বিশ্লেষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:২৭ পিএম
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:২১ পিএম
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে বয়ে গিয়েছিল এক প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়। গর্কি নামে খ্যাত সেই প্রলয়ে লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছিল হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা, চর তজুমদ্দিনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। সে সময় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অসুস্থ অবস্থায় তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আমি উপদ্রুত এলাকায় যাব। চিকিৎসকরা তাকে নিষেধ করলেন। শুভানুধ্যায়ীরাও বারণ করলেন। কিন্তু তিনি মানলেন না। চিকিৎসক-নার্স, ওষুধ, ত্রাণসমগ্রী ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে লঞ্চযোগে গেলেন উপকূলীয় অঞ্চলে। ঘুরে ঘুরে দেখলেন প্রিয় স্বদেশের একটি অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপ আর সারি সারি মৃতদেহ। প্রায় এক সপ্তাহ পরে ফিরে এলেন ঢাকায়।
২৩ নভেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে আহ্বান করলেন জনসভা। প্রত্যক্ষদর্শী বড় ভাইয়ের মুখে শুনেছি, সে জনসভা আক্ষরিক অর্থেই পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। রাজধানী ঢাকার সর্বশ্রেণির মানুষ সেদিন পল্টন ময়দানে উপস্থিত হয়েছিল কী বলেন হুজুর ভাসানী তা শুনতে। সেখানে এসেছিলেন কবি শামসুর রাহমানও। তিনি তখন দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক। সাধারণত রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে যেতেন না তিনি। কিন্তু ওইদিন গিয়েছিলেন। পল্টনের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শুনেছিলেন মজলুম জননেতার হুঙ্কার। সেদিন মওলানা ভাসানীর ভাষণ তাকে এতটাই বিমুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছিল যে, তিনি লিখলেন তার সেই কালজয়ী কবিতা ‘সফেদ পাঞ্জাবী’।
কবি শামসুর রাহমান তার কবিতায় বর্ণনা করেছেন সে অভিজ্ঞতার কথা। তিনি লিখেছেন, শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী, শ্রমজীবী, সাংবাদিক, সমাজসেবিকা সবাই ছুটে এসেছিলেন সেদিন পল্টন ময়দানে দুর্গত এলাকা-প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী কী বলেন তা শুনতে। কবির ভাষায়Ñ ‘রৌদ্রলোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,/ যেন মহাপ্লাবনের পর নূহের গভীর মুখ/ সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি/ উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে। বুক তার দক্ষিণ বাংলার/ শবাকীর্ণ হু-হু উপকূল, চক্ষদ্বয় সংহারের/ দৃশ্যাবলীময়; শেনালেন কিছু কথা, যেন নেতা নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার।’ বাস্তবিক দুর্গত-এলাকা সফর শেষে এসে মওলানা ভাসানী সেদিন ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে ধ্বংসপ্রাপ্ত উপকূল এলাকা ও মানবিক বিপর্যয়ের যে বর্ণনা তার ভাষণে শুনিয়েছিলেন মানুষকে, তা একজন সুদক্ষ স্টাফ রিপোর্টারের পক্ষেই সম্ভব ছিল। একজন রাজনৈতিক নেতার দুর্গত এলাকার বিবরণ যে সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টারের প্রতিবেদনের তূল্য হতে পরে, কবি-সাংবাদিক শামসুর রাহমানের বোধে তা ধরা পড়েছিল।
সেদিন মজলুম জননেতাকে আরও বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত করেছিল ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত অঞ্চলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কারও না যাওয়া। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার চীন সফর শেষে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরার পথে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করলেও পূর্ব পাকিস্তানের ধ্বংস হয়ে যাওয়া উপকূলের দুর্গত মানুষদের দেখতে যাওয়ার গরজ অনুভব করেননি। এমনকি তখন পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও সেখানে পা রাখেননি। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর এহেন নিষ্ঠুর আচরণে ক্ষুব্ধ মওলানা পল্টনে দাঁড়িয়ে বললেন ‘ওরা কেউ আসেনি’। সে সঙ্গে তিনি ১৪ বছর আগে কাগমারীতে উচ্চারিত ‘আসসালামু আলাইকুমে’র প্রতিধ্বনি করে বললেন, ‘লা-কুম দ্বীনি-কুম ওয়াল ইয়া দ্বীন’- ‘তোমারটা তোমার, আমারটা আমার’। তোমাদের সঙ্গে আমাদের আর থাকা সম্ভব নয়। তিনি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনী প্রচারে ডুবে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘মজিব, নির্বাচন করে কোনো লাভ হবে না। পূর্ববাংলার মুক্তি এইসব নির্বাচনে আসবে না। সংগ্রাম, একমাত্র সংগ্রামই পূর্ববাংলাকে মুক্ত করতে পারে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে।’
কবি শামসুর রাহমানের মজলুম জননেতাকে অলৗকিক স্টাফ রিপোর্টার আখ্যায়িত করা যে নিরর্থক ছিল না, তার জীবন ও রাজনীতিকে পর্যালোচনা করলে সে কথা প্রতিভাত হয়ে ওঠে। সারা জীবন তিনি শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পক্ষে আওয়াজ তুলেছেন। তাদের দুঃখ-দুর্দশা, বঞ্চনা-হাহাকারের কথা তুলে ধরেছেন শানিত কণ্ঠে সুনিপুণ বর্ণনায়। তার সে বর্ণনা ছিল নিখুঁত। বঞ্চিত মানুষেরা মওলানা ভাসানীর সে বর্ণনায় খুঁজে পেত তাদের অব্যক্ত বঞ্চনার কথা। কিশোর বয়সে জন্মস্থান সিরাজগঞ্জের ধানগড়া থেকে যমুনা পার হয়ে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে এসে থিতু হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিদার সন্তোষের প্রজাপীড়ন ও শোষণ তাকে বিদ্রোহী করে তোলে। রুখে দাঁড়ালেন জমিদারের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। জমিদারের রোষের মুখে তাকে চলে যেতে হলো আসামে। সেখানেও একই অবস্থা। ব্রিটিশ সরকারের প্রবর্তিত লাইনপ্রথা আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন আজন্ম বিদ্রোহী ভাসানী। আয়োজন করলেন কৃষক সম্মেলনের। আসামের ভাসানচরের সে সম্মেলন থেকেই তার নাম হয়ে গেল ‘ভাসানচরের মওলানা’, পরে তা আসল নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ‘ভাসানী’ অভিধা হিসেবে।
হুজুর ভাসানীর জীবনী পাঠ করলে আমরা তাকে একজন আজীবন বিদ্রোহী হিসেবে দেখতে পাই। আজীবন সংগামীও ছিলেন তিনি। তার সংগ্রাম ছিল শোষকের বিরুদ্ধে, শোষিতের পক্ষে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিপীড়িতের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি যেন থামতে চাননি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার পঙ্ক্তি যেন বাঙময় হয়ে ওঠে তার জীবনেÑ ‘আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত/ আমি সেই দিন হবো শান্ত/ যেদিন উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’ মজলুম মানুষের পক্ষে সোচ্চার সে কণ্ঠ শান্ত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ১৭ নভেম্বর। তার আগ পর্যন্ত সংগ্রামমুখর জীবনের পুরোটা সময় তিনি পালন করেছেন একজন দক্ষ স্টাফ রিপোর্টারের দায়িত্ব। জনসভাগুলোতে দাঁড়িয়ে বজ্র নির্ঘোষে তিনি শাসক-শোষকের জুলুম-অত্যাচর, শোষণ-নিপীড়ন ও কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের লাঞ্ছনা-বঞ্চনার যে নিখুঁত বর্ণনা দিতেন, তা একজন পেশাদার রিপোর্টারের কাছেও ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার। এতটুকু অতিরঞ্জন নেই, নেই কণামাত্র অসত্য তথ্য, নিরেট সত্যকে তুলে ধরতেন একজন অকুতোভয় রিপোর্টারের ন্যায়। আর তাই কবির দেওয়া ‘অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার’ আখ্যা হয়ে ওঠে অর্থবহ।
তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। এর প্রমাণ মেলে তার প্রতিটি কথা, কাজ ও পদক্ষেপে। সবেমাত্র ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুই অংশ মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মওলানা ভাসানী দেখলেন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার বঞ্চিত করছে পূর্ববাংলার মানুষদের। কিন্তু তাদের পক্ষে কথা বলার সম্মিলিত কোনো রাজনৈতিক প্লাটফরম নেই। উদ্যোগ নিলেন তিনি। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম নিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল। তার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের গুণে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে হক-ভাসানী যুক্তফ্রন্ট ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। তারপর রাজনৈতিক ঘটনা-পরম্পরায় তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, পূর্ববাংলাকে স্বাধীন করা না গেলে এ দেশের মানুষের মুক্তি আসবে না। তাই ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তোমরা যদি আমাদের ন্যায্য পাওনা না দেও, পূর্ববাংলার মানুষ তোমাদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানাবে। বলা নিষ্প্রয়োজন, এটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম উচ্চারণ।
আজীবন নিপীড়িত-নির্যাতিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে আপসহীন ভূমিকা পালন করে তিনি উপাধি পেয়েছিলেন ‘মজলুম জননেতা।’ এ উপাধি ছিল যথোপযুক্ত। এ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষদের নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে, অনেক রাজনীতিক মঞ্চে তাদের জন্য কেঁদে প্রাণপাত করেছেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত লাভ-লোভের বশবর্তী হয়ে জনবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। তার এ উপাধি তিনি নিজে নির্যাতিত হয়েছেন বলে নয়, বরং মজলুম মানুষের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকার জন্যই পেয়েছেন।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগে থেকে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রাম সম্ভব নয়। তাই ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে নতুন দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। তারপর বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিরন্তর পথচলা। পাশাপাশি পূর্ববাংলার স্বাধীনতার কথা তিনি ক্ষণকালের জন্যও বিস্মৃত হননি। তাই ১৯৭০ সালের ২৪ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানে জনসভা করে দাবি জানিয়েছিলেন ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার’। ১৯৭১-এর মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম অপরিহার্য হয়ে উঠল। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। বললেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ কিন্তু তার পরপরই ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সঙ্গে আপসরফায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভা করেন মওলানা ভাসানী। তিনি শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘মজিব, ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করে কোনো লাভ নাই। ওরা তোমাকে ক্ষমতায় বসাতে দিবে না। এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য দরকার পূর্ণ স্বাধীনতা। আলোচনার পথ পরিহার করে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ো।’ মওলানা ভাসানী সেদিন দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছিলেন এ দেশের মানুষের মুক্তির পথ। ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয়।
একটি নিবন্ধের ছোট ক্যানভাসে মওলানা ভাসানীর মতো মহীরুহের ছবি আঁকার চেষ্টা ধৃষ্টতা মাত্র। কবি শামসুর রাহমান তার সফেদ পাঞ্জাবী কবিতার শেষ কটি লাইনে লিখেছেন- ‘বল্লমের মত ঝলসে ওঠে তার হাত বারবার/ অতিদ্রুত স্ফীত হয়; স্ফীত হয় মৌলানার সফেদ পাঞ্জাবী/ যেমন তিনি ধবধবে একটি পাঞ্জাবী দিয়ে সব/ বিক্ষিপ্ত বেআব্রু লাশ কী ব্যাকুল ঢেকে দিতে চান।’
বাস্তবিক শোষকের বিরুদ্ধে মজলুম জননেতার হাত তীক্ষ্ন বল্লমের মতোই ঝলসে উঠেছে বারবার। তিনি তার সারা জীবনের সংগ্রামে শোষিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। আজ সেই মহান নেতার ৪৯তম মহাপ্রয়াণ দিবস। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সাংবাদিক ও কলাম লেখক