× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নির্বাচন

ভোটেই নিহিত গণতন্ত্র ও দায়বদ্ধতা

ড. আলা উদ্দিন

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২৫ পিএম

ভোটেই নিহিত গণতন্ত্র ও দায়বদ্ধতা

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, এক মহান সংগ্রামের ফলস্বরূপ। সেই যুদ্ধের মূল চেতনা ছিল জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় পাঁচ দশক পার হয়ে গেলেও সেই চেতনা বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারেনি। বরং রাজনীতির ধারায় দলীয়করণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামরিকীকরণ ক্রমে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছে যে রাষ্ট্রের প্রতিটি খাত এখন তার ভার বহন করছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর পরিণতি সবচেয়ে তীব্রভাবে ভুগছে সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দলীয় আনুগত্য নীতির চেয়ে বড়, আর ক্ষমতা রক্ষাই একমাত্র উদ্দেশ্য। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর জনগণের প্রত্যাশা ছিল যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলগুলো গণতান্ত্রিক চর্চা ও সুশাসনের ভিত মজবুত করবে। কিন্তু তা ঘটেনি। রাজনীতির মঞ্চে দলীয় লড়াই, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও সামরিক হস্তক্ষেপ একে একে গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড দুর্বল করে দেয়। জনগণের ইচ্ছা ও ভোটের অধিকারকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রযন্ত্র ক্রমে ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।

এই দলীয়করণের রাজনীতি সমাজে যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, তা কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থাÑ সব ক্ষেত্রেই দলীয় প্রভাব প্রকট। সরকারি চাকরি, পদোন্নতি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। যোগ্যতার বদলে আনুগত্যই মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শিক্ষা খাতের দিকে তাকালেই এই দুরবস্থার ছবি স্পষ্ট হয়। দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, পাঠ্যক্রমের মান এবং শিক্ষার সাম্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ। গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার মধ্যে ফারাক বাড়ছে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণার মান নেমে গেছে, কারণ একাডেমিক স্বাধীনতা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। ছাত্র-রাজনীতি, যা একসময় গণতন্ত্রের চর্চার ক্ষেত্র ছিল, এখন দলীয় স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অস্ত্র, ভয় ও প্রভাবের রাজনীতি শিক্ষার পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে।

স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারি হাসপাতালে শয্যা ও চিকিৎসকের অভাব, ওষুধের সংকট, দূরবর্তী অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অনুপস্থিতিÑ সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই অক্ষমতা সবচেয়ে নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। টিকার অপ্রতুলতা, চিকিৎসক সংকট, এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনায় জনগণের প্রাণ গেছে, অথচ জবাবদিহি ছিল না। স্বাস্থ্যসেবা এখন এক ধরনের পণ্যে পরিণত হয়েছে, যা কেবল অর্থবিত্তবানদের নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বছরের পর বছর ডেঙ্গু কাবু করে ফেলেছে শহরবাসীকে, অনেকেই বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারায় প্রতিবছর।

প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সবকিছুতেই রাজনৈতিক প্রভাব প্রবল। ফলে সরকারি কর্মকর্তা বা বিচারকরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা প্রবল হওয়ায় সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। অপরদিকে দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতাবানদের জন্য আইনের প্রয়োগ অনেকটাই শিথিল। এভাবেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং নাগরিক আস্থাও বিলীন হচ্ছে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও এর সামাজিক ভিত্তি দুর্বল। রেমিট্যান্স, তৈরি পোশাকশিল্প, অবকাঠামোÑ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন দৃশ্যমান, কিন্তু এর সুফল জনগণের বৃহত্তর অংশে পৌঁছে না। দুর্নীতি, বৈষম্য, অর্থপাচার, ব্যাংক লুটÑ সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তার ভিত্তি হয় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ওপর। জনগণ যদি সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে উন্নয়নের সংখ্যাগুলো কেবল কাগজেই থেকে যায়।

এখানে আসল সংকটটি রাজনৈতিক। জনগণের ভোটাধিকার ক্রমে বিলুপ্ত হয়েছে। গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সীমিত, অংশগ্রহণ ছিল নিয়ন্ত্রিত। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষা না করে বরং একপক্ষের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে। এর ফলে জনগণের মধ্যে হতাশা ও অনীহা জন্মেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বিপদ।

নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের আস্থা ও জবাবদিহিতার বন্ধন। যেখানে মানুষ ভোট দেয়, সেখানে সরকার জানে তাদের পুনর্নির্বাচিত হতে হলে জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে। কিন্তু যখন ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ক্ষমতা জোরপূর্বক স্থায়ী হয় এবং শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছে নয়, বরং প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। এভাবেই দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বৈরাচারী মনোভাব জন্ম নেয়।

১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তুলনামূলকভাবে জনগণের ভোটের মূল্য ছিল বেশি। ২০০৮-এ তা ক্ষণিকের জন্য ফিরে আসে, তখনও সরকারগুলো জানত তাদের কাজের জবাব দিতে হবে পরবর্তী নির্বাচনে। ফলে প্রশাসনে কিছুটা হলেও সততা ও কার্যকারিতা ছিল। সময়ান্তরে সেই জবাবদিহিতা বিলীন হয়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানেন, রাজনৈতিক আনুগত্যই পদোন্নতির চাবিকাঠি; ন্যায়নিষ্ঠা নয়।

ভোটের অভাব কেবল রাজনৈতিক দুর্নীতিই বাড়ায় না, সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ও ত্বরান্বিত করে। মানুষ বিশ্বাস হারায় যে তাদের কণ্ঠের কোনো মূল্য আছে। এই বিশ্বাসহীনতা থেকে উদাসীনতা জন্ম নেয়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রের অবক্ষয়। সরকারবিরোধী মতামত দমন, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, ভিন্নমতকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়াÑ এসবই ভোটবঞ্চিত রাষ্ট্রের স্বাভাবিক লক্ষণ।

যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে রাষ্ট্রের অনেক সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হতে শুরু করবে। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার জানবে জনগণই তাদের শক্তির উৎস। তারা যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকবে না। সেই বাধ্যবাধকতাই শাসককে জবাবদিহিতায় বাধ্য করে, দুর্নীতি কমায় এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

বিশ্বের অনেক দেশেই ভোটের মাধ্যমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত। ইরানের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেখা গেছে, কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে দ্বিতীয়বার ভোট দিতে হয়েছে। এই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে যে ক্ষমতা জনগণের সম্মতিতেই আসে। বাংলাদেশেও এমন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ও প্রার্থীর ন্যূনতম ভোটের সীমা বাধ্যতামূলক থাকবে। এতে ভোট কারচুপির সুযোগ কমবে, জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামও। সেই মুক্তির অর্থ ছিল মানুষের ভোটের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। আজ সেই অধিকার আবারও বিপন্ন। যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সত্যিকার অর্থে লালন করতে চাই, তবে প্রথম কাজ হতে হবে জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার।

সরকার যদি বিশ্বাস করে যে তাদের জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন আছে, তাহলে তাদের জন্য অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কোনো ভয় থাকার কথা নয়। বরং এটি তাদের বৈধতা ও মর্যাদা বাড়াবে। অন্যদিকে, দমননীতি ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কেবল সরকারের প্রতি আস্থা নষ্ট করে, রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।

টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাÑ সবকিছুর ভিত্তি একটাইÑ জনগণের ভোটাধিকার। ক্ষমতার উৎস জনগণের হাতে ফিরিয়ে না দিলে কোনো সংস্কার, কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হবে না। রাষ্ট্র তখন কেবল বাহ্যিক অগ্রগতির মুখোশে আচ্ছাদিত একটি দুর্বল কাঠামোতে পরিণত হবে।

এখনই সময় গণতন্ত্রের আসল চর্চা শুরু করার। জনগণকে ভোটের মাঠে ফিরিয়ে আনতে হবে, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করতে হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রতিটি নাগরিক অনুভব করেÑ তার ভোটের মূল্য আছে, তার কণ্ঠ শোনা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপরÑ ক্ষমতার উৎস কে? যদি উত্তর হয় ‘জনগণ’, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জীবিত থাকবেÑ সময়ান্তরে বাস্তবায়িত হবে। আর যদি ক্ষমতা সীমিত গোষ্ঠীর হাতে বন্দি থাকে, তাহলে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও আমরা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পারব না।

দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হলে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। তাই সকল ক্ষমতার উৎস হতে হবে জনগণ এবং সকল নির্বাচনের ভিত্তি হতে হবে জনগণের অংশগ্রহণ। এই মুহূর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় নির্বাচন ভিন্ন অন্য চিন্তার অগ্রাধিকার জাতির বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। তাই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটই গণতন্ত্রের প্রাণ, রাষ্ট্রের সুস্বাস্থ্য ও জাতির সম্মানের প্রধানতম ধাপ।


ড. আলা উদ্দিন

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা