রূপপুর নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট
রুশো তাহের
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১০ এএম
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা কতটা নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে, সেই প্রশ্নটি জোরেশোরে উত্থাপিত হয়েছে এমনকি এখনও হচ্ছে। যখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জমকালো কমিশনিংয়ের দ্বারপ্রান্তে। সচেতন মহলও নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের দুর্ঘটনার ইতিহাস পর্যালোচনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতাকে বিশেষ ভিত দিয়েছিল। এতে কাজও হয়েছে। মানে সাধারণ এমনকি শিক্ষিতজনেও পরমাণুভীতি গ্রথিত হয়েছে। কারও কারও শঙ্কা আমার বসবাসÑ রূপপুর থেকে কত দূরেÑ বোঝাতে ও বুঝতে চায় রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের বিস্ফোরণে তার আবাসস্থল রেডিয়েশন থেকে নিরাপদ থাকবে তো? এই ভাবনায় আগুনে ঘি ঢালার মতো পৃথিবীর তিনটি বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা। যথা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল ও আমেরিকার থ্রি-মাইল আইল্যান্ড নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিস্ফোরণ এবং সর্বশেষ জাপানের ফুকুসিমার দাইচিতে ১১ মার্চ ২০১১ সুনামিজনিত আঘাতে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিস্ফোরণের ঘটনা। বস্তুত উপর্যুক্ত তিনটি দুর্ঘটনা বিশেষত, জাপানের ফুকুসিমার দাইচিতে ১১ মার্চ ২০১১ সুনামিজনিত আঘাতে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিস্ফোরণের ঘটনার ব্যবহারে পরমাণুভীতি তথা রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ ও পরিচালনা বিরোধিতায় মারাত্মকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কী বিষয়টি তলিয়ে দেখেছিÑ নিদেনপক্ষে সেই প্রচেষ্টা চালিয়েছি কখনও? সেই দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পসহ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কারিগরি দুর্ঘটনা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের সময়েই প্রস্তাবিত স্থানটির মাটির অবস্থা, ভূতাত্ত্বিক ও হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকালে কিংবা কেন্দ্র হতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকালে সাইটের মাটির সম্ভাব্য সব ধরনের পরিবর্তন, ভূ-ত্বকের ওপরের অংশে সৃষ্ট গহ্বর, ভূমিক্ষয়, ভূমিকম্প, বন্যা, সাইক্লোন, টর্নেডো, বজ্রপাতসহ সকল ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এমনকি মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ঘটনাসংক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়াদি বিচার-বিশ্লেষণ করে সাইট নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। আর রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত সব দিক কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। সাইটের নিরাপত্তাসংক্রান্ত কারিগরি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি, সংক্ষেপে আইএইএ’র গাইড লাইন, দেশীয় এতদসংক্রান্ত আইনি ও কারিগরি বাধ্যবাধকতা এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশ রুশ ফেডারেশনের এতদসংক্রান্ত আইনি ও কারিগরি বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট মূল্যায়নে রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের সাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। উপরন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক এটেস্টেশন প্রক্রিয়ায়, পদ্ধতিগত ইউনিফিকেশন নিশ্চিত করতে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার কোডসমূহের মাধ্যমে সম্ভাব্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, সংক্ষেপে পিএসএ’র মাধ্যমে সাইট চূড়ান্ত করা হয়।
রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত সকল সমীক্ষা ও সাইট সেফটি স্টাডির আলোকে সাইট সেফটি রিপোর্ট প্রণয়ন করা হয়েছে। পরন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কারিগরি দুর্ঘটনা মোকাবিলায় জরুরি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিস্তারিত প্রতিবেদন ও প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার তথ্যাবলি উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক ছিল, যা যথারীতি প্রতিপালন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেফটি ফার্স্ট এই মূলনীতি গ্রহণ করেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট নির্বাচন করেছে। সাইটের নিরাপত্তা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত যাবতীয় আন্তর্জাতিক কারিগরি ও আইনি বিষয়াদি যথাযথভাবে অনুসরণ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) গাইড লাইন ও আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালন, ফুকুশিমা-১ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা হতে অর্জিত শিক্ষাসহ ফুকুশিমা দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরে আইএইএ প্রিপারেটরি মিশন কর্তৃক রূপপুর এনপিপি এলাকা মূল্যায়ন সংক্রান্ত Geotechnical aspects and Geomorphology, Hydrologycal hayards and River morphology সুপারিশমালা বিবেচনা করে রুশ ফেডারেশনের এনপিপি ডিজাইন ইনস্টিটিটিউটের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভে এবং পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পাদন করা হয়েছে। সকল শর্ত পুরিত হওয়ার পর প্রকল্প এলাকাটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রযুক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে রুশ ফেডারেশন নির্মিত সর্বাধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নভোভরনেঝ-২ কে রূপপুর এনপিপি’র রেফারেন্স প্ল্যান্ট হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। উল্লিখিত রেফারেন্স প্ল্যান্ট’র আদলে আরও অধিকতর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিজাইনে সকল ধরনের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সক্ষম রিঅ্যাক্টর নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা এমনভাবেই প্রণয়ন করা হচ্ছে যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সক্ষমতার সঙ্গে নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং রিঅ্যাক্টর কন্টেইনমেন্টের বাইরে তেজস্ক্রিয়তা না ছড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রূপপুরে নির্মিত ভিভিইআর-১২০০ টাইপ রিঅ্যাক্টরে পাঁচ স্তর যথাÑ ফুয়েল প্লেট, ফুয়েল ক্লডিং, প্রেসার ভেসেল, ফার্স্ট কন্টেইনমেন্ট এবং সেকেন্ড কন্টেইনমেন্ট নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংযুক্ত করা হয়েছে। বিগত ১০০ বছরের বন্যার ইতিহাস পর্যালোচনায় থ্রি-প্লাস প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর নির্বাচন করা হয়েছে। নির্মিত রিঅ্যাক্টর ৮-৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল হবে।
উল্লেখ্য, রিঅ্যাক্টরের ৮০০ মিটারের মধ্যে রেডিয়েশন সহনীয় মাত্রা হতে অধিক হবে না। পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয় এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যথা প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম, হাইড্রোজেন রিকমবাইনার সিস্টেম ব্লাকআউট অবস্থায় ৭২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে কুলিং সিস্টেম সচল রাখা, কোর ক্যাচার প্রভৃতির সমন্বয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই উন্নত ও আধুনিক যে, এটিকে দৈনন্দিন ঝুঁকির পর্যায়ে ফেলা যায়। যেগুলো মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্মে বিবেচনায় আনেন না। উল্লেখ্য, প্রকল্পের পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মনুষ্যসৃষ্টসহ সকল ধরনের কারিগরি দুর্ঘটনা মোকাবিলার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট লাইসেন্স প্রদান করেছিল।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতায় তথা পরমাণুভীতি ছড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়টি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল রুশ ফেডারেশন ফেরত নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। রুশ ফেডারেশন সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত আইজিএ-তে স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল রুশ ফেডারেশনে ফেরত নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আলোচ্য আইজিএ’র ক্রমধারায় স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল রুশ ফেডারেশনে ফেরত নেওয়া এবং সেখানে তা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিশ্চিত করে উভয় দেশের সরকারের মধ্যে একটি এগ্রিমেন্টও অনুস্বাক্ষরিত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহৃত জ্বালানি চুল্লি থেকে বের করে আনার পর এর ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। প্রথমে এগুলোকে রিঅ্যাক্টর বিল্ডিং’র অভ্যন্তরে একটি বিশেষ শীতলীকরণ জলাধারে সর্বোচ্চ ১০ বছর ধরে সংরক্ষণের পর বিশেষ পরিবহন কন্টেইনারের সাহায্যে বিশেষভাবে তৈরি জাহাজযোগে রুশ ফেডারেশনে ফেরত দেওয়া হবে। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট শঙ্কামুক্ত ও নিরাপত্তার বারতা নিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে যাচ্ছে শিগগিরই জমকালো কমিশনিংয়ের মাধ্যমে।
রুশো তাহের
বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক, নির্মাতা ও যোগাযোগ-পরামর্শক