× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

সামাজিক অবক্ষয় সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে

মো. নূর হামজা পিয়াস

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৫ এএম

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০০ এএম

সামাজিক অবক্ষয় সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে

আজকাল শহরের ব্যস্ততম সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত নিরাপত্তা নেই। সাধারণ মানুষ এখন দুপুরের আলোতেও ভীত। দোকানদার, পথচারী, এমনকি রিকশাচালকরাও জানেন না কখন তারা ডাকাত দলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যাবেন। জনসচেতনতা থাকলেও পুলিশের উপস্থিতি দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা প্রকাশ্যে সাহস পাচ্ছে। নাগরিকদের মধ্যে এখন এক ধরনের নীরব আতঙ্ক কাজ করছে, যা সমাজে নিরাপত্তাহীনতার স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করছে।

আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অপরাধের পদ্ধতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ডাকাত দলগুলো এখন তাদের পরিকল্পনা, তথ্য আদান-প্রদান এবং নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে। টার্গেট বা লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এই ডিজিটাল দক্ষতা অপরাধীদের শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তারকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তঃজেলা ডাকাত দলগুলো ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের অবস্থান গোপন রাখছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে এই ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের গতিবিধি অনুসরণ করা এখন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার অপরাধের ঝুঁকি এবং জটিলতা উভয়ই বাড়িয়ে দিয়েছে।

ডাকাতির উত্থানের পেছনে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা একটি অন্যতম প্রধান কারণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমান্ত এলাকার দুর্বল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে অবৈধ অস্ত্র, বিশেষ করে দেশি পিস্তল ও ছুরি শহরাঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই অস্ত্রগুলো অপরাধীদের মধ্যে একধরনের আস্থা এবং নির্মমতা এনে দিয়েছে। তারা এখন জানে যে, তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হলে তারা ভয়ানক সহিংসতা প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। ২০২৫ সালের গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, অনেক স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও এখন অস্ত্র ভাড়ায় দিচ্ছে, যা সাধারণ অপরাধীদেরও সহজে ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হতে সাহস জোগাচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের এই বিস্তার জননিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে পুলিশের পক্ষপাতমূলক রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে সাধারণ মানুষ পুলিশকে আর নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখে না। বরং অনেকেই মনে করে পুলিশ এখন জনগণের নয়, নির্দিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরাধীরা জানে ধরা পড়লেও হয়তো পার পেয়ে যাবে। এই আস্থাহীনতা আইনের কাঠামোকেও দুর্বল করে তুলছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দাও অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ১১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে প্রায় ৯.২ শতাংশে। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনে চরম আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অনেকেই জীবিকা নির্বাহের উপায় খুঁজে না পেয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

২০২৪ সালের পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এক অচেনা মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি করছে। অনেক তরুণ সহজে অর্থ উপার্জনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে দেখা যায়, অনেকেরই পূর্বে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না। এই প্রবণতা সামাজিক ভাঙনের প্রতীক।

অপরাধ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকভাবে শেখা আচরণও বটে। অনেক তরুণ এখন এমন বন্ধুমহলে যুক্ত হচ্ছে যারা ডাকাতি, চুরি বা অস্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত। তারা একে অপরের কাছ থেকে এই আচরণ শিখছে। ক্রমে এই অপরাধী দলগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’-এর মতো কাজ করছে, যেখানে ভয় বা লজ্জার জায়গায় গর্ব ও বীরত্ববোধ জন্ম নিচ্ছে।

অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ রাষ্ট্রীয় অবহেলা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা, মামলার বিলম্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত রেকর্ড অনুযায়ী, ডাকাতি মামলার মাত্র ২৩ শতাংশ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলো বছরের পর বছর বিচারাধীন। এই বিলম্বই অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অন্যের কষ্ট বা ভয়াবহতা আমাদের আর স্পর্শ করে না। পথের মাঝখানে ডাকাতি হচ্ছে, মানুষ চিৎকার করছে, কিন্তু আশপাশের কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসছে না। মানবিক সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা আজ বিলুপ্তির পথে। এই উদাসীনতা একপ্রকার সামাজিক রোগে পরিণত হয়েছে, যা অপরাধকে আরও সহজ করে দিচ্ছে।

শহর ও গ্রামীণ উভয় অঞ্চলেই বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমনÑ সিসিটিভি নজরদারি, নাইটগার্ড বা অ্যালার্ম সিস্টেম) এখনও যথেষ্ট উন্নত বা সুসংগঠিত নয়। অনেক আবাসিক এলাকা এবং ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে না। ফলে তারা সহজেই ডাকাতদের লক্ষ্যবস্তু হয়। নাইটগার্ড বা পাহারাদারদের কম বেতন, দুর্বল প্রশিক্ষণ এবং অপ্রতুল সরঞ্জাম তাদেরকে ডাকাতির মতো সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলায় অক্ষম করে তোলে। সরকারের উচিত বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।

ডাকাতি বা অপরাধের উত্থান কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয়। রাষ্ট্রকে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো সমাজের নৈতিক পুনর্জাগরণ। প্রত্যেক নাগরিককে তার দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। কারণ একদিন যে ডাকাতির খবর আমরা সংবাদপত্রে পড়ছি, কাল সে আমাদের দরজায়ও কড়া নাড়তে পারে। নিরাপত্তা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয় এটি আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।


মো. নূর হামজা পিয়াস

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা