পর্যবেক্ষণ
ফজলে মিনহাজ
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:২৪ পিএম
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ উল্টো। যেখানে আশা ছিল ঐক্যের, সেখানে অনৈক্যের দামামা বাজছে। রাজনীতিতে পরস্পরের প্রতি কটাক্ষ, অবিশ্বাস ও হেয় করার প্রতিযোগিতা চলছে। আদর্শের লড়াই থাকবে, মতের ভিন্নতা থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আদর্শ ও যৌক্তিক তর্কের জায়গায় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে একে অপরকে ঘায়েল করার মানসিকতা। ফ্যাসিবাদের পতনের পর জাতি ভেবেছিল, অতীতের শিক্ষা থেকে রাজনীতিতে নতুন রূপান্তর ঘটবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার মোহে বিভোর হয়ে অনেকেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কাজ করছেন।
গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন, সংস্কার, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার জয়জয়কার হওয়ার কথা থাকলেও রাজনীতি আটকে গেছে মতবিরোধ ও বিভাজনের অন্ধকার গলিতে। ক্ষমতার হিসাব-নিকাশই এখন মুখ্য। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাÑ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধরে রাখতে না পারা। যে স্পিরিট দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নেও মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিল, সেটি আজ রাজনীতিবিদদের অনৈক্য ও বিভক্তির কারণে দুর্বল হতে বসেছে। ফলে যে পতিত স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের ইতিহাসের আবর্জনায় মিলিয়ে যাওয়ার কথা, তারা আবার মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ শক্তিগুলো যখন অপরাজনীতিতে বিভোর, তখন ফ্যাসিবাদী শক্তির আস্ফালন অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টÑ দেশের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলার ধরন, কৌশল ও ভাষা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বড় দল হিসেবে বিএনপিও তাদের রাজনৈতিক রণকৌশলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনছে। যদিও এই কৌশল নাগরিক সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকে মনে করছেন, বিএনপির বক্তব্যে এখন আওয়ামী লীগের বয়ানও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অতিরিক্ত ‘লিবারেল’ ভঙ্গিতে নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে; যা নাগরিক সমাজের একাংশের কাছে প্রশংসিত হলেও ইসলামী ভাবধারার কিছু অংশে এটিও সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এগুলো বৃহত্তর রাজনীতিরই অংশ এবং পরিবর্তনশীল সমাজ-মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন।
যত মতানৈক্য ও বিভেদই রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে থাকুক না কেন এবং ঐকমত্য কমিশন যতবারই ‘অনৈক্য কমিশন’ বলে সমালোচিত হোক না কেন, ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন বাংলাদেশের একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় ১৫ মাস পর তার এই ভাষণকে অনেকেই সবচেয়ে দৃঢ় ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অনেকেই মনে করতেন, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রমের মধ্যে যেন একটি অদৃশ্য ব্যবধান রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি সেই ব্যবধান ঘুচিয়েছেন। জনমনে যে ভীতি, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা জমে উঠেছিল, তা তিনি অত্যন্ত প্রশমিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার ভাষণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নির্দেশনাসহ গণভোট, উচ্চকক্ষ এবং রাজনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে একটি কাঠামোবদ্ধ সমাধানের পথ রেখেছেন। এর আগেই তিনি সব দলকে এক সপ্তাহ সময় দিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়সীমার মধ্যেও রাজনৈতিক দলগুলো এক টেবিলে বসতে পারেনি, ঐকমত্য তো দূরের কথা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত নয় মাসে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে যে অনৈক্য, দ্বন্দ্ব ও পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মীমাংসার চেষ্টা করেছেন, তারও বাস্তব কোনো অগ্রগতি মেলেনি। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ আহ্বান লক্ষ করা গেছে; যা পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। এর পরও যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দ্বন্দ্ব ও রেষারেষি অব্যাহত রাখে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনের পথ আরও জটিল হবে। আর এ পরিস্থিতি জাতির জন্য বড় ধরনের দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশে দেওয়া সাম্প্রতিক ভাষণটি চমকপ্রদ ও আশাজাগানিয়া। ভাষণের মূল আকর্ষণÑ একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ঘোষণা। গণভোটে থাকবে একটি প্রশ্ন, কিন্তু সেই প্রশ্নের ভেতর সন্নিবেশিত থাকবে চারটি প্রস্তাবনা। অর্থাৎ নাগরিকরা চারটি ভিন্ন বিষয়ের ওপর পৃথকভাবে মতামত দিতে পারবেন না; একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’– এই সিদ্ধান্তই গণভোটের ফল নির্ধারণ করবে। এই কাঠামোই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তবে চারটি প্রস্তাবনা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের জন্য ভিন্ন মাত্রার বিরোধিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফলে একক ‘হ্যাঁ-না’ উত্তরের বাধ্যবাধকতা রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
ভাষণের দিনটি আরও আলোচিত আরেকটি কারণেÑ এদিন ছিল পতিত স্বৈরাচারী প্রধান শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের দিন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ‘লকডাউন’ ঘোষণা করলেও সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা নিজেদের প্রত্যাশামতো তাণ্ডব বা নাশকতা ঘটাতে ব্যর্থ হয়। কিছু স্থানে কয়েকটি বাস ও একটি ট্রেনে আগুন লাগানো এবং যান চলাচলে সামান্য বাধা সৃষ্টির ঘটনা ছাড়া বড় কোনো সংঘাত হয়নি। বরং রাজপথ ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই যোদ্ধা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দখলে। নাশকতা করতে গিয়ে দেশজুড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির অনেকেই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। এই উত্তপ্ত, আলোচিত দিনেই প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সাহসী, বলিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি একদিকে গণহত্যার দায়ে ফ্যাসিবাদের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন, অন্যদিকে যথাসময়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণ জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নের রূপরেখা হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আগামীর বাংলাদেশে সুস্থধারার রাজনীতির ভিত্তি নির্মাণে জাতীয় ঐক্যের হাতিয়ার হিসেবে এ ভাষণ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে একটি প্রশ্নের অবতার হয়েছেÑ বাংলাদেশ কি জুলাই সনদের সূত্র ধরে একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের দিকে অগ্রসর হবে? নাকি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ধারা বজায় থাকবে? গণভোটের ফলাফল এবং জনগণের রাজনৈতিক রায়ই এর চূড়ান্ত উত্তর নির্ধারণ করবে।
ফজলে মিনহাজ
রাজনীতি পর্যবেক্ষক