উপেক্ষিত জলবায়ু ন্যায্যতা
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩০ পিএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩২ পিএম
কপ সম্মেলন কি ব্যবসায়ী ও করপোরেট বাণিজ্যের মিলনমেলা। ২০২৫ সালের
জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩০) যখন পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন সংলগ্ন ব্রাজিলের
বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকটের তীব্রতা অতীতের সকল রেকর্ড
ছাড়িয়ে গেছে। একদিকে যেমন উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক দাপট ও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি
অবিচল সমর্থন সম্মেলনের আলোচনার টেবিলে ছায়া ফেলছে, অন্যদিকে তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের
জন্য সামান্যতম দায়ী না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের কোটি কোটি মানুষ এক
শ্বাসরুদ্ধকর ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এই মহাসম্মেলন কোটি কোটি টাকা খরচ করে আয়োজিত
হলেও, বাংলাদেশের হাওর, পাহাড় ও উপকূলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলোর ভাগ্যে এর কোনো
সত্যিকারের সুফল জুটবে কি না, সে প্রশ্ন আজ জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
আমাজনের কাছে দাঁড়িয়ে কার্বনের সুখ? আমাজন অরণ্যকে বলা হয়, পৃথিবীর
ফুসফুস। অথচ এই অরণ্যের কোল ঘেঁষে যখন বিশ্বের নীতি-নির্ধারকরা কার্বন দূষণ কমানোর
জন্য আলোচনার বাহাস তুলেছেন, তখন তাদের প্রতিনিধিদলের একটি বিশাল অংশই এসেছে জীবাশ্ম
জ্বালানি শিল্পের পক্ষে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কপ৩০-তে ১৬০০-এর বেশি জীবাশ্ম জ্বালানির
পক্ষপাতী প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন, যা আয়োজক ব্রাজিল ছাড়া যেকোনো দেশের প্রতিনিধিদলের
চেয়ে বড়। বিশ্বের মানুষ যখন কার্বন দূষণের কারণে হাঁসফাঁস করছে পৃথিবীর তাপমাত্রায়
উল্টাপাল্টা খেলা চলছে, তখন এই করপোরেট প্রতিনিধিদের বিশাল উপস্থিতি প্রশ্ন তোলে– আমাজনের কাছে গিয়ে তারা কি
পরিবেশ রক্ষার জন্য আন্তরিকতা অনুভব করছেন, নাকি শুধু নিজেদের ব্যবসা-স্বার্থ রক্ষার
কৌশল বুনছেন? এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ‘বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা’ হলেও, উন্নত দেশগুলোর
প্রতিশ্রুতি ও আর্থিক দায়বদ্ধতা প্রায়শই ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়। অতীতে আমরা তাই দেখেছি।
বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষ যেন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনের
শিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার
তথ্যমতে, ২০২৩-২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল ইতিহাসের উষ্ণতম বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে
এর প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা ও লবণাক্ততার
মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার আগ্রাসনে উপকূলীয় ১৯টি
জেলার প্রায় দুই কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। লবণাক্ত পানি শুধু ফসলের ক্ষতি করছে
নাÑ সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের খাবার পানিতে লবণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
হাওর এলাকায় দেখা দিচ্ছে আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, যা কৃষকের জীবন
ও জীবিকাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করছে। পাহাড়ি অঞ্চলে অনাবৃষ্টি, তীব্র খরা ও ভূমিধস
নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হওয়ায় প্রতিবছর
প্রায় ৭-১০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। ভিটেমাটি হারিয়ে
নিরুপায় এই মানুষগুলো বাধ্য হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে,
যেখানে নেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এই জলবায়ু-উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি
পাচ্ছে, যা নগর অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু ন্যায্যতা
ও কার্বন নির্গমনের দায় কার? জলবায়ু ন্যায্যতার মূল কথা হলো, যারা এই সংকটের জন্য ঐতিহাসিকভাবে
সবচেয়ে বেশি দায়ীÑ অর্থাৎ শিল্পোন্নত ধনী-দেশগুলো তাদেরকেই এর ক্ষতিপূরণ ও মোকাবিলার
খরচ বহন করতে হবে। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসেÑ
বাংলাদেশের হাওরের, পাহাড়ের, উপকূলের মানুষ কি এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী? বাস্তবতা
হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমনের হার একেবারেই নগণ্য।
বিগত দেড়শ বছর ধরে শিল্প-বিপ্লবের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ করে যে উন্নত দেশগুলো আজ বিশ্বের
অর্থনীতির চালক, তারাই মূলত আজকের এই সংকটের জন্য দায়ী। অথচ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির
শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো।
জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন ধনী দেশগুলো তাদের
ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করে ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে শর্তহীন এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন করবে,
যাতে বাংলাদেশ সরাসরি সেই সুবিধা নিতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধ করে নবায়নযোগ্য
শক্তিতে বিনিয়োগ স্থানান্তর করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন এবং ন্যায্য রূপান্তর
এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। ব্রাজিলের বেলেম সম্মেলনে
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের দাবি জানাচ্ছে, যার
অন্তত ৫০% অভিযোজন খাতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এটি একটি সময়োপযোগী এবং ন্যায্য দাবি।
তবে শুধু দাবি জানালেই হবে না, বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
জলবায়ু সম্মেলনগুলো যদি শুধু কোটি টাকা খরচের এক বিশাল ‘বৈশ্বিক নাটক’
হয়ে থাকে এবং এর ফলে বাংলাদেশের কৃষক, জেলে বা বস্তির মানুষ সামান্যতমও সুফল না পায়,
তবে সেই সম্মেলন অর্থহীন। আমাদের প্রয়োজন ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং পরিবেশগত, সামাজিক
এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এমন সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ। বাংলাদেশের
মানুষকে বাঁচাতে এবং বিশ্বকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিতে, জলবায়ু ন্যায্যতা আজ আর কোনো
ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি বেঁচে থাকার অধিকার। বিশ্বনেতাদের বুঝতে হবে, আমাজনের সবুজের পাশে
দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের উপকূলের লবণাক্ততা উপেক্ষা করে কোনো বৈশ্বিক শান্তি বা সমৃদ্ধি
সম্ভব নয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে,
সেখানে বাংলাদেশ অন্যতম দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। প্রকৃতির এই লাগামহীন পরিবর্তন দেশের
কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় এনেছে এক চরম অনিশ্চয়তা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি,
কোল্ড ইনজুরি, হট ইনজুরি, ঢেউ, ভূমিধ্স, অনাবাদি, ঋতুর পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা,
জলোচ্ছ্বাস, খরা ও লবণাক্ততার মতো বহুমুখী দুর্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের
জন্য এখন আর বিলাসী উন্নতির স্বপ্ন দেখা নয়, বরং জলবায়ু দুর্যোগের সঙ্গে টিকে থাকাটাই
প্রধান এবং একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই টিকে থাকার সংগ্রাম কোনো নিছক প্রতিরোধ
নয়, বরং হাজার বছরের ঐতিহ্য আর স্থানীয় জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক অসাধারণ
অভিযোজন ক্ষমতা। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাস করে আসছে।
প্রতিবছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক আঘাত সহ্য করে তারা জীবনকে আবার নতুন করে সাজায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন যুগে, টিকে থাকার মূল কৌশল হয়ে উঠেছে অভিযোজন এবং স্থিতিস্থাপকতা
বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে টিকে থাকার নতুন পথ তৈরি করেছে।
ভাসমান কৃষি বিশেষত, বর্ষা ও বন্যার সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘ভেসে থাকা’বা ভাসমান
সবজি চাষের পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় ‘ধাপ’ বা ‘ভাসা’। এটি
বন্যা-কবলিত এলাকায় ফসল উৎপাদন চালু রাখার এক অসাধারণ কৌশল। ধান, মাছ বা পানের মতো
ঐতিহ্যবাহী জীবিকা যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তখন বহু মানুষ বিকল্প
জীবিকা খুঁজে পেতে সংগ্রাম করে। এই অনিশ্চয়তা দারিদ্র্য আরও বাড়িয়ে তোলে।
বাংলাদেশের মানুষের জলবায়ু দুর্যোগের সঙ্গে টিকে থাকা
এক নিরন্তর সংগ্রাম, যেখানে প্রতিটি দিনই একটি নতুন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ একাই লড়া সম্ভব
নয়। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, বিশেষ করে ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের পর্যাপ্ত ও শর্তহীন
সহায়তা বাংলাদেশের এই অভিযোজন কৌশলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে, এটাও সত্য যে বাইরের সহায়তার
জন্য অপেক্ষা না করে, এদেশের মানুষ তাদের দৃঢ় মনোবল, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং জন্মগত অভিযোজনকে
পুঁজি করে প্রতিকূলতার সঙ্গে টিকে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়
বাংলাদেশের মানুষের এই অবিচল সংগ্রাম শুধু এদেশের জন্যই নয়, বিশ্বের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ
দেশের জন্যও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সংগ্রাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত, টিকে থাকাটাই বাংলাদেশের
মানুষের একমাত্র ভরসা।