গণহত্যার রায়
মেশকাত সাদিক
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১০ পিএম
১৩ নভেম্বর ছিল মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক হাসিনার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের দিন। সেই উপলক্ষে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন নাশকতার ছক এঁকেছিল। তার প্রেক্ষিতে সারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিভিন্ন বাড়িতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিসে, শিল্প-কলকারখানায় পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। কোথাও কোথাও মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশের মানুষের মাঝে। কিন্তু ঢাকা লকডাউন পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী একটি দল বস্তুত দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল তাদের আহূত লকডাউন কর্মসূচি এতটা ফ্লপ করবে তা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। কারণ আওয়ামী লীগ মানেই খুনি, বিধ্বংসী। সুতরাং তাদের যেকোনো ধরনের আন্দোলনের ডাক মানুষ জীবন-মরণ হিসেবে গ্রহণ করে। তাহলে এবার কেন টাকাপয়সা দিয়ে ছিন্নমূল মানুষ, বস্তির ছেলে ও টোকাইদের দিয়ে কিছু বিচ্ছিন্ন আক্রমণ ছাড়া আর কোনোকিছু সফলতা এলো না।
কেন এমন হলো? তা একটি বড় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোই স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে ভোটে নির্বাচিত হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কোনোবারই নিরপেক্ষ-সুষ্ঠু-স্বচ্ছ নির্বাচনে জয় লাভ করেনি। তারা যে কটি নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এসেছে সেগুলো ছিল সর্বৈব পাতানো নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হলেও বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রদেয় ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতায়, প্রশাসনযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্বেই নির্ধারিত ফলাফল ঘোষণা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়। যে কারণে বাস্তবিক পক্ষে সাধারণ মানুষের ভিতরে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কখনও ছিল না। এখনও নেই।
আওয়ামী লীগের আন্দোলন মানেই কিছু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও কার্যকলাপ, ভ্রাম্যমাণ নাশকতা, নিরপরাধ নিরীহ দোকানপাট ব্যবসাক্ষেত্রে আক্রমণ। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশে মনে হয় শতকরা ৫০ ভাগ মানুষই আওয়ামী লীগের কঠোর সমর্থক। বিষয়টি আদৌ তা নয়। আওয়ামী লীগকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ কঠোরভাবে সমর্থন করে। এ কথা সত্য যে, এই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে একটি কাল্ট বা ধর্ম হিসেবে মানে। যে ধর্মের অবতার শেখ মুজিবুর রহমান। তাদের প্রভু দিল্লির মসনদের প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ তাদের প্রভু থাকেন দিল্লিতে। এই আওয়ামী মৌলবাদী সমর্থকগণ যেকোনো পরিস্থিতিতে রাজপথে নামতে পারে। প্রাণ দিতে পারে। কারণ তারা আওয়ামী ধর্মে দীক্ষিত। এর বাইরে তাদের সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সমর্থক নেই। যারা যেকোনো মুহূর্তে রাজপথ কাঁপিয়ে দিতে পারে। অবরোধ করতে পারে। যেকোনো সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে নামিয়ে আনতে পারে এমন সমর্থক নেই।
১৩ নভেম্বর তারা ঢাকাকেন্দ্রিক যে লকডাউন দেয় সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিল অপ্রতুল। প্রস্তুতি ছিল না বললেই চলে। সেনা সদস্যদের তেমন দেখা যায়নি। পত্রপত্রিকা মারফত জেনেছিলাম বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু ১৩ নভেম্বর ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া গমনকালে কোথাও বিজিবি বা সেনা সদস্যের দেখা পাওয়া গেল না। এটি হতাশাব্যঞ্জক ও রীতিমতো আতঙ্কের।
সত্যিকার অর্থে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তেমন উপস্থিতি না থাকলেও জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে রাজপথে নামেনি। জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন লকডাউনের বিরুদ্ধে কিছু মিছিল-মিটিং করেছে। বিএনপির উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি। এরপরও আওয়ামী লীগের সমর্থনে কোনো মিছিল-মিটিং হলো না কেন? কারণ সাধারণ জনগণের মাঝে এদের গ্রহণযোগ্যতা নেই।
চলতি পথে ফরিদপুর নেমে একটি ডাবের দোকান থেকে ডাব কিনলাম। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আজকে আন্দোলন কেমন হলো? তিনি বললেন, তেমন কিছু না। আমি ইচ্ছা করে বললাম, কেন শেখ হাসিনা তো অনেক উন্নয়ন করেছে। এত সহজে মানুষ ভুলে গেল? তিনি জবাবে বললেন, উন্নয়ন দিয়ে কী হবে? সে তো গুলি করে মানুষ মেরে ফেলেছে। এতে বোঝা গেল, হাসিনার এই মানুষ হত্যাকে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।
হাসিনার ইহকাল বলতে টুঙ্গিপাড়া। আর সে মনে করে পরকাল বলতে দিল্লি। অতএব সে তার ইহকাল, পরকাল ও ১৫টি ব্রিফকেস ভর্তি বাংলাদেশের মানুষের রক্ত বিক্রি করা ডলার নিয়ে পালিয়েছে। এটাই তার সম্বল। এসব নিয়েই সে সুখে-শান্তিতে আছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে সামান্য কিছু ডলার ভাঙিয়ে পাঁচ-দশ হাজার করে টাকা দিয়ে নিরীহ মানুষকে বলে, পেট্রোল বোমা মেরে আসো। কেউ কেউ বোমা মারছেও। এই ঝুঁকি, কেন নিচ্ছে তারা? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন তাদের নজরদারিতে রাখতে পারছে না।
যদি এমন হয়, তাহলে আগামীকাল ১৭ নভেম্বর তারিখে যে রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে তার আগে এবং পরে আওয়ামী লীগ বড় অঘটন ঘটিয়ে ছাড়তে পারে। তাই মহাপ্রস্তুতি গ্রহণের সময় এখনই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি যথোপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে কঠোর হাতে দমন না করে তাহলে জনসাধারণের জীবনে অস্বস্তি, আতঙ্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
কী হতে পারে হাসিনার রায় : সামান্য সচেতন মানুষও নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারে যে, ফাঁসির রায় ছাড়া হাসিনার ললাটে আর কোনো বিকল্প নেই। যে পরিমাণ গুম-খুন, হত্যা-রাহাজানি, লাশ পোড়ানো, শাপলা চত্বর গণহত্যা, শাহবাগীদের দিয়ে আলেম-ওলামা হত্যা, পুলিশকে গুলি করে হত্যা করে আন্দোলনকারীদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া, এত এত অপরাধের অকাট্য দলিল থাকায় সহজেই বলা যায়, একবার নয় হাসিনার ১০০ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। তথ্য ও যোগাযোগের যুগে কোনো সত্যই লুকানো যায় না। হাসিনার কল রেকর্ডসহ, রাজসাক্ষীর জবানবন্দি ও জাতিসংঘের রিপোর্ট সব মিলিয়ে হাসিনা যে পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত খুনি তার প্রমাণ সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু নিকৃষ্ট আওয়ামী লীগ একবারও আত্মসমালোচনা করে না। তারা মনে করে আওয়ামী লীগ যারা করে না তাদের হত্যা করা কোনো ব্যাপারই না। এটার জন্য আবার কিসের বিচার হবে? এমন এক ধরনের পৈশাচিকতা ও দাম্ভিকতা আওয়ামী লীগের মধ্যে এখনও রয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্য চরম শিক্ষা কাজী নজরুলের কবিতায় লক্ষ করা যায় :
‘কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,
আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।
আজি সম্রাট কালি সে বন্দী,
কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দ্বী!
কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,
তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ যারে করে পদাহত!’
তবে আওয়ামী লীগকে সহজ হিসেবে গ্রহণ করা সরকারের জন্য ব্যর্থতার পরিচয় হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদা-তৎপরতা এবং কঠোরতা নাগরিকের জন্য খুবই জরুরি। সরকারের তরফ থেকে জনগণের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। জনগণের উচিত, যার যার অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগকে ও তাদের ঘোষিত অগণতান্ত্রিক ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপকে প্রতিহত করা। তা না হলে, এই বিন্দু বিন্দু আন্দোলন একসময় সিন্ধুর রূপ নিতে পারে।
বিএনপি ও জামায়াতকে বলছি, মনে রাখবেন আওয়ামী লীগ যদি এই মাটিতে কখনও ক্ষমতায় ফিরতে পারে, তাহলে এবার জিয়াউর রহমানের কবর ঢাকায় রাখবে না। ম্যাডামেরও হাড় তুলে বিচার করার চেষ্টা করবে। জামায়াতের তো কারওরই অস্তিত্ব রাখবে না। অতএব সাবধানতার সঙ্গে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করে দেওয়ার মধ্যেই দেশপ্রেম সর্বৈবভাবে নিহিত।
মেশকাত সাদিক
কলাম লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক