আইনশৃঙ্খলা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৩ পিএম
পুলিশের ইতিহাস দীর্ঘ এবং জানমালের নিরাপত্তা বিধানে এই বাহিনীর ভূমিকা ব্যাপক। শুরুটা হয়েছিল সেই প্রাচীন সভ্যতায়, যেখানে সমাজের সকলে মিলে শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান করত। পরবর্তী সময়ে এটি একটি ‘প্রতিষ্ঠান’-এ পরিণত হয়। সময়ের হাত ধরে এর বিবর্তনও ঘটে। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরা পুলিশ আইন ১৮৬১ প্রবর্তনের মাধ্যমে একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনী তৈরি করে। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে এই বাহিনী ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিকের জীবন-সম্পদ সুরক্ষা এবং অপরাধ দমনÑ এই মৌলিক দায়িত্বগুলোর ওপরই নির্ভর করে এক স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা।
বরাবরের একটা সরল উক্তিÑ পুলিশ জনগণের বন্ধু। বাস্তবে উন্নত বিশ্বে এমনটা দেখা গেলেও বাংলাদেশের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। পুলিশ নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা নানারকম তিক্ততায় ভরা। কথায় আছে ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে…’। বাস্তবতা হচ্ছে, পুলিশকে এদেশের মানুষ বন্ধু নয়, প্রতিপক্ষই বেশি ভাবে। অবশ্য তাদের এমন নেতিবাচক ইমেজ এক দিনে তৈরি হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, বহু বছর ধরেই দেশে পুলিশকে রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল যেই হোক, তাদের ছায়াতলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ যেন দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীর দায়িত্ব পালন করে থাকে। এই বাস্তবতা শুধু পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, তাদের প্রতি নাগরিক আস্থাও ভেঙে দিয়েছে। বিশেষ করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ অপব্যবহার ঘটিয়েছে। দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ দিয়ে তাদের ব্যবহার করেছে ‘লাঠিয়ালের’ মতো।
মনে রাখতে হবে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশ রাষ্ট্রের সম্পদ। কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন নয়। অতীতে দেখা গেছে, দলীয় প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় পুলিশকে কখনও কখনও ব্যবহার করা হয় বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, এমনকি ভিন্ন-মতাবলম্বীদের ভয় দেখানোর কাজে। এর ফলে জনমনে পুলিশের প্রতি যে আস্থা থাকা উচিত, তা বিতর্কের মুখে পড়ে। অথচ জনগণের কর থেকে বেতন পাওয়া এই বাহিনীকে রাজনৈতিক আনুগত্যের নয়, আইনের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। উদাহরণ, চব্বিশের উত্তাল গণ-আন্দোলনের সময় জনতার তীব্র রোষের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। আর এই পরিস্থিতি ডেকে এনেছে আওয়ামী লীগের নিযুক্ত কতিপয় দলবাজ কর্মকর্তার গণবিরোধী লাগামহীন আচরণ। পুলিশপ্রধান থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত অনেকেরই নাম রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহারকারীর তালিকায়। পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই পেশাদারত্বের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন এবং দমন-পীড়ন চালানো ও মিথ্যা মামলা দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আগে-পরে এদের অনেকের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও উঠেছে। গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে অনেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যাদের অনেকেই এখন পলাতক।
তবে আশার কথা, অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের পরামর্শ মেনে ইতোমধ্যে নানা ক্ষেত্রেও সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। পুলিশের নৈতিক আচরণ ও তাদের প্রতি জনগণের আস্থা ফেরাতে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর পোশাকের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসবের লক্ষ্যÑ একটি মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা। মানবিক পুলিশ মানে দুর্বল পুলিশ নয়, বরং তারা হবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিক বোধসম্পন্ন। একজন সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের প্রথম ভূমিকা হলো নিরাপত্তা দেওয়া, আশ্রয় দেওয়া, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান। কিন্তু যখন পুলিশই ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, বাড়ে অপরাধপ্রবণতা। অনেক সময় দেখা যায়, থানায় সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতে গেলে হয়রানি বা তাচ্ছিল্যের শিকার হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্তে গড়িমসি বা পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। এসবই মানবিক পুলিশি ব্যবস্থার পরিপন্থী। আমরা আর সে পথে ফিরতে চাই না।
আমরা চাই, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত মানবিক পুলিশ। যে কারণে পুলিশ বাহিনীর নিয়োগ, পোস্টিং, বদলি ও পদোন্নতি যেন কোনোভাবেই দলীয় বিবেচনায় না হয়। প্রশিক্ষণে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পুলিশ সদস্যদের বোঝাতে হবে যে আইন প্রয়োগ করা মানে শুধু কঠোর হওয়া নয়, ন্যায়-নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়াতে অভ্যন্তরীণ তদারকি ও বাহ্যিক নজরদারি উভয়ই জোরদার করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও সহজ ও নিরপেক্ষ হতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণ ও পুলিশের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধ তৈরি করা। যাতে পুলিশ জনগণের কাছে যেতে পারে, তাদের সমস্যা নিজের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। দেশে দলীয় লাঠিয়াল নয়, মানবিক পুলিশ প্রয়োজন। মানবিক, পেশাদার ও নিরপেক্ষ পুলিশই পারে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে। এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক ছায়া থেকে পুলিশকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে জনগণের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। সবকিছু ঠিক থাকলে, কয়েক মাস পরই একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। দলীয় সরকারের পুলিশ বাহিনীর আচরণ যেন অতীতের মতো না হয়Ñ আমরা সেই নিশ্চয়তা চাই। আমরা চাই, পুলিশ আর কখনও ভক্ষক নয়, হয়ে উঠবে জনগণের রক্ষক।