উচ্চ রক্তচাপ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪৬ পিএম
অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিশ্বে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ ও মৃত্যুঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, খাবারে অতিরিক্ত লবণ এবং ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি উচ্চ রক্তচাপের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, উচ্চ রক্তচাপ এখন আর কেবল বয়স্ক মানুষের সমস্যা নয়; অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিষ্ক্রিয় জীবনধারা ও মানসিক চাপের কারণে এটি দ্রুত তরুণ প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ আমাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় লবণ, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে গবেষণা বলছে, সঠিক খাদ্যভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনা জরুরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চ রক্তচাপ হলোÑ যেখানে রক্তনালিগুলোর ওপর রক্তপ্রবাহের চাপ দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। প্রাথমিকভাবে এর কোনো লক্ষণ দেখায় না; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, কিডনি সমস্যার পাশাপাশি মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হাইপারটেনশন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপের শিকার। আমাদের দেশে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি ‘হেলথ সায়েন্স প্রিভ্যালেন্স অ্যান্ড মেজর রিস্ক ফ্যাক্টরস অব নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস : অ্যা মেশিন লার্নিং বেইজড ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শিরোনামে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগ সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হিসেবে ধরা পড়েছে। অংশগ্রহণকারীর প্রায় ৮৩ শতাংশের মধ্যে এই রোগ পাওয়া গেছে। পুরুষদের মধ্যে হৃদরোগ বেশি হওয়ায় তাদের রক্তচাপও মহিলাদের তুলনায় বেশি। এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেছেন, উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিতের পাশাপাশি জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।
স্বাস্থ্যবিদদের মতে, খাদ্য তালিকায় লবণের পরিমাণ কমানো উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়। আমাদের খাবারে স্বাদ বাড়াতে লবণ বেশি ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে, বিশেষ করে আচার, ভর্তা, ভাজি ও ফাস্টফুডে। গবেষণা বলছে, দিনে পাঁচ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি আমরা গ্রহণ করছি। এক্ষেত্রে রান্নায় অতিরিক্ত লবণ ব্যবহারে সংযমী হওয়া, খাবার টেবিলে লবণ বাদ দেওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাজা শাকসবজি ও ফলমূলের পরিমাণ বাড়ানোই রক্তচাপ কমানোর দীর্ঘমেয়াদি উপায়। কারণ শাকসবজিতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ফাইবার থাকে, যা রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ডব্লিউএইচও-এর ২০১৭ সালের এক পরিসংখ্যান বলছে, সেবার পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি না খাওয়ার কারণে বিশ্বে প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, একটি সুষম প্লেটে অর্ধেক অংশ সবজি ও সালাদ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ। এ ছাড়া অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, চর্বিযুক্ত মাংস, লাল মাংস এবং প্রসেসড ফাস্টফুড রক্তচাপ বৃদ্ধির বড় উৎস। এগুলো কেবল ওজনই বাড়ায় না, শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলও বাড়িয়ে দেয়, ফলে রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ে। তারা বলছেন, খাদ্য তালিকায় ব্রাউন রাইস, ওটস ও আটা-জাতীয় খাবার রাখা রক্তচাপ কমাতে কার্যকর। চিনি ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তৈরি করে। চা-কফিতে কম চিনি ব্যবহার, মিষ্টান্ন কম খাওয়া এবং চিনিযুক্ত পানীয় পরিহার করা জরুরি।
আমরা মনে করি, কেবল খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়; পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে খাদ্যাভ্যাস হলো সেই প্রথম সোপান, যা ব্যক্তি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে সরকার ও গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কর্মস্থল পর্যন্ত পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁগুলোকে অতিরিক্ত লবণ ও তেল ব্যবহার কমাতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের প্রচার বাড়ানো যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপ একটি ‘নীরব ঘাতক’। কারণ এটি লক্ষণ ছাড়াই শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরিসংখ্যান বলছে, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কারণ জানা যায় না। তাই প্রথমে প্রয়োজন নিজের খাবারের দিকে তাকানো এবং স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেহেতু সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে সহজ উপায়ে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে, তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রতি নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে খাবার নিজে তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার আগে এতে কি পরিমাণ লবণ ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপকরণ আছে, তা যাচাই করা দরকার। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের মতো বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। তাই ঝুঁকি কমাতে খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হোন।