প্রযুক্তি
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১৬ এএম
কানাডায় আমার একজন বিশেষ পরিচিত ব্যক্তি তাদের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ থেকে লোগো তৈরি করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, যাতে করে বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে একটি লোগো পাওয়া যায়। কেননা কানাডায় এরকম সেবা নিতে গেলে ভালো অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশে আমার একজন পরিচিত ব্যক্তি আছেন, যিনি নামকরা একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের ফ্যাকাল্টি মেম্বার। তিনি এই কাজে যথেষ্ট পারদর্শী এবং আইটি বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। আমি তাকে বিষয়টি বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এবং যত্ন সহকারে একটু সময় নিয়ে একটি সুন্দর এবং অর্থবহ লোগো তৈরি করে দিয়েছিলেন, যা সবাই পছন্দ করেছে। এর বিনিময়ে আমি যখন তাকে বাংলাদেশের মান অনুযায়ী পারিতোষিক দিতে চেয়েছি, তিনি আর সেটি গ্রহণ করেননি। এই ধরনের বিনামূল্যে বা সৌজন্য সেবা একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। অন্য কোথাও, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে তো একেবারেই সম্ভব নয়। এখানে যেকোনো কিছু পেতে গেলে নির্ধারিত মূল্য দিতে হবে।
অবশ্য বাজারজাতকরণের কৌশল হিসেবে মাঝেমধ্যেই বিনামূল্যে বা কম মূল্যে পণ্য বা সেবা দিয়ে থাকে শুধু বাজার ধরার উদ্দেশ্যে। যেমন, আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট, ম্যাকডোনাল্ড কানাডার কফির বাজার কব্জা করার জন্য মাঝেমধ্যেই এক সপ্তাহের জন্য গ্রাহকদের বিনামূল্যে কফি প্রদান করত। এভাবে বিনামূল্যে কফি খাইয়ে বিশাল সংখ্যার গ্রাহকদের ম্যাকডোনাল্ড কফির প্রতি আকৃষ্ট করে কানাডার কফির বাজার ধরেছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে আমেরিকা-কানাডায় প্রতিটা পণ্যসামগ্রীর মূল্য ঊর্ধ্বমুখী এবং কোনোকিছুরই দাম কমার লক্ষণ নেই। ঠিক এই সময়ে ম্যাকডোনাল্ড তাদের এক কাপ কফির দাম দুই ডলার থেকে কমিয়ে এক ডলার করে দিয়েছে, শুধুমাত্র মার্কেটিং কৌশল হিসেবে। এরকম মার্কেটিং কৌশল ব্যতীত এসব দেশে কোনোকিছু বিনামূল্যে বা কম মূল্যে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিষয়টি আমার লেখার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক না হলেও পাঠকদের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করলাম।
যাহোক আমার পরিচিত অন্য আরেকজনের প্রতিষ্ঠানের জন্য লোগো তৈরির প্রয়োজন হয় এবং এই লোগোর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে না করতেই একজন একটি চমৎকার লোগো মুহূর্তের মধ্যে তৈরি করে আমাদের সবার কাছে ই-মেইলে পাঠিয়ে দেয়। লোগোটি এত চমৎকার এবং অর্থবহ হয়েছিল যে সবাই একবাক্যে সেটি গ্রহণও করেছে। আমি যখন জানতে চাইলাম যে এত দ্রুত চমৎকার একটি লোগো কীভাবে তৈরি করলেন। উত্তরে তিনি জানালেন যে এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে করেছেন)। অর্থাৎ, যারা এই লোগো তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তারা এআই প্রচলনের কারণে বেকার হয়ে যাবেন।
এভাবেই কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কারণে অনেক চাকরি বিলীন হয়ে যেতে শুরু করেছে। এআই ব্যবহার নিয়ে আলোচনার শুরু থেকে যে বিষয়টি সবার আশঙ্কার মধ্যে ছিল, তা হচ্ছে এই প্রযুক্তি ব্যাপক চাকরি হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াবে কি না। অনেকেই তখন বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সব সময় বলার চেষ্টা করেছেন যে এটি একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মাত্র। চাকরির ধরনের পরিবর্তন হলেও ব্যাপক চাকরি হারানোর মতো ঘটনা ঘটবে না। এমনকি যারা এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত, তারাও বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। চাকরি হারানোর সরাসরি উত্তর না দিয়ে নানান কৌশলে কথা বলেছেন, যাতে করে এই প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে কোনোরকম সমস্যা না হয়। এখন যখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস এবং অন্যান্য সংস্থায় এআই ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে, তখন চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটছে উল্লেখযোগ্য হারে। এখন সবাই এ ব্যাপের মুখ খুলছেন এবং স্বীকার করতে শুরু করেছেন যে এই প্রযুক্তি চাকরির বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
এআই প্রযুক্তি পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহারের আগে যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং করপোরেট অফিসে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে থাকে, তখনই কিছু কিছু চাকরি চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এখন তো অনেকেই, বিশেষ করে বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট অফিসে এআই ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে বিস্তৃত পরিসরে। এর ফলে সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাপক চাকরি যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি, মাইক্রোসফট গত জুলাই মাসে তাদের ৯ হাজার কর্মকর্তা ছাঁটাই করেছে এবং এর আগে মে মাসে ছাঁটাই করেছিল আরও ৬ হাজার কর্মকর্তা। বিখ্যাত অডিট ফার্ম প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার সম্প্রতি ১৫০ জন পেশাদার কর্মকর্তা ছাঁটাই করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে খুব শিগগিরই অডিট ফার্মগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তার চাকরি চলে যেতে পারে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত অক্টোবর মাসে আমেরিকার বিভিন্ন কোম্পানি প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই করেছে। এ ছাড়া আমেরিকা-কানাডার বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে।
এসব চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটছে মূলত অফিসিয়াল জবের ক্ষেত্রে, যাকে এখানকার পরিভাষায় হোয়াইট কালার জব বলা হয়ে থাকে। মূলত করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্যাক অফিস বা প্রধান কার্যালয়ে, সাপোর্ট সিস্টেম এবং আইটি সেক্টরে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, কম্পিউটার প্রযুক্তিতে শিক্ষিত তরুণ সমাজ। তারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করেছে একটি ভালো চাকরি পাবে এবং ভালো উপার্জন করতে পারবে, সেই আশায়। অনেকে সেটা শুরুও করেছিল। পরিচিত যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের অধিকাংশের ছেলেমেয়ে কম্পিউটার নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করে আইটি ফার্মে ভালো বেতনের চাকরি করছে। এখন তাদের অনেকের হয়তো চাকরি চলে যেতে পারে এবং যারা আগামীতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হবে, তাদেরও চাকরি পাওয়ার কাজটা বেশ কঠিন হয়ে যাবে। কেননা এসব কম্পিউটার ইঞ্জিনার যে ধরনের কাজ করত, যেমন- কিছু কোডিং, মডিউল তৈরি, ডিবাগিং বা এরকম আরও কিছু কাজ, যেগুলো এখন এআই দিয়ে খুব অনায়াসেই করে ফেলতে পারবে এবং করছেও।
শুরুর দিকে এআই ব্যবহারের কারণে অফিসিয়াল চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটলেও, এর প্রভাব অন্যান্য বিভাগেও পড়বে এবং কর্মক্ষেত্রের সর্বত্রই এআইয়ের প্রভাবে চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এআইয়ের প্রভাব যদি অন্যান্য সাধারণ কর্মক্ষেত্রেও পড়তে থাকে। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানই সাধারণ শ্রমের কাজের জন্য এআই ব্যবহার করতে শুরু করেছে। ফলে এই সাধারণ শ্রমনির্ভর কর্মক্ষেত্রেও যদি এআইয়ের প্রভাবে চাকরিচ্যুতি ঘটে, তাহলে পুরো কর্মসংস্থানই এক সংকটের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। বিষয়টি অনেকের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগ এবং শঙ্কার। এমনকি ব্যাপক চাকরিচ্যুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে। এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান তাড়াহুড়া না করে ধাপে ধাপে এআই প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রথমে এআই এজেন্ট নামে ডিজিটাল কর্মী চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এসব ডিজিটাল কর্মী মানুষের পাশাপাশি যুগপৎ কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং চেইন অব কমান্ড মেনে চলার বিষয়। এভাবে ডিজিটাল কর্মী এবং হিউম্যান কর্মী পাশাপাশি চালু রাখার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা হবে। এর মাধ্যমে দুটো উদ্দেশ্য অর্জন হবে। প্রথমত, যেসব কর্মী এআই ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠবে তাদের কাছ থেকে ভালো কর্মফল বা ডেলিভারি পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, যেসব কর্মী এই প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী হবে না, তারা খুব সহজেই অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এক পর্যায়ে চাকরি থেকে বিদায় করা হবে। তা ছাড়া এভাবে সময় নিয়ে ধাপে ধাপে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মানসিকভবে প্রস্তুত করে তোলা হবে যে, তাদের চাকরি এআই ব্যবহারের কারণে চলে যেতে পারে।
এসব বিষয় বিবেচনা করেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে যারা এআই ব্যবহারে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, তারা তাদের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের এইচআর বিভাগ এখন সবেচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। তারা বিজিনেজ লাইন, আইটি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করছে, শুধু প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারানোর আতঙ্ক সৃষ্টি না করে এআই প্রবর্তনের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিশেষ টিম বা বিভাগ স্থাপন করেছে বিষয়টি দেখভাল করার জন্য। অনেকে তাদের কর্মীদের এই মর্মে আশ্বস্ত করছেন যে, এআই প্রযুক্তি দেখে আতঙ্কিত না হয়ে, বরং এই আধুনিক প্রযুক্তিটি কীভাবে রপ্ত করা যায়, সেই প্রচেষ্টা থাকা উচিত। তারা আরও বলার চেষ্টা করছেন যে, এআই হচ্ছে প্রযুক্তি, যা মানুষকে সহযোগিতা করবে, প্রতিস্থাপন নয়। এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, ‘এআই হচ্ছে টুল, আর মানুষ হচ্ছে শক্তি’। যেভাবেই সান্ত্বনা দেওয়া হোক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে যে, এআই প্রয়োগের ফলে কর্মসংস্থানে আমূল পরিবর্তন আসতে বাধ্য। এই প্রযুক্তি শুরুর দিকেই যে মাত্রার চাকরিচ্যুতি ঘটছে, তাতে এই প্রযুক্তি যখন পূর্ণমাত্রায় শুরু হবে তখন তো এআই চাকরির বাজারে একেবারে ধ্স নামিয়ে ছাড়বে, যার আলামত ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা