯৫ ধরনের সবজি চাষ করা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে প্রধান সবজির সংখ্যা ৩০-৩৫টি। দেশের আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হলো ৮৮.২৯ হেক্টর। বাংলাদেশের শাকসবজির উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষিজমির ব্যবহার বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম রপ্তানি করা হয় যুক্তরাজ্যে। তখন রপ্তানি করা হয় ১ হাজার ৭০০ ডলারের পণ্য। ইপিবির তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সবজি রপ্তানি হয় ১১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি কমে হয়েছে ৮ কোটি ১১ লাখ ডলারে। ইপিবি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪০টি দেশে সবজি রপ্তানি করে থাকে। কিন্তু সবজির মূল বাজার হলো মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকা। বাংলাদেশ হতে ৬টি দেশে শাকসবজি বেশি রপ্তানি করা হয়ে থাকে। এই দেশগুলো হলো : সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, আমেরিকা, মালয়েশিয়া ও কাতার। এ ছাড়াও ইতালি, বাহরাইন, সুইডেন, জার্মানি, কানাডাতে সবজি রপ্তানি করা হয়। তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সমুদ্রপথে সবজি রপ্তানির পরিমাণ হলো ৫৮ হাজার ৭৬৬ মেট্রিক টন। আলুর পরিমাণ সব থেকে বেশি। এর পরিমাণ হলো ৪০ হাজার ৫৪৩ টন। তাজা সবজির পরিমাণ ১৬ হাজার ৯৫৯ টন।
সবজি হিসেবে বাংলাদেশ আলু বেশি রপ্তানি করে থাকে। এ ছাড়াও মিষ্টি কুমড়া, মরিচ, ফুলকপি, টমেটো, কচু, শিম, কাঁকরোল, পটোল, মুখিকচু রপ্তানি করা হয়। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগ নিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী রপ্তানিকৃত তাজা সবজির মধ্যে বাঁধাকপি ছিল ১৫,৭০৬.২৮ মেট্রিক টন; মিষ্টিকুমড়া ৭০০.৫০০ টন, মরিচ ২৭৮.৯১৫ টন, টমেটো ১৬৭.৬৯৬ টন, ফুলকপি ২৩.৫২০ টন, কচু ৫৬.০১০ টন এবং অন্যান্য সবজি ২৫.৯৬ টন।
বিদেশে বাংলাদেশের সবজির চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলোতে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশিয়ার রেস্তোরাঁগুলোতে সবজির চাহিদা বেশি। জাপান ও আমেরিকার মানুষ প্রতিদিন যথাক্রমে ৩০০ ও ৪০০ গ্রাম সবজি খায়। এসব দেশেও সবজি রপ্তানির বাজার তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না। আমাদের দেশে চাষের সময় অতিরিক্ত পরিমাণে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এর ফলে সবজির গুণগতমান কমে যায়। শুধু তাই নয়, পুষ্টির পরিমাণও কমে যায়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। এই কারণে অনেক দেশ পণ্য নিতে আগ্রহী না। দেশে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেই। এসব সবজি পচনশীল দ্রব্য। যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হয়, তাহলে অল্প কয়দিনের মধ্যেই পচে যায়। সবজি সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিংয়ের জন্য উপকরণের ঘাটতি রয়েছে।
শাকসবজির উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষিজমির ব্যবহার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। উৎপাদন খরচের কারণেও অনেক সময় রপ্তানি করা সম্ভব হয় না। সবজি বহনের ক্ষেত্রে পরিবহন হিসেবে ব্যবহার করা হয় কার্গো বিমান ও উড়োজাহাজ। বিমানের ভাড়া বেড়ে গেলে রপ্তানি কমে যায়। আমাদের বিশেষ কোনো এয়ার কার্গো উড়োজাহাজ নেই। পরিবহন খরচের সঙ্গে রপ্তানির সম্পর্ক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ব্যবসায়ী ভারত কিংবা পাকিস্তান হতে সবজি আমদানি করে থাকেন। কেননা এতে খরচ কম হয়। তাই অনেকেই রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে অনাগ্রহী হয়।
বিদেশে আমাদের দেশের অর্গানিক সবজির অনেক চাহিদা রয়েছে। তাই শুধু জাহাজ দিয়ে পণ্য পরিবহন না করে স্থলবন্দরের মাধ্যমেও করা যেতে পারে। কিছুদিন আগে নেপালে আলু রপ্তানি করা হয়েছে। এসি কন্টেইনার ব্যবহার করে সমুদ্রপথে সবজি রপ্তানি করা যায়।ইদানিং দেশের অনেক জায়গায় এখন অর্গানিক সবজি চাষ শুরু হয়েছে। এগুলোর ব্যবহার ঠিকভাবে করতে পারলে দেশের রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো যাবে।
সাদেকুর রহমান
গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড