ইন্টারনেট স্বাধীনতা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১৬ পিএম
‘ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা’-এর সূচকে বাংলাদেশ এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তিগত বিস্তার, মোবাইল নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, কম খরচে স্মার্টফোনের প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে দেশে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ অনায়াসে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছে। এই পরিবর্তন শুধু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ায়নি, বরং সাধারণ মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত সুযোগকে প্রসারিত করেছে। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্ম এখন ইন্টারনেটকে তথ্য সংগ্রহ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর এই সুফল প্রায় তিন দশক ধরে দেশের মানুষ ভোগ করছে।
এই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয়েছে, ১৩ নভেম্বর মার্কিন সংস্থার ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট- ২০২৫’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে। সংস্থাটি বলছে, মূল্যায়নে থাকা ৭২টি দেশের মধ্যে ইন্টারনেট স্বাধীনতায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। ফ্রিডম হাউস তাদের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান দেশের কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিজিটাল ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক সংস্কার আনে। ফলে এ বছর দেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতা সূচক পাঁচ পয়েন্ট বেড়ে ১০০-এর মধ্যে ৪৫ হয়েছে। যা গত সাত বছরে দেশের সর্বোচ্চ সূচক। গত বছর এই স্কোর ছিল ৪০।
উল্লেখ্য, ফ্রিডম হাউস তিনটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করে সূচক নির্ধারণ করে। বিষয়গুলো হলোÑ ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা, অনলাইনে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ইন্টারনেট বন্ধ না করার নীতি নিয়েছে এবং ইন্টারনেটকে মানবাধিকারের অংশ হিসেবে দেখছে। সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ (সিএসও) জারি করেছে। এতে অনলাইনে হয়রানি ও যৌন নির্যাতনবিরোধী সুরক্ষা রাখা হয়েছে। তবে অনলাইনে বক্তব্যের জন্য শাস্তি ও নজরদারির ঘাটতি কিছুটা রয়ে গেছে।
এ কথা মানতেই হবে, এই স্বাধীনতা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নতি। ইন্টারনেট ব্যবহারের শুরুর পর থেকে ক্রমান্বয়ে থ্রি-জি থেকে ফোর-জি, আর এখন ফাইভ-জি পরীক্ষামূলক কার্যক্রমÑ বাংলাদেশ তার নেটওয়ার্ক সক্ষমতা দ্রুত প্রসারিত করছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও শহরের মতো দ্রুতগতির ইন্টারনেট পেতে শুরু করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, অনলাইন সরকারি সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটালাইজেশন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বলা চলে, তথ্যপ্রবাহের এই সমতা জনগণের মতামত প্রকাশের সুযোগও বৃদ্ধি করেছে। শুধু তাই নয়, দেশের ইন্টারনেটভিত্তিক অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও কনটেন্ট তৈরিÑ এসব খাতে লাখো তরুণ নতুন কর্মসংস্থান পাচ্ছে। এই সুযোগ ধরে রাখতে হলে ইন্টারনেটকে আরও উন্মুক্ত, নিরাপদ ও দ্রুতগতির করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে ইন্টারনেট বেশি উন্মুক্ত ও স্বাধীন সেসব দেশে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানও দ্রুত বাড়ছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের এই স্বাধীনতা শুধু প্রবেশাধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মতপ্রকাশের পরিবেশ, তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং নিরাপদ সাইবার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশে আগের তুলনায় কিছুটা স্বাধীনতার পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন বেশি খোলামেলা আলোচনা করতে পারছে। নাগরিক সাংবাদিকতা, সামাজিক আন্দোলন কিংবা দুর্নীতির বিরোধী বক্তব্যÑ এসব ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সাধারণ মানুষের কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছে। গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা অনেক সময় অনলাইন প্লাটফর্ম পূরণ করছে, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক।
তবে এই অগ্রগতির মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নানা সময় বিভিন্ন আইনÑ বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করলেও অনলাইন জালিয়াতি, সাইবার বুলিং ও তথ্য বিকৃতি এখনও উদ্বেগের কারণ। ভুল তথ্য ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারকে আরও স্বচ্ছ ও মানবাধিকার সংগত নীতি অনুসরণ করা দরকার। কেননা ইন্টারনেটের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেলে তার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিতের প্রয়োজনও বেড়ে যায়।
সহজ করে বললে, ইন্টারনেট ব্যবহারের এই স্বাধীনতা সময়ের প্রয়োজনে। এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিচ্ছে। এখন প্রয়োজন স্বাধীনতার এই অগ্রযাত্রাকে নীতি-সহায়ক, মানবাধিকার সম্মত এবং প্রযুক্তিগতভাবে আরও শক্তিশালী করা। ইন্টারনেট কেবল তথ্যপ্রাপ্তির মাধ্যমই নয়Ñ সাম্য, স্বচ্ছতা ও উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাক। আমরা চাই, মানুষের মতপ্রকাশের পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হোক।