মোংলা রেলপথ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৯ এএম
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৪০ পিএম
বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়। বন্দরটির কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সরকার বহু বছর ধরে নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছে মোংলা পর্যন্ত রেল সংযোগ। উদ্দেশ্য ছিল, মোংলা বন্দর থেকে সারা দেশে ছুটবে পণ্যবাহী ট্রেন। ঘুরবে অর্থনীতির রেলচাকা। কিন্তু বাস্তবে আজ সেই রেলচাকা ঘুরছে ধীরে, তাও শুধু একটিমাত্র যাত্রীবাহী ট্রেনে। অথচ চার হাজার ২৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে রেললাইন হয়েছে, সেতু হয়েছে, চকচকে রেলস্টেশন দাঁড়িয়ে থাকলেও মোংলা বন্দর থেকে এ-পথে চলে না পণ্যবাহী ট্রেন। ফলে রেলওয়ের বিশাল অবকাঠামো আজ অলস পড়ে আছে। মোংলা রেলপথ পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে।
১২ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘হাজার কোটির রেললাইনে চলে না পণ্যবাহী ট্রেন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে প্রকল্প শুরু হয়েছিল ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলে নানা টালবাহানায় কেটে যায় পুরো একযুগ। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। তিন বছরের প্রকল্প মেয়াদ বাড়ে চার দফায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের পহেলা নভেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হয়েছে ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন, ৯টি স্টেশন, ১০৭টি ছোট সেতু, ৯টি আন্ডারপাস ও ২৪৬টি কালভার্ট। সবচেয়ে বড় স্থাপনা হলো রূপসা নদীর ওপর ৫.১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসেতু। সরকারের লক্ষ্য ছিলÑ এ রেললাইন চালুর মাধ্যমে মোংলা বন্দর হবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র। কিন্তু উদ্বোধনের পরের দেড় বছরে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সময়ে মাত্র ১৫টি অনিয়মিত পণ্যবাহী ট্রেন চলেছে, যা থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত সময়েই সব ট্রেন চলেছে। ২৫ জুনের পর থেকে কোনো মালবাহী ট্রেন আর চলেনি। রেলওয়ে, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবকেই এই স্থবিরতার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লার্সেন অ্যান্ড টার্বো এবং ইরকন ইন্টারন্যাশনাল এই রেললাইন তৈরি করে। প্রকল্পে ভারতের কাছ থেকে এসেছে তিন হাজার ৩০০ কোটি রুপির ঋণ-সহায়তা।
রেললাইন চালুর পর ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসবে। তাদের পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও খরচ দুই-ই কমবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এখনও বন্দরের পণ্য ট্রাকে বা লরিতে করে খুলনা কিংবা রাজধানীর দিকে নিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ বাড়ছে, আর রেললাইনে ধুলো পড়ছে। এ অবস্থায় মোংলার সম্ভাবনাময় বন্দর কার্যক্রমও পূর্ণতা পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই রেলপথ শুধু বন্দর নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প ও কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে। এখন উদ্যোগ না নিলে এটি আরেকটি ব্যর্থ মেগা প্রকল্পে পরিণত হবে। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারকে এখনই সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ করা উচিত, যাতে রেলওয়ে, বন্দর ও ব্যবসায়ীরা একই ছাতার নিচে কাজ করতে পারে।
এ কথা সত্য যে, মোংলা রেল প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ, যার একটা বড় অংশই ঋণের। বাকিটা দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকা। সেই টাকা দিয়ে নির্মিত লাইন যদি অলস পড়ে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়। এ কথা সত্য যে, দেশের রেলওয়ে খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। নতুন নতুন রেললাইন, স্টেশন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও লজিস্টিক অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য ছিল রেল পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও লাভজনক করা, যাতে পণ্য পরিবহনে ব্যয় কমে এবং সড়কপথের ওপর চাপ হ্রাস পায়। এমনিতেও রেল পরিবহন সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতেও কার্যকর। আমরাও মনে করি, যেহেতু দেশের পণ্য পরিবহনে ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, তখন রেলব্যবস্থার বিকল্প নেই।
এখন সময় এসেছে মোংলা রেলপথকে পণ্য পরিবহনের মূলধারায় আনার। এই ক্ষেত্রে মোংলা বন্দর থেকে খুলনা, যশোর, ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রেন চালু করতে হবে। পাশাপাশি রেল টার্মিনাল, ওয়াগন ও কন্টেইনার ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে। বেসরকারি খাতকেও এই উদ্যোগে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে রেল পরিবহন ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হয়। আমরা বলতে চাই, হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ যদি অচল পড়ে থাকে, তবে সেটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থতাও। তাই মোংলা রেললাইনকে পণ্য পরিবহন উপযোগী করে সচল করা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল রেলওয়ের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্যও অপরিহার্য। আমরা চাই না, হাজার কোটি টাকার রেললাইন কেবল অপচয়ের প্রতীক হয়ে থাকুক। প্রকল্পটির উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগÑ দুটিই মুখথুবড়ে পড়ুক। রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন অপচয়ে না হারিয়ে যায়, সেটিই এখন নিশ্চিত করা জরুরি।