ইমেইল থেকে
আল শাহারিয়া
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০২ এএম
বাংলাদেশের উপকূল বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড। একদিকে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য আর অন্যদিকে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির মিতালি। নির্মল এই ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব অভিশাপ। তার নাম লবণাক্ততা। সমুদ্রের নোনা জল আজ শুধু পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মিশে গেছে এই অঞ্চলের মানুষের রক্ত-ঘাম আর প্রতিদিনের সংগ্রামে। সেই সংগ্রামের অগ্রভাগে রয়েছেন অদম্য নারীরা। জলবায়ু পরিবর্তন আর মানবসৃষ্ট সংকটকে সঙ্গী করে তারা কীভাবে টিকে থাকেন।
আশির দশকে চিংড়িকে ‘ব্লু গোল্ড’ বা ‘সোনালি সম্ভাবনার’ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রণোদনা আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার হেক্টর ধানক্ষেত রূপান্তরিত হয়েছিল চিংড়ির ঘেরে। রপ্তানি আয় বাড়ার এই লোভনীয় হাতছানিতে লবণাক্ত পানি সচেতনভাবে প্রবেশ করানো হয় মিঠা পানির অঞ্চলে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক চক্রের ছত্রছায়ায় কৃষকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন চলতে থাকে। যে জমিতে একসময় সোনার ধান ফলত, তা ধীরে ধীরে বন্ধ্যা হয়ে পড়ে। এর সামাজিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ক্ষমতা আর অর্থের জোরে কৃষকের জমি দখল হয় এবং একটি ভূমিহীন শ্রেণির জন্ম হয়। এই সামাজিক ভাঙনের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় শিকার হয় নারী ও শিশুরা। যে চিংড়িকে ভাবা হয়েছিল আশীর্বাদ, তা-ই যেন আজ উপকূলের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপের নাম। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে নারীদের।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র অভাব। একটি ওয়াটার ট্যাংক হয়তো একটি গ্রামের পানির চাহিদা মেটাতে পারে, কিন্তু যখন পুরো একটি অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে যায়, তখন প্রয়োজন হয় সমন্বিত এবং বৃহৎ আকারের পরিকল্পনার। যার অভাবে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হয় নারীদের। কারণ, এখানকার প্রায় সব পরিবারের খাবার পানি নারীদেরই সংগ্রহ করা লাগে।
উপকূলীয় নারীর জীবন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। দিনের বড় একটি সময় তাদের লবণাক্ত পানিতে নেমে কাজ করতে হয়, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। লবণাক্ত পানির আগ্রাসন শুধু মাটির গভীরে নয়, নারীর শরীরের গভীরেও পৌঁছেছে। দীর্ঘক্ষণ নোনা পানিতে কাজ করার ফলে নারীদের মধ্যে চর্মরোগ, খোসপাঁচড়া এবং চুলকানি একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো জরায়ুর সংক্রমণ। অপরিষ্কার ও লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে বহু নারী মাসিকের সময় জটিলতায় ভোগেন এবং জরায়ুর ইনফেকশনসহ দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হন। সামাজিক লজ্জা এবং দারিদ্র্যের কারণে তারা সহজে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অপ্রতুলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে একটি নিরাময়যোগ্য রোগও দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই শারীরিক সংকট কেবল নারীদের একার নয়, এটি প্রভাব ফেলে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। অসুস্থ মায়েদের সন্তানেরা প্রায়শই অপুষ্টি আর নানা জটিলতা নিয়ে জন্মায়।
তবে উপকূলের এই নারীরা শুধু পরিস্থিতির শিকার হয়ে বসে থাকেননি। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমালে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে নারীর ওপর, যা তাদের জীবন-সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তোলে। তারা এই লবণাক্ততাকে সঙ্গী করেই খুঁজে নিয়েছেন নতুন পথের দিশা। প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে তারা হয়ে উঠেছেন একেকজন সফল উদ্যোক্তা। যে লবণাক্ততা তাদের ধান চাষ কেড়ে নিয়েছে, সেই নোনা জলেই তারা শুরু করেছেন কাঁকড়া চাষ। পরিবারের পুরুষ সদস্যের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই নারীরা কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখাচ্ছে। ফাতেমার মতো নারীরাও এখন চিংড়ি ঘেরের কাজের পাশাপাশি বাড়ির উঠোনে ছোট খাঁচায় কাঁকড়া চাষ করছেন। এর পাশাপাশি গৃহস্থালির সার্বিক দায়িত্বও তারা সামলান। বাড়ির উঠোনে হাঁস-মুরগি পালন কিংবা গবাদিপশু চরানো তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ। এসব থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ বা পরিবারের ছোটখাটো চাহিদা মেটানো হয়। অনেকে আবার হস্তশিল্পের মতো সৃজনশীল কাজেও নিজেদের যুক্ত করেছেন।
তাদের এই সংগ্রাম কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার লড়াই। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন কীভাবে লবণ-সহনশীল সবজির চাষ করতে হয়। বাড়ির পাশে ছোট্ট এক টুকরো জমিতে তারা পুঁইশাক, লাউ বা ঢেঁড়সের মতো সবজি ফলিয়ে পরিবারের পুষ্টির জোগান দেন।
উপকূলের এই হার না মানা নারীরা শুধু টিকে থাকার যোদ্ধা নন, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সম্মুখসারির পথিকৃৎ। তাদের জীবনগাথা কেবল বঞ্চনা আর কষ্টের নয় বরং সাহস আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত দলিল। বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যখন জলবায়ু ন্যায্যতা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন উপকূলের এই নারীরা তাদের দৈনন্দিন সংগ্রামের মাধ্যমে সেই ন্যায়ের বাস্তব রূপটি দেখিয়ে দেন। একেকটি নতুন দিন তাদের জন্য নিয়ে আসে একেকটি নতুন লড়াইয়ের আহ্বান। আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা প্রমাণ করেনÑ জীবন যতই কঠিন হোক না কেন, সংগ্রামের মাধ্যমে জয়ী হওয়া সম্ভব। তাদের এই অদম্য মানসিকতা আর অভিযোজনের ক্ষমতা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক অশেষ অনুপ্রেরণার উৎস।
আল শাহারিয়া
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর