তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৪ এএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪৯ এএম
সুপ্রিম কোর্ট
বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করেছেন মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছেন দেশের সর্বোচ্চ এই আদালত। ২০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার এই যুগান্তকারী রায়ের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার পথে আর কোনো বাধা রইল না। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলেও এখনই তা কার্যকর হচ্ছে না। চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে তা প্রয়োগ হতে পারে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনকে সংবিধান পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করে ১৪ বছর আগে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক অবসরে থাকা অবস্থায় এ রকম বিতর্কিত রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর এবং এ-সংক্রান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ বাতিলে সর্বসম্মতি দেন।
বলে রাখা ভালো, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উচ্চ আদালতে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিষয়টি উঠে আসে। চলতি বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের মোট ১০ দিন এ নিয়ে শুনানি হয়। এতে রিটকারীর আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও সংশ্লিষ্টরা। এর আগে গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, প্রায় তিন দশক আগে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একসময় ছিল জাতির আস্থার প্রতীক। জনগণের দীর্ঘ আন্দোলন, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে এ ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে। পরে সাংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিগত সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করলে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক, সংঘাত এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। সেই থেকে নির্বাচন ঘিরে অবিশ্বাস বাড়ছে, বিরোধী-অনুগত বিভাজন তীব্র হচ্ছে, তখন ফের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি জোরালো হয়।
আসলে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নির্বাচনে নিরপেক্ষতা। একটি দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো নির্বাচন, যেখানে সব দল সমান সুযোগ পায়, প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে এবং ভোটার নিরাপদে ভোট দিতে পারেন। বাস্তবতায় দেখা গেছে, ক্ষমতাধর দলের অধীনে নির্বাচন হলে প্রশাসন, পুলিশ, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাÑ সবখানেই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। ভোটারদের মনে প্রশ্ন থাকেÑ ভোট কি ঠিকমতো গণনা হবে? দলীয় প্রভাব কি ফলাফলকে প্রভাবিত করবে? এই পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা জনগণের মনে এক ধরনের আস্থার বর্ম তৈরি করেছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এই ব্যবস্থা বাতিল করে। ফলে তারা ভোটারবিহীন, দিনের ভোট রাতে এবং আমি ও ডামির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়। সেই নির্বাচনগুলোতে ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে, হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, যা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে। ফলে ভোট দেওয়ার উপযুক্ত হলেও ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি দেশের কোটি কোটি মানুষ।
আমরা মনে করি, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফের চালু হওয়া মানে কেবল একটি আইন বা কাঠামো পুনর্বহাল করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে একদল অন্যদলকে বিশ্বাস করতে পারে না; প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক থামে না; রাজনৈতিক উত্তেজনা কখনোই স্থায়ী শান্তির দিকে যায় না। তাই একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধারণা আজও প্রাসঙ্গিক।
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন সমঝোতা, সংলাপ ও আস্থার পরিবেশ। যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব শক্তিতে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে না পারে, তবে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল বা সমতুল্য নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন কাঠামোই হতে পারে একটি কার্যকর সমাধান। দিনের শেষে, গণতন্ত্র টিকে থাকে জনগণের আস্থায়। সেই আস্থা ফের প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যে সিদ্ধান্ত দেশকে শান্তি, স্থিতি ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এগিয়ে নেবে।