দুর্ঘটনা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১৭ এএম
গত অক্টোবর মাসে সড়কে ৪৬৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গড় হিসাবে প্রতিদিন ১৫ জনের বেশি। ১২ নভেম্বর বুধবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। উল্লেখ্য, সংগঠনটি প্রতি মাসে দেশের বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে এ ধরনের প্রতিবেদনটি তৈরি করে। এভাবে সড়কে প্রাণহানির সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যানই নয়, এটি অসংখ্য পরিবারের কান্না, জীবনের অসমাপ্ত গল্প। প্রতি মাসেই এমন মৃত্যু যেন আমাদের সমাজের নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি যেন স্থায়ী সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। প্রশ্ন জাগে, মৃত্যুর এই মিছিল থামবে কবে?
১৩ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘অক্টোবরে সড়কে ঝরল ৪৬৯ প্রাণ’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু সড়কেই নয়, অক্টোবর মাসে রেল এবং নৌপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলপথে ৫২টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪৭ জন, আহত ৩০ জন। আর নৌপথে ১১টি দুর্ঘটনায় নিহত ১২ জন, নিখোঁজ একজন। সব মিলিয়ে মোট ৫৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫২৮ জন এবং আহত ১ হাজার ৩১০ জন। বিভাগ অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগেÑ ১২৬টি দুর্ঘটনায় ১৩০ জন নিহত ও ৩৪৩ জন আহত হয়েছে। বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। ১৭০টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন নিহত ও ১৩৭ জন আহত হয়েছে। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া মোট ৭৭২টি যানবাহনের পরিচয় পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ জন নারী এবং ৩৫ জন শিশু, ৩৫ জন শিক্ষার্থী ও ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই জানা। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, অদক্ষ চালক, যানবাহনের ফিটনেসহীনতা, রাস্তার অনিয়মিত নকশা, ট্রাফিক আইন না মানা, যাত্রী ও পথচারীর অসচেতনতাÑ সবই সড়কে প্রাণঘাতীর পেছনে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সমস্যা জানলেও সমাধান বাস্তবায়নের আন্তরিকতার ঘাটতি যেন বরাবরের। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শোনা যায়, পরে এই উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
সড়কে প্রতিদিনের রক্তপাত আমাদের সকলের মানবিক বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে নয়, বরং সেই সড়কে মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাতেই নিহিত। তাই আমরা মনে করি, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ অনেক আশার সঞ্চার করেছিল, কিন্তু বাস্তবে তার কার্যকারিতা আজও প্রশ্নবিদ্ধ। চালকের দোষে দুর্ঘটনা ঘটলে মামলা হয়, কিন্তু বিচার শেষ হয় কয়টি? আবার অনেক সময় প্রভাবশালী মালিকদের চাপে মামলাগুলো গায়েব হওয়ার কথাও শোনা যায়। এভাবে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালক ও পরিবহন মালিকদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
এবারও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যাত্রী কল্যাণ সমিতি বেশকিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যেÑ ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক দ্রুত মেরামত করা, রাতে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ও যানবাহনের ডিজিটাল ফিটনেস প্রদান, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা এবং মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার আমদানি ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করা। বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর সংগঠনটি এই সুপারিশ তুলে ধরেছে। আশা করি, সুপারিশগুলো সরকারের দৃষ্টিগোচর হবে।
আমরা আরও মনে করি, সড়ক নিরাপত্তা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়। এটি একটি সার্বিক সচেতনতা ও সংস্কৃতি গঠনের বিষয়। চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, ফিটনেস সার্টিফিকেটে জালিয়াতি বন্ধ করা, রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং ও বাজার উচ্ছেদ করা, ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করাÑ এসব পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। স্কুল থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত ট্রাফিক সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। মনে রাখা দরকার, সড়ক-মহাসড়ককে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে সঁপে দিয়ে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা কমানো যাবে না।
অক্টোবরের ৪৬৯ প্রাণ হারানো মানুষগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ সড়ক নিরাপত্তা এখনই নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী মাসগুলোয় সংখ্যাটি আরও দীর্ঘ হবে। সময় এসেছে কথার নয়, কার্যকর পদক্ষেপের। আমরা মনে করি, আইন মানা, সচেতনতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি ও শাস্তির নিশ্চয়তাÑ এই চারটি স্তম্ভেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ সড়কব্যবস্থা। মৃত্যু ফাঁদ নয়, সড়ক হোক জীবনের পথ হয়Ñ এটাই আমাদের প্রত্যাশা।