× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

শীতার্তদের জন্য চাই মানবিক কর্মসূচি

সুমাইয়া সিরাজ সিমি

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৩ এএম

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০০ এএম

শীতার্তদের জন্য চাই মানবিক কর্মসূচি

আবহাওয়ার পালাবদলে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে, যেমন পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রাজশাহীÑ এই জেলাগুলোতে শীতের তীব্রতা অনুভূত হয় সর্বাধিক। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসজুড়ে এই তীব্রতা দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বিরাজ করে। শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা এই জীবনগুলো শীতের প্রতিটি পরতে অসহায়ত্বের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

শীতকাল মানেই ঠান্ডাজনিত রোগের ব্যাপক বিস্তার। প্রান্তিক জনজীবনে এর প্রকোপ বহু গুণ বেশি। এই সময়ে সর্দিকাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, সাইনোসাইটিস, অ্যাজমা, চর্মরোগ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়াসহ নানা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা, এরপরই আসে বৃদ্ধ ও নারীরা।

চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষজনের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। সামান্য চিকিৎসা খরচ মেটানোর সামর্থ্য যাদের নেই, দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করতেই যাদের দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, তাদের পক্ষে শীত থেকে বাঁচতে উন্নতমানের গরম পোশাক পরিধান করা কিংবা রোগের সঠিক চিকিৎসা করানো প্রায় অসম্ভব। অভাবের তাড়নায় বহু বাবা-মা তাদের শিশুদের জন্য ন্যূনতম শীতবস্ত্রের জোগান দিতে পারেন না। ফলে শিশুরা সহজেই ঠান্ডার শিকার হয় এবং মারাত্মক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে সামান্য চিকিৎসা জুটলেও, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে এখনও উন্নত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি প্রকট। স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং মানসম্পন্ন ওষুধের অপ্রতুলতা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার প্রধান অন্তরায়। সরকারি হাসপাতালগুলোর বাইরে গিয়ে বেসরকারি বা মানসম্মত চিকিৎসা নেওয়া তাদের সাধ্যের বাইরে। ফলে, অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে মানহীন বা হাতুড়ে চিকিৎসার দ্বারস্থ হন, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। শিশুদের পাশাপাশি বৃদ্ধদের অবস্থাও শোচনীয়। 

শীতের তীব্রতা প্রান্তিক জনজীবনের দৈনন্দিন সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তোলে এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও নড়বড়ে করে দেয়। কুয়াশার চাদরে যখন চারদিক ঢাকা, তখনও জীবিকার টানে মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ে। খেটে খাওয়া শ্রমিকরা খুব ভোরে হালকা আগুনের উষ্ণতা শরীরে মেখে রওনা হন কাজের উদ্দেশ্যে। কৃষক ভোর না হতেই চলে যান জমিতে, হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কাজ করেন ফসলের মাঠে।

পল্লী অঞ্চলের নারীদের জীবন আরও কঠিন। কনকনে ঠান্ডায় ভোরবেলা উঠে তাদের রান্নার কাজ সারতে হয়। সবচেয়ে করুণ চিত্র হলো খাদ্যাভ্যাসে। খুব সকালে রান্না করা খাবার রাতে খাওয়া হয়। কিন্তু দুপুরে রান্না করা খাবার রাতে ঠান্ডা জমে ‘ক্ষীর’ হয়ে থাকে। এই ঠান্ডা খাবার খেয়েই তাদের দিন কাটাতে হয়। ন্যূনতম তাপমাত্রার খাবার খাওয়ার কারণেও তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। শ্রমিক, কৃষক এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষরা শীতের তীব্রতাকে উপেক্ষা করে জীবন-জীবিকার সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। যেটি তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

শীতকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কষ্ট লাঘবের জন্য সরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র (কম্বল) এবং ক্ষেত্রবিশেষে নগদ অর্থ বা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই কার্যক্রম পরিচালিত হলেও, বাস্তবে এর সফলতা নিয়ে নানান প্রশ্ন ওঠে। 

প্রথমত, ত্রাণের অপ্রতুলতা ও বিতরণে সমন্বয়হীনতা একটি বড় সমস্যা। শীতের প্রকোপ শুরু হলেও অনেক সময় কম্বল কেনার প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরি হয় বা নিম্নমানের কম্বল বিতরণের অভিযোগ ওঠে। ফলে সরকারি কম্বল পেয়েও অনেকের শীত নিবারণ হয় না। দ্বিতীয়ত, বিতরণের ক্ষেত্রে প্রকৃত দুস্থদের তালিকা তৈরি এবং তা বিতরণের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই সচ্ছল বা অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালীরা সুবিধা পেয়ে যান, আর সত্যিকারের শীতার্তরা বঞ্চিত হন।

শীতকাল যেন প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের বৈষম্যের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে। সকল উন্নয়ন যখন শহরকেন্দ্রিক, তখন এমন ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হওয়া প্রান্তিক মানুষজন ভাগ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়। নগরায়ণের এই তীব্র স্রোতে অবহেলিতদের পাঁচটি মৌলিক অধিকার (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা) প্রায়শই চাপা পড়ে যায়। ধনীরা তাদের ষোলআনা বুঝে নিলেও গরিবরা প্রায়শই চার আনাও পায় না। আজ আমাদের এই চিরাচরিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে, শহরে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ করাই একমাত্র উন্নয়ন নয়। উন্নয়নের মাপকাঠি হতে হবে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। শহর ও গ্রামের মাঝে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণ অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রকে এখনই এই অবহেলিত মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

 গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, সরঞ্জাম এবং ওষুধের জোগান নিশ্চিত করা। শীতজনিত রোগ মোকাবিলায় বিশেষ স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে। প্রয়োজনীয় অপেক্ষাকৃত বেশি দরের ওষুধ সরবরাহ করতে হবে শিশুদের জন্য। ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কম্বল ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং বিতরণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সমাজের বিত্তশালীদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রান্তিক মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।

যদি দ্রুত এই বৈষম্য নিরসন করা না যায়, তবে প্রতিবছরই আমরা শীতকালে এমন করুণ দৃশ্য দেখতে পাব, যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রের পরিকল্পনার অভাব ও বৈষম্যমূলক নীতির ফল। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। শুধুমাত্র তখনই উন্নয়নের আলো দেশের প্রতিটি কোণে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে, যখন প্রান্তিক মানুষের দুঃখ কমে আসতে শুরু করবে। শুধু মানবিক আবেদন নয়, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রের উচিত এই বৈষম্য দ্রুত দূর করা।


সুমাইয়া সিরাজ সিমি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা