× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আলুর চাষ ও বাজার নিয়ে কৃষকরা শঙ্কিত

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১৩ পিএম

আলুর চাষ ও বাজার নিয়ে কৃষকরা শঙ্কিত

আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে বছরে প্রতি একজন মানুষ আলু খায় ৫১ দশমিক ৫ কেজি। সেদিক থেকে বিশ্বে অবস্থান ৪৪তম। দেশটি রপ্তানিতেও নেই শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকায়। তাহলে উৎপাদিত এত পরিমাণ আলু বাজারে ওঠার পর দাম নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় কেন। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হিমাগার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, এবার রেকর্ড পরিমাণ এক কোটি ৩০ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ৪০ লাখ টন বেশি। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার প্রভাব পড়েছে দামে। বিসিএসএ বলছে, হিমাগার ফটকে এলাকাভেদে কেজি এখন ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ সব মিলিয়ে কৃষকের প্রতি কেজিতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ২৫ টাকা। আবার সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার আলুর গড় উৎপাদন খরচ ছিল কেজিতে ১৪ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া যোগ হবে। ফলে সরকারি হিসাবেই প্রতি কেজি আলুতে কৃষক লোকসান গুনছেন। বিভিন্ন জেলার কৃষকরা যে তথ্য দিয়েছেন তাতে এই লোকসান কেজিতে ১০ টাকার মতো।

মাঠ বিশ্লেষণে দেখা যায়, নওগাঁ জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে অফ সিজনে বিক্রি করে লাভের আশা করছিলেন। সেই আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে। বাজারদর এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে হিমাগারের ভাড়া পরিশোধের ভয়ে হিমাগার থেকে আলু নিচ্ছেন না তারা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এই বছর আলু চাষ নিয়েও কৃষকরা আছেন নানা শঙ্কায়। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, জেলায় আলুর উৎপাদন বাড়ছে। চলতি বছর জেলায় ২৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে পাঁচ লাখ টন আলু। গত বছর ২৩ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছিল চার লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, কৃষকদের একটি অংশ উৎপাদিত আলু হিমাগারে রাখেন লাভের আশায়। এই আলু বিক্রি করে তারা পরবর্তী ফসল উৎপাদনের আর্থিক জোগান দেন। ব্যবসায়ীরাও কিনে হিমাগারে আলু রাখেন অফ সিজনে বিক্রি করে লাভের আশায়। তাদের অভিযোগ, উৎপাদন থেকে শুরু করে হিমাগারে রাখা পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুতে খরচ পড়েছে ২৪ থেকে ২৬ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়। সরকার নির্ধারিত দর ২২ টাকা কার্যকরের সম্ভাবনা না থাকায় এবার চরম দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা।

মুন্সীগঞ্জের প্রান্তিক চাষি এবং হিমাগারে মজুদকারী ব্যবসায়ীরা আলুর দাম না বাড়ায় চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন। অনেক আলু ব্যবসায়ী রয়েছেন তারা আলু উত্তোলন না করে দলিল কোল্ড স্টোরেজে রেখে আসছেন। তার কারণ আলু বিক্রি করলেও তারা তাদের খরচটুকু পর্যন্ত ওঠাতে পারছেন না। বাজারে আলু বিক্রি না হওয়ায় কোল্ড স্টোরগুলোও অলস সময় পার করছে। সামনে আলুর দাম বাড়ার সুযোগও তেমন নেই। তার কারণ সামনে আগাম নতুন আলু চলে আসবে। আবার বর্ষার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে পুরোদমে আলুর চাষ। এ সময়ের মধ্যে হিমাগারে যে পরিমাণ আলুর মজুদ রয়েছে তা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।

আলুর দাম পতনের অন্যতম কারণ হলো আগের বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে আলু চাষ মার খেয়ে ফলন অনেক কম হয়েছিল। তাতে বাজারে আলুর দর বেড়ে ৮০ টাকা পর্যন্ত ঠেকে। সেই আশায় এ বছর দেশজুড়ে ব্যাপক আলু চাষ হয়েছিল। আবার গত বছরের তুলনায় এ বছর আলু রাখতে হিমাগারের ভাড়াও বৃদ্ধি করা হয়েছে। একদিকে আলুর দরপতন অন্যদিকে আলু হিমাগারে রাখতে গিয়ে খরচ পড়েছে বেশি। তাই চাষি এবং ব্যবসায়ীরা উভয়ই এখন ক্ষতির মুখে পড়ছেন। গত ৫ মৌসুমে আলুর উৎপাদন ও বাজারদরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক বছর উৎপাদন বেশি হলে দাম কম থাকে। লোকসানের মুখে পরের বছর কৃষক উৎপাদন কমালে বাজারে দামও বেড়ে যায়। যেমন, ২০২২-২৩ মৌসুমে আলুর মোট উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার ৭৩৬ টন। চাহিদা ছিল ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। খুচরা পর্যায়ে সরকার প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করে দেয় ৩৫-৩৬ টাকা। কিন্তু তা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের বাজারে বিক্রি হয় ৪৫ টাকার ওপরে। যা পাইকারি পর্যায়ে কেনা হয়েছিল ২৭ টাকায়। আলুর উদ্বৃত্ত থাকার পর কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তখন বাজার অস্থির করে। ফলে বিপাকে পড়ে আলুর ভোক্তারা। কৃষি বিপণন ও সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে তখন এমন পরিস্থিতির কারণও উল্লেখ করা হয়। 

দেশে আলুর উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি সেই হারে বাড়ছে না। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে রপ্তানি হয়েছিল ৬৮ হাজার ৭৭৩ টন আলু। ২০২২ সালে ৭৮ হাজার ৯১০ টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার টন। ২০২৪ সালে তা আরও কমে হয়েছে ১২ হাজার ১১২ টন। তবে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে। উদ্বৃত্ত থাকায় রপ্তানি আরও বাড়ানোর তাগিদ কৃষকের। চলতি মৌসুমে চাষি যখন ভুক্তভোগী তখন এ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। কিন্তু বছরের ধারাবাহিকতা হিসাবে ধরলে রপ্তানির ক্ষেত্রেও মৌসুমভেদে বড় আকারের উত্থান-পতন দেখা যায়। 

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) যে চিঠি দিয়েছে সেখানে একটি সমাধানের পরামর্শ উল্লেখ করা হয়েছে। তারা মনে করে, কৃষককে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমাগার ফটকে আলুর ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা জরুরি; দেশের ৫৫ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে দেওয়া চালের পাশাপাশি ১০ কেজি করে আলু দিতে পারে সরকার এবং এটা সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে পারে। তারা সারা দেশে টিসিবির মাধ্যমে আলুর ট্রাকসেল করারও পরামর্শ দিয়েছে। জানা যায়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুর বহুমুখী ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে রংপুর বিভাগসহ দেশের ১৬টি জেলায় ৪৫০টি অহিমায়িত মডেল ঘরে আলু সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল। গত অর্থবছরে রংপুর জেলায় ৭৫টি অহিমায়িত মডেল ঘরের মধ্যে ৪৫টিতে আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। আলুঘরগুলো কাজ করছে। 

তাই বলা যায়, রপ্তানি করুক না করুক, সরকারকে আলুচাষিদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ আলু নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। দেরি না করে বসতে হবে হিমাগারের মালিকদের সঙ্গে। আমাদের বিকল্প কিছুও ভাবতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতের কতগুলো রাজ্যে লম্বা সময় আলু সংরক্ষণের জন্য চাষিদের বাড়িতেই বিশেষ এক ধরনের ঘর বানানো হয়। বাংলাদেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আগ্রহে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলু উৎপাদন অঞ্চলে এরকম কিছু ঘর তৈরির পরিকল্পনা নেয়। তারা এটার নাম দেয় ‘অহিমায়িত মডেল ঘর’। নওগাঁর ধামইরহাটের আলমপুরে এরকমের একটা ঘর দেখেছিলাম। 

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলছে, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত মিনি কোল্ড স্টোরেজ। তাদের নকশা করা ঘরে ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণে কৃষকের সাশ্রয় হবে বছরে প্রায় দেড় লাখ টাকা। একটি অহিমায়িত ঘর তৈরি করলে ১৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। একেকটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। খুব সহজেই এসব ঘরে আলু চার থেকে ছয় মাস সংরক্ষণ করা যায়। এতে প্রতিবছরে একেকজন আলুচাষির দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকা হিমাগার খরচ সাশ্রয় হবে। তাছাড়া এসব ঘর থেকে চাষি ইচ্ছামতো আলু বিক্রি করতে পাবেন। কোল্ড স্টোরেজের আলু রাখলে অনেক সময় আলু মিষ্টি হয়ে যায়, কিন্তু এই ঘরে সে সুযোগ নেই। অহেতুক পোকামাকড়ের আক্রমণ, পচন ধরা ও গন্ধও ছড়ায় না।

আমরা মনে করি, আলু চাষীদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। তাদের এবার আলু চাল নিয়ে তাদের মনে যে শঙ্কা জেগেছে- তা দূর করতে হবে। আলু চাষিদের রক্ষায় সরকারকে আলু রপ্তানি বাড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে এবং তা করতে হবে অত্যন্ত দ্রুত। হিমাগারগুলোর ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। আলু নিয়ে যেকোনো কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।


ড. মিহির কুমার রায়

অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতিবিদ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা