× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাবিপ্রবির দ্বিতীয় সমাবর্তন ২০২৫

সবাইকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও সংস্কারে অংশীজন হতে হবে

অধ্যাপক ড. মো. এনামউল্যা

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৪১ এএম

সবাইকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও সংস্কারে অংশীজন হতে হবে

উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) দ্বিতীয় সমাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়। ২২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে হাবিপ্রবির দ্বিতীয় সমাবর্তন আয়োজনের সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করার জন্য ৮ হাজার ৩৩ জন গ্র্যাজুয়েট, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন। সমাবর্তন হলো একাডেমিক অভিযাত্রার পূর্ণতাপ্রাপ্তির এক মাহেন্দ্রক্ষণ। আমি সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, আমন্ত্রিত অতিথি, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আমি দায়িত্ব গ্রহণ করি। সে সময় খুব দ্রুত সময়ে দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবার আন্তরিক এবং অব্যাহত প্রচেষ্টায় আমরা সমাবর্তন আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছি। এ জন্য আমি সকল অংশীজনকে ধন্যবাদ জানাই এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি গত জুলাই-আগস্ট ২০২৪ আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের আশু রোগ আরোগ্য লাভ কামনা করছি। একই সঙ্গে শহীদদের আত্মদানের চেতনাকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠান নিয়মিত একাডেমিক অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে গণ্য। জানা যায়, ইউরোপ-লতিন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় প্রতি বছরই সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। অবশ্য সেসব সমাবর্তনে চ্যান্সেলরের উপস্থিতি এবং আমাদের মতো এতো আড়ম্বরপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় থাকে না। চ্যান্সেলর একটি শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান, তা গ্র্যাজুয়েটদের পড়ে শোনানো হয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় হাবিপ্রবির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলর নিজে না এসে তার প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা উপদেষ্টাকে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন। সমাবর্তন আয়োজনের কালপর্বের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় যে, ‘সমাবর্তন ইতিহাস অতি দীর্ঘ এবং ভিন্ন মত দ্বারা প্রভাবিত। ১৫৭৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এমএ সম্পূর্ণ করা শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দেওয়ার জন্য ডেকেছিল। বলা হয়ে থাকে, সেই থেকে পৃথিবীব্যাপী সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি পেয়ে আসছে। ইতিহাস পাঠে আরও জানা যায়, তারও বহু পূর্বে যখন যাজকগণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন, তখনও সমাবর্তন শব্দটির সন্ধান পাওয়া যায়। সমাবর্তনের গাউন এবং এর সঙ্গে হ্যাট ও টাসের সম্পর্কে জানা যায়, ‘দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ সহস্রাব্দে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন গির্জার যাজকমণ্ডলী। তখন ক্লাস বসত গির্জায় কিংবা পার্শ্ববর্তী কোনো ইমারতে। ইতিহাসবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের শহরের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে দেখানোর জন্য গাউন আর হুডস প্রবর্তন করা হয়েছিল। কারও মতে, সেই সময় কেন্দ্রীয় তাপ ব্যবস্থা ছিল না, আর তাই শিক্ষার্থীদের উষ্ণ রাখার জন্য গাউন ও হ্যাট প্রচলন করা হয়। সমাবর্তনে মাথায় থাকা হ্যাট হচ্ছে কিছু একটা অর্জনের প্রতীক। গ্র্যাজুয়েটদের অনেক পরিশ্রম করে ডিগ্রি পাওয়ার নিদর্শন এই হ্যাট। আবার পিএইডি ও স্নাতকোত্তরের বেলায় টাসেলটি ডিগ্রি প্রদানের পুরো সময় বাঁদিকে এবং ডিগ্রিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকে ঘোরাতে হয়। এর অর্থ হলো ডিগ্রিধারী একটা নতুন স্তরে প্রবেশ করলেন। হ্যাটটি বর্গাকৃতি হওয়ার কারণ হিসেবে এটা বই নির্দেশ করে, যা কারও কারও মতে মধ্যযুগের যাজকদের প্রতীকী টুপি।’ সমাবর্তনের কালপর্বের ইতিহাসে আরও জানা যায়, সমাবর্তন এ অঞ্চলের হাজারো বছরের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশের সঙ্গে জড়িত। বৈদিক যুগে এর প্রচলন শুরু। সেই প্রাচীন ঐতিহ্য এখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উপাধি প্রদানের মাধ্যমে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলছে। ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক সমাবর্তনের আচার বা সংস্কৃতি অক্সফোর্ড বা ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়েরর প্রভাবপ্রসূত হলেও মূল ভারতের বিহার অন্তর্গত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত শতকে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। 

সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা এই উৎসবকে রঙিন ও প্রান্তবন্ত করে তোলে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উচ্চশিক্ষা সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। মানুষের ভাবগত সৃষ্টিকর্ম হিসেবে সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে নবীন স্নাতকবৃন্দ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘অনুজ-অগ্রজকে মান্য করা, সমাজিক মূল্যবোধ অনুসরণ করা এবং যে স্থানে যে অধিষ্ঠিত, সেই স্থান অনুযায়ী দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করার’Ñ কনফুসিয়াসের মানব দর্শনের উপদেশ অনুশীলন শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি প্রত্যাশিত। সমাবর্তনে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ লাভ করেন, তাদের কাছে ন্যায়-নীতি ও যুক্তির অনুশীলনও কাম্য। প্রাচীন ভারতীয় ভাববাদী দার্শনিক গৌতম বুদ্ধ এবং গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ন্যায় ও যুক্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়-যুক্তির অনুশীলনও শিক্ষার্থীদের কাছে প্রত্যাশিত। আচার-আচরণে পরিমিত ও ঔচিত্যবোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনুকরণীয় হবেন, সেটাও সকলে প্রত্যাশা করেন। এ কথা সত্য যে, উচ্চশিক্ষা সম্পন্নকারীদের আচার-আচরণে এ প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে। স্মর্তব্য যে, সমাবর্তনের গাউন একজন শিক্ষার্থীর জন্য অনেক পরিশ্রমলব্ধ পরিধেয় বস্ত্র। এর যথাযথ সম্মান ধরে রাখার ওপর দায়িত্বশীল থাকা বাঞ্ছনীয়। ‘মানুষ যতোই কর্ম করেছে, ততোই সে আপনার ভেতরকার অদৃশ্যকে দৃশ্য করে তুলেছে, ততোই সে আপনার সুদূরবর্তী অনাগতকে এগিয়ে নিয়ে আসছে।’ বরীন্দ্রনাথের এ বাণী আমাদের এগিয়ে যাওয়ার যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। এ কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই যে, আমাদের শিক্ষার্থীরা মুক্তচিন্তা স্বাধীনতার চর্চায় অকুতোভয় হবে। দৃশ্যত কিংবা অদৃশ্য কোনো কালো শক্তির কাছে আমাদের শিক্ষার্থী নিজেদের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেবে না। ‘বাহিরের স্বাধীনতা গিয়াছে বলিয়া অন্তরের স্বাধীনতাকেও আমরা যেন বিসর্জন না দিই’Ñ কাজী নজরুল ইসলামের এ অমর বাণী হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আমি শিক্ষার্থীদের সমাজের জন্য জনহিতকর এবং প্রশংসনীয় কাজে মনোনিবেশ আহ্বান জানাই। আমি অত্যন্ত আশাবাদীÑ সমাবর্তনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণে ও পূরণে নতুন করে শপথ নেবেন। 

হাবিপ্রবির ৮টি অনুষদের অধীনে ৪৫টি বিভাগ প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী যুগোপযোগী এবং আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করছেন। এই বিভাগগুলোর শিক্ষা-গবেষণার মান অত্যন্ত উচ্চমানের এবং প্রশংসনীয়। বিশ্বসেরা টুপারসেন্ট গবেষকের তালিকায় শিক্ষক-গবেষকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও গৌরব বৃদ্ধি করেছে। হাবিপ্রবিকে নিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ স্বপ্ন দেখেন। তারা আশা করেন আধুনিক শিক্ষা এবং জ্ঞান অন্বেষণে এ বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দেবে। হাবিপ্রবিকে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং দেশসেরা হিসেবে আবির্ভূত করার লক্ষ্যে বর্তমান প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের বিশ্বের যোগ্যমানব হিসেবে গড়ে তোলা, দেশ-জাতির কল্যাণে উচ্চমানের গবেষক তৈরি করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে আমার নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন অবিচল এবং নিরলসভাবে কাজ করছে। এক্ষেত্রে আমি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

আমি এই সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও গবেষককে সমাজের চারপাশের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সমতা, বৈষম্য ইত্যাদির বিষয়ে খোঁজখবর রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে বিপ্লবোত্তর একটি সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিযুক্ত আছে। সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান যুগে প্রতিনিয়ত নানা বিষয়ে গুজবে ডালপালা মেলছে। পতিত স্বৈরশাসকের ফিরে আসা এবং প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কার কথাও কেউ কেউ ভাবছেন। আমি ছাত্র-শিক্ষক এবং জনসাধারণকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে বলব, যাতে প্রতিবিপ্লবের কুশীলবরা মাথা তুলতে না পারে। আমি একই সঙ্গে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারে অংশীজন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি চাই শিক্ষার্থীরা নিজেকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চায় সম্পৃক্ত থাকুক। প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা ও মানবিক মূল্যবোধকে অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে অচিরেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (হাকসু) নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। পরিশেষে বলতে চাই, সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। তারা অর্জিত জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞায় কর্ম প্রতিষ্ঠানে শুধু নিজের সুনাম নয়, দেশ সেবা, বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেনÑ এ আমাদের প্রত্যাশা।


অধ্যাপক ড. মো. এনামউল্যা

উপাচার্য, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা