কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ড. তানভীর মুশতাফী
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২০ পিএম
ধরুন, কিশোরগঞ্জের এক কৃষক ভোরে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখল আজ তার জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, মাটির আর্দ্রতা এখনও যথেষ্ট। বিকালে একই অ্যাপে জানাল, কীটনাশকের ব্যবহার কিছুটা কমানো যেতে পারে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব নির্দেশ আসছে না কোনো কৃষি অফিস বা পরামর্শক কেন্দ্র থেকে; দিচ্ছে এক সফটওয়্যার, যা হাজার হাজার কৃষি উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই সফটওয়্যারটির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ইংরেজিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। একসময় যেটা কল্পনার গল্প মনে হতো, আজ সেটাই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু শহরের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ঢুকে পড়ছে মাঠে, কারখানায়, স্কুলে, এমনকি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। এই প্রযুক্তি যেমন আমাদের সামনে অসীম সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে, তেমনি আমাদের ভাবনার দিকেও নতুন আলো ফেলছে; কাজের ধরন বদলাচ্ছে, শিক্ষার ধরন পাল্টাচ্ছে, আর নৈতিকতার প্রশ্নও নতুন করে সামনে আসছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক দ্রুত পরিবর্তনের পথে। একদিকে তৈরি পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স আর কৃষি আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হয়ে আছে; অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে গড়ে উঠছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ, নতুন সম্ভাবনা। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সফল যাত্রা শেষে সরকার এখন এগোচ্ছে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে; একটি দেশ যেখানে প্রযুক্তি শুধু সুবিধা নয়, উন্নয়নের চালিকাশক্তি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। ২০২০ সালে সরকার ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নামে একটি নীতিমালা ঘোষণা করে। এতে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও শিল্প খাতে এআই ব্যবহারের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেবল নীতিমালা থাকলেই হবে না; বাস্তব পরিবর্তন আনতে দরকার প্রশিক্ষিত জনবল, গবেষণামুখী পরিবেশ এবং সাহসী উদ্যোগ।
‘কৃষি’- যা এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড; সেই খাতেই প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে কম। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত, অথচ জিডিপিতে এর অবদান মাত্র ১৪ শতাংশের কাছাকাছি। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মাটি, আবহাওয়া, সার ও ফসলের তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। ভারত ও ভিয়েতনাম ইতোমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিতে নতুন দিগন্ত খুলেছে। আমাদের দেশেও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ‘স্মার্ট কৃষি’ প্রকল্প চালু হয়েছে, যেখানে এআই মডেল বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও মাটির তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষকদের সেচ ও সার প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক। যদি এসব উদ্যোগে সরকারি সহায়তা, তহবিল ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো বাড়ানো যায়, তাহলে ‘স্মার্ট কৃষি’ একদিন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির দৃশ্যপটই বদলে দিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তখন শুধু শহরের আলোচনার বিষয় থাকবে না; পৌঁছে যাবে কৃষকের জমিতে, গ্রামের জীবনে, আমাদের ভবিষ্যতের ভিতর পর্যন্ত।
স্বাস্থ্য খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা অপরিসীম। বর্তমানে দেশে গড়ে প্রায় দুই হাজার মানুষের চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন একজন ডাক্তার। গ্রামীণ ক্লিনিকগুলোর অবস্থা আরও কঠিন; সেখানে চিকিৎসক পাওয়া অনেক সময়ই ভাগ্যের বিষয়। এই বাস্তবতায় এআই-নির্ভর রোগ নির্ণয় সফটওয়্যার বড় পরিবর্তন আনতে পারে। রোগীর উপসর্গ, পূর্ববর্তী রিপোর্ট, এমনকি ভয়েস বা ইমেজ ডেটা বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম। ইতোমধ্যে একটি সরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যানসার শনাক্তে মেশিন লার্নিং পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিছু বেসরকারি হাসপাতালও চিকিৎসা রিপোর্ট ও ইমেজ বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করছে, যা রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়িয়েছে এবং সময় কমিয়েছে।
এই প্রযুক্তি যদি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক বিপ্লব ঘটবে। তখন গ্রামীণ রোগীও মোবাইলের পর্দায় পরামর্শ পাবে, ডাক্তারদের সিদ্ধান্ত আরও তথ্যসমৃদ্ধ হবে, আর চিকিৎসা পাওয়া হবে সহজ ও দ্রুত। শিক্ষা ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠতে পারে নীরব বিপ্লবের চালক। অনেক উন্নত দেশে এখন এআই-ভিত্তিক শিক্ষণ সহায়ক বা টিউটর শিক্ষার্থীর শেখার গতি, দুর্বলতা ও আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে আলাদা পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করে দেয়। শিক্ষার্থী একেকজন আলাদা মানুষ; এআই সেই বৈচিত্র্যকে বোঝে এবং শেখার পথটাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে।
আমাদের দেশেও ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কয়েকটি স্টার্টআপ বাংলা ভাষাভিত্তিক শিক্ষণ অ্যাপ তৈরি করছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীর উত্তর ও শেখার ধরন বিশ্লেষণ করে পরবর্তী প্রশ্ন তৈরি করে দেয়। এই ধারা যদি আরও এগিয়ে নেওয়া যায় এবং শিক্ষানীতি ও কারিকুলামে এআই-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়; উদ্ভাবক ও নির্মাতা হিসেবেও গড়ে উঠবে। তখন হয়তো কোনো স্কুলের ছোট্ট শ্রেণিকক্ষে বসে এক শিক্ষার্থী নিজের এআই সহকারীর কাছ থেকে গণিত শিখছে, আবার ঢাকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই প্রযুক্তিরই নতুন সংস্করণ তৈরি হচ্ছে। এই পথেই বাংলাদেশের শিক্ষা ও চিকিৎসা; দুই খাতেই শুরু হতে পারে এক নতুন যুগ।
তবে সম্ভাবনার সঙ্গে ঝুঁকিও আছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী দশকে অটোমেশনের কারণে লাখ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ ভবিষ্যতে যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে যদি এই পরিবর্তন পরিকল্পনাহীনভাবে আসে, তাহলে কর্মসংস্থানের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তাই এখনই সময় শ্রমবাজারকে নতুনভাবে গড়ে তোলার। কর্মীদের শুধু হাতে-কলমে কাজের দক্ষতা নয়, নতুন যুগের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল দক্ষতা; এআই পরিচালনা, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি-নীতিনির্ধারণে প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে এই দিকেই বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে; বাংলাদেশকেও এখন সেই পথে হাঁটতে হবে।
একই সঙ্গে আমাদের দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলোকে আরও সহায়তা দিতে হবে। এখন অনেক স্টার্টআপ ফিনটেক, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, লজিস্টিক্স, এমনকি শিক্ষা খাতেও মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। কিন্তু তাদের সাফল্য নির্ভর করছে গবেষণার পরিবেশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ওপর। যদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে দেশীয় উদ্ভাবনের গতি বহুগুণ বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই পরিবর্তনের ছোঁয়া পৌঁছাতে হবে। গবেষণা যেন কেবল পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ হয়; এটা নিশ্চিত করতে হবে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব ও শিল্প খাতের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলা যায়, তাহলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা সফটওয়্যার একদিন বৈশ্বিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে। তখন হয়তো আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারব; বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না, বরং প্রযুক্তি তৈরি করছে। আর সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হয়ে উঠছে আমাদের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লবের চালিকাশক্তি।
একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কল্পনা।’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই কল্পনারই আধুনিক রূপ। এই প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদও হতে পারে, আবার বিপদও ডেকে আনতে পারে। পার্থক্যটা নির্ভর করবে আমরা কেমনভাবে এটি ব্যবহার করি তার ওপর; আমাদের নৈতিকতা, দূরদর্শিতা আর প্রস্তুতির ওপর।
ড. তানভীর মুশতাফী
সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়