জনপ্রতিনিধি
সাঈদ বারী
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১২ এএম
বাংলাদেশে প্রতিবারই সাধারণ নির্বাচনের আগে শুরু হয় প্রার্থী বাছাই নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ও উদ্বেগ। রাজনৈতিক দলগুলো তখন সাধ্যমতো চেষ্টা করে সম্ভাব্য জয়ী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে। কিন্তু এই জয়ী হওয়ার হিসাবের মধ্যে কি সত্যিই জনগণের চাওয়া, নৈতিকতা, যোগ্যতা ও আদর্শ জায়গা পায়? না কি এখনও টিকে আছে সেই পুরনো ধারাÑ যেখানে প্রার্থী মানেই শক্তিশালী, অর্থবান, ক্ষমতাধর কেউ, যিনি ‘কেন্দ্র দখল’ করতে পারেন?
যথাযথ প্রার্থী নির্বাচনই দলের সাফল্যের চাবিকাঠিÑ এটা সবাই জানে, কিন্তু তা মানতে চায় খুব কম দল। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনও দেখা যায়, যিনি দলের ঘনিষ্ঠ, যার হাতে প্রচুর অর্থ, যিনি স্থানীয়ভাবে ভয়-ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন তিনিই অনেক সময় ‘যোগ্য’ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হন। অথচ প্রার্থী নির্বাচনের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের আস্থা অর্জন করা, যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়া এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া।
একজন প্রার্থী কেমন হলে তাকে ভোটাররা পছন্দ করবেন? এলাকার মানুষ চায় এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি সহজ-সরল, কাছে টানেন, কথা শোনেন, তাদের দুঃখ-সুখে পাশে থাকেন। তারা চায় এমন মানুষ, যিনি এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাস্তব চিন্তা করেন। কিন্তু এখানেই এক বড় ভুল ধারণা কাজ করেÑ অনেকে এখনও মনে করেন, সংসদ সদস্যের কাজ হলো স্থানীয় রাস্তা বানানো, ড্রেন পরিষ্কার করা, স্কুলে টিন দেওয়া। অথচ সংসদ সদস্যের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়া এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই মৌলিক ধারণাটি এখনও অনেক ভোটার, প্রার্থী এমনকি রাজনৈতিক দল পর্যন্ত পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেনি।
যখন দল মনোনয়ন দেয়, তখন সাধারণত কিছু বিষয় বিবেচনা করা হয়Ñ দলের প্রতি আনুগত্য, পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য। কিন্তু এর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, সেটি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। শুধু দলের প্রতি আনুগত্য থাকলেই প্রার্থী যোগ্য হয়ে যান না, পারিবারিক ঐতিহ্য থাকলেই তিনি জনগণের আস্থা পাবেন না। একজন প্রার্থীর দরকার নৈতিক দৃঢ়তা, জনসেবার মানসিকতা, আধুনিক প্রশাসনিক ধারণা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন চিন্তা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। সংসদ এমন একটি জায়গা যেখানে আইন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা হয়। সেখানে একজন অদক্ষ বা অশিক্ষিত প্রতিনিধি কেবল নিজের দলীয় নির্দেশে ভোট দেবেন, কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থ বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। তাই শিক্ষিত, চিন্তাশীল ও যুক্তিনির্ভর মানুষদের সংসদে প্রয়োজন, যারা দলীয় অবস্থান মেনে চলবেন ঠিকই, কিন্তু নিজের বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বজায় রাখবেন।
অর্থবিত্ত ও পেশিশক্তি- এই দুই বিষয়ই বহু বছর ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অনেক সময় এমন প্রার্থীরা মনোনয়ন পান যাদের জনসম্পৃক্ততা খুব কম, কিন্তু তাদের কাছে থাকে প্রচারণার জন্য বিপুল অর্থ বা এলাকায় একধরনের প্রভাবশালী ‘ক্লাউট’। এতে দলের সুনাম যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি জনগণের রাজনীতির প্রতি আস্থা কমে যায়। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। জনগণ সচেতন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, সততা ও নৈতিকতা যাচাই করতে পারেন। তাই দলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑ সত্যিকার অর্থে সৎ, যোগ্য, পরিশ্রমী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষকে মনোনয়ন দেওয়া।
ভোটারদেরও এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। শুধু দলীয় প্রতীক দেখে ভোট দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন প্রার্থী কতটা কর্মঠ, কতটা শিক্ষিত, কতটা মানবিক এবং দেশের উন্নয়ন নিয়ে তার চিন্তাভাবনা কতটা গভীরÑ এই প্রশ্নগুলো ভোটের দিন আমাদের বিবেচনায় আসা জরুরি। গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভোটার দল নয়, মানুষকে বেছে নেবে।
জুলাইয়ের আন্দোলন ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক জাগরণের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো সবকিছু পাল্টে যাবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে চেতনা সৃষ্টি করেছিল, তা যদি এই নির্বাচনে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে এত ত্যাগ, এত রক্ত, এত সময়- সবই বৃথা যাবে। যদি আবারও সেই পুরনো ধারা চলে, অর্থ-শক্তির দাপট থাকে, আদর্শের পরিবর্তে সুযোগবাদিতার জয় হয় তাহলে শহীদদের আত্মার কাছে আমরা কী উত্তর দেব?
আমরা চাই এমন সংসদ সদস্য, যিনি আইন জানেন, মানুষের পাশে থাকেন, দুর্নীতিমুক্ত, শিক্ষিত ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। যিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে কথা বলতে পারেন। যিনি জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে দাঁড়াবেন, শুধু দলের নয়, সবার কণ্ঠ হয়ে।
আসন্ন সংসদ নির্বাচন তাই শুধু ভোটের লড়াই নয়, এটি এক নৈতিক ও ঐতিহাসিক পরীক্ষা। আমাদের দলগুলো কি সত্যিই পরিবর্তিত হতে পারবে? তারা কি জন-আস্থার ভিত্তিতে প্রার্থী বেছে নেবে? আর আমরা, সাধারণ ভোটাররা, কি প্রতীকের বাইরে গিয়ে যোগ্য মানুষকে বেছে নিতে পারব? যদি পারি, তবে এই নির্বাচন হতে পারে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা। আর যদি না পারি, তবে আবারও সেই পুরনো চক্রেই আমরা ঘুরে মরবÑ যেখানে জয়ী হয় ক্ষমতা, আর পরাজিত হয় জনগণ।
এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের, দায়িত্বশীল রাজনীতির, নৈতিক নেতৃত্বের। আসন্ন নির্বাচন হোক- সেই পরিবর্তনের সূচনা যেখানে প্রাধান্য পাবে যোগ্যতা, সততা ও জনসেবার মানসিকতা। প্রতীকের নয়, প্রার্থীর জয় হোক; ক্ষমতার নয়, নীতির জয় হোক; আর জনগণের কাছে ফিরুক রাজনীতির মর্যাদা।
সাঈদ বারী
প্রকাশক ও কলাম লেখক