× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

তৃতীয় বিশ্বের অপরাজনীতি এখন উন্নত দেশেও

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১৪ এএম

তৃতীয় বিশ্বের অপরাজনীতি এখন উন্নত দেশেও

আমার লেখার বিষয় ব্যাংক, ফাইন্যান্স এবং অর্থনীতি। সব সময় চেষ্টা করি নিজের বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে। কিন্তু যতই চেষ্টা করি না কেন, মাঝেমধ্যেই এই সীমা লঙ্ঘন হয়ে যায়। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও, ব্যাংক ফাইন্যান্স এবং অর্থনীতির বাইরে, এমনকি রাজনীতির কিছু বিষয় লেখায় চলে আসে। কেননা চোখের সামনে রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটে, যা নিয়ে কিছু না লিখে থাকাও যায় না। সেরকমই একটি ঘটনা ঘটেছে কানাডার রাজনীতিতে, যেখানে দুজন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নিজ দল ত্যাগ করে সরকারি দলে যোগদান করেছেন। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির রাজনীতি হলেও, মূলত এটি একটি অপরাজনীতি, যা দেখে আমরা বড় হয়েছি।

এক বছর আগেও কানাডার বর্তমান ক্ষমতাসীন দল, লিবারেল পার্টির সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টন ট্রুডোর নেতৃত্বে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থায় ছিল এবং নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কায় পড়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট নামকরা অর্থনীতিবিদ এবং বৃহৎ দুটো অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের দায়িত্ব পালন করা অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মার্ক কার্নির ক্যারিশমায় ডুবন্ত লিবারেল পার্টি শক্তভাবেই ঘুরে দাঁড়ায় এবং নির্বাচনে জয়লাভ করে, যদিও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি। মাত্র দুই সিট কম পাওয়ায় গত দুই বারের মতো লিবারেল পার্টি এবারও সংখ্যালঘু সরকার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে। ইতঃপূর্বে লিবারেল পার্টি অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল এবং এজন্য বেশ মূল্যও দিতে হয়েছে। এই যে লিবারেল পার্টির শোচনীয় অবস্থা হয়েছিল এবং কানাডায় যে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা। বিষয়গুলো সম্পর্কে কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বেশ ভালোভাবেই জানতেন। তাইতো তিনি অন্য কোনো দলের সমর্থন গ্রহণের চেষ্টা করেননি। কিন্তু সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে তার দুজন এমপি লাগবে। 

এরকম অবস্থায় জাতীয় বাজেট পাস করার জন্য মার্ক কার্নির দুজন এমপির প্রয়োজন। আর বাজেট পাস না হওয়ার অর্থ হচ্ছে সরকার অনাস্থায় পড়ে যাওয়া, যার পরিণতি আবার নতুন নির্বাচন। ঠিক এরকম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের দুজন এমপি মার্ক কার্নিকে সহায়তা করতে এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার সহায়ক হিসেবে আবির্ভাব হলেন। এই দুজন এমপি তাদের দীর্ঘদিনের কনজারভেটিভ পার্টি ত্যাগ করে মার্ক কার্নির লিবারেল পার্টিতে যোগদান করলেন। ফলে লিবারেল পার্টির বাজেটও পাস হয়ে গেল এবং সেই সঙ্গে মার্ক কার্নির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও নিশ্চিত হয়ে গেল।

যে দুজন এমপি তাদের দীর্ঘদিনের দল, বিশেষ করে যে দলের টিকিট নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল ত্যাগ করে ক্ষমতাসীন দলে যোগদান করার কারণ হিসেবে সেই কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়ারে পলিভারের নেতৃত্বের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। খুবই স্বাভাবিক। যখন কেউ দল পরিবর্তন করে, তখন সে এই একটি সাধারণ অভিযোগই দিয়ে থাকে, তা সে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশই হোক, আর কানাডার মতো উন্নত দেশই হোক। কিন্তু এই দুজন দলত্যাগী এমপি, যারা দীর্ঘদিন কনজারভেটিভ পার্টির রাজনীতি করেছেন, তারা কি পিয়ারে পলিভারের নেতৃত্বের দুর্বলতার বিষয়টি আগে বোঝেননি। আমরা যদি ধরেও নেই যে সেই দুজন এমপি ভেবেছিলেন যে পিয়ারে পলিভারের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় যাবে। কিন্তু যখন ক্ষমতায় যেতে পারল না এবং ব্যর্থতার দায় নিয়ে পিয়ারে পলিভার নেতৃত্বের পদ থেকে পদত্যাগও করল না, তখন সেই এমপিদের ক্ষোভ থাকতেই পারে। এ কারণে তারা তো নির্বাচনের পর বা সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করে অন্য দলে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু সেটি না করে দিব্যি সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে মার্ক কার্নির কঠিন সময়ে নিজ দল ত্যাগ করে একেবারে সরাসরি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলে যোগদান করলেন। 

কনজারভেটিভ পার্টির এই দুজন এমপি নিজ দল ত্যাগ করে যে মার্ক কার্নির লিবারেল পার্টিতে যোগদান করলেন, সেটি কি নেহায়েতই পিয়ারে পলিভারের ব্যর্থতার কারণে, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। এ বিষয়ে সঠিক তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে নেই। তবে খালি চোখে দেখলে বিষয়টি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি পদ্ধতি এবং হয়তো পিয়ারে পলিভারের ব্যর্থতার কারণেই এই দুজন এমপি এমনটা করেছেন। কিন্তু এত বড় সিদ্ধান্তের পিছনে যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা যারা বর্তমান সময়ের রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, তারা অনায়াসেই আঁচ করতে পারবেন। তা ছাড়া কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক নেতা এবং জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ এন্দ্রু শেয়ার তো স্পষ্ট করেই অভিযোগ করেছেন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি কিছুটা কৌশল অবলম্বন করে এবং এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে এই দুজন এমপিকে ভাগিয়ে এনেছেন। আবার পিয়ারে পলিভারও কম যান নাই। তিনি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েও নিজের সংসদ এলাকার প্রতি সেভাবে নজর দেননি। সেই নির্বাচনে নিজে দলকে জেতাতে পারেন নাই এবং নিজেও জিততে পারেন নাই। তারপরও দলের নেতৃত্ব থেকে সরে না দাঁড়িয়ে, উল্টো নিজের দলের নির্বাচিত এক এমপির ছেড়ে দেওয়া এলাকা থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। 

এখানেই শেষ নয়। পিয়ারে পলিভারকে পরাজিত করার জন্য একদল মানুষ উঠেপড়ে লেগেছিল। তারা পিয়ারে পলিভারের বিপক্ষে শতাধিক প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে পলিভারকে পরাজিত করার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে। কেননা আমাদের দেশের মতো কানাডায় মার্কা নিয়ে নির্বাচন হয় না। এখানে দলের প্রার্থী হলেও, প্রত্যেক প্রার্থীকে নিজের নামে নির্বাচন করতে হয়। ভোটারদের পার্টির পক্ষে ভোট দিলেও প্রত্যেক এলাকার প্রার্থীর নামের পাশে টিক চিহ্ন দিয়ে ভোট প্রদান করতে হয়। তাই একটি নির্বাচনী এলাকায় যখন শতাধিক প্রার্থী থাকে, তখন পাঁচ থেকে সাত পাতার ব্যালট পেপার হয়, যেখানে উল্লিখিত শতাধিক প্রার্থীর নামের তালিকা থেকে নিজের পছন্দের প্রার্থীর নাম খুঁজে ভোট প্রদান করতে হয়, যা একেবারেই দুরূহ কাজ। ফলে অধিকাংশ ভোটার বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। পিয়ারে পলিভারের পুনর্নির্বাচনের এলাকায়ও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। তবে শুনেছি যে এবার নির্বাচন কমিশন সেই এলাকার ভোটারদের শতাধিক প্রার্থীর তালিকা থেকে নিজের পছন্দের প্রার্থীর নাম কষ্ট করে না খুঁজে, সেই ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নাম লিখে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। ফলে এভাবে শতাধিক প্রার্থীকে দাঁড় করিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীকে পরাজিত করানোর অপচেষ্টা খুব একটা কাজে আসেনি। 

এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্প্রতি উন্নত বিশ্বে, এমনকি কানাডাতেও ঘটছে, যা আগে কখনও কল্পনাও করা যায়নি। একটি দলের এক এমপি দীর্ঘদিন তার নির্বাচনী এলাকা থেকে বিজয়ী হয়ে আসছেন। কিন্তু গত নির্বাচনের সময় কোনো এক রহস্যজনক কারণে তাকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি। এসব দেশে সিটিং এমপিকে নির্বাচনের জন্য নমিনেশন না দেওয়ার নজির খুব একটা নেই। এর কারণ জানতে গিয়ে যা জানা গেল তা হচ্ছে সেই এমপি অন্য দেশের একটি জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের জন্য প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছিলেন। আবার সেই দলের আরেক এমপি সংসদে দাঁড়িয়ে অন্য আরেকটি দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। একই ধরনের অভিযোগের কারণে আগামী নির্বাচনের সময় তার নমিনেশনের কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এসব ঘটনা যে শুধু কানাডায় ঘটছে তেমন নয়। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই এরকম ঘটনা ঘটছে। আমেরিকার রাজনীতির কী অবস্থা তা তো আজ বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট। ট্রাম্পের গত মেয়াদের ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা, বাইডেনের সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আরেক যোগ্য প্রার্থী কমলা হারিসকে অল্প সময় দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামিয়ে অসুবিধাজনক অবস্থায় ফেলে দেওয়া, ‘আমেরিকা সবার আগে’ স্লোগানের মাধ্যমে জাতিগত বিভেদ উস্কে দিয়ে ট্রাম্পের পুনরায় ভূমিধ্স বিজয়, এসবকিছু যে স্বচ্ছ এবং সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা নয়, তা বিশ্ববাসী বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছে। সর্বশেষ নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচন নিয়ে তো জাতিগত বিভেদের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেল। আর আমরাও এসব দেখে ছাগলের তৃতীয় বাচ্চার মতো না বুঝেই লাফায়ে মজা নিতে থাকি। একটি সিটির মেয়রের ক্ষমতা সম্পর্কে যদি সম্যক ধারণা থাকত, তাহলে এমন নাচানাচির ঘটনা ঘটত না। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশও সবারই জানা। অবস্থা এমন যে একজন প্রধানমন্ত্রীও পূর্ণমেয়াদ পার করতে পারছে না।

সবচেয়ে মজার ব্যাপারে হচ্ছে এর সবকিছুই ঘটছে গণতন্ত্রের নামে। এসবই এখন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সত্যি বলতে কি গণতন্ত্রের নামে এসব ঘটনা দেখে আমরা মোটেই অবাক হই না। কেননা আমরা যে দেশে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি, সে দেশে এসব ঘটনা নিয়মিতই ঘটে এবং আমরা এসব ঘটনার সঙ্গে পরিচিত। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের নামে এসব ঘটনা ঘটলেও- এগুলোকে আমরা অপরাজনীতি বলেই জানি। কিন্তু এখন দেখছি উন্নয়নশীল দেশের অপরাজনীতি উন্নত বিশ্বেও নিয়মিত ঘটছে এবং কানাডায় তো বেশ ভালোভাবেই ঘটছে। উন্নত বিশ্বে যে অপরাজনীতির সূচনা হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।


নিরঞ্জন রায় 

সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা