× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

সিপাহি-জনতার রক্তাক্ত বিপ্লব : সেইদিন-এইদিন

মেশকাত সাদিক

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৪ এএম

সিপাহি-জনতার রক্তাক্ত বিপ্লব : সেইদিন-এইদিন

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি দিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দিন দুটি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিবেচনায় সবিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনতার বিপুল বিজয়ের মনোরম নান্দনিক দুটি দিন। উভয় দিনেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসে আমূল পরিবর্তন। দুই দিনেই ভারতের আধিপত্যবাদ ও তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। একটি ঘটেছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে; অন্যটি ঘটেছে ডিজিটাল যুগে, ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে, নিকৃষ্ট স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে। এই দুটি ঘটনাকে একত্রে বাংলাদেশের গণঅধিকার, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের অভিযাত্রা হিসেবে নিঃসন্দেহে মনে করা যায়। 

সিপাহি-জনতার বিপ্লবের প্রেক্ষাপট : স্বাধীনতার মাত্র ৩ বছর পর ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ ছিল ভারত-তোষণ, রাজনৈতিক বিভাজন, দারিদ্র্য ও প্রশাসনিক দুর্নীতির গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের দুঃশাসনে সারা দেশে চরম দুর্ভিক্ষ হয়। ছোট্ট দেশটির সর্বত্র খাদ্য সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় লেখা হয় ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল একদিনেই অনাহারে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়। শেখ মুজিবের সাড়ে ৩ বছরের শাসনামল সুনিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভীষিকাময় কালো অধ্যায় বলে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী তাদের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। এই সময়কাল ছিল মূলত নৈরাজ্য, অভাব-অনটন, গুম-খুন, মুসলিম ধর্ম প্রচার-প্রসারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও দুঃশাসন-অপশাসনের নরকক্ষেত্র। কতিপয় ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টের হাতে জিম্মি ছিল দেশের সমস্ত জনগণ।

মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানি আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ, মিল ফ্যাক্টরির মেশিনাদি, যন্ত্রাংশ, খাদ্যশস্য, পাট, সুতা, যানবাহন, এমনকি কারখানার মেশিনপত্র ১৫টি জাহাজে করে লুট করে নিয়ে যায়। এসব অপকর্মে রসদ জোগায় রক্ষীবাহিনী ও মুজিব বাহিনী। রক্ষীবাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র ও চোরাচালানের মালামাল উদ্ধার এবং মজুদদার-কালোবাজারিদের প্রতিহত করার নামে গঠন করা হলেও এদের মূল কাজ ছিল ভিন্নমত দমন। এই বাহিনী মুজিবের রাজনৈতিক নীলনকশা বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম, অপহরণ, চোরাচালান এবং ধর্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তারা বিভিন্ন গ্রামে ফিল্মি স্টাইলে আক্রমণ করে গণলুণ্ঠন চালাত। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করার অভিযোগও ছিল। 

ইতিহাসের ঘটনাক্রমে সেনাঅভ্যুত্থানে শেখ মুজিব সপরিবারে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ নিহত হন। এরপর ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান ঘটে, যা সেনাবাহিনীতে ভাঙন সৃষ্টি করে। ওই অভ্যুত্থানে সেনাবহিনীর মাঝে তুমুল জনপ্রিয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এই অস্থিতিশীলতার মধ্যে ৭ নভেম্বর ভোরে জেগে ওঠে সিপাহি-জনতা। সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যরা (সিপাহি) অসন্তোষে ফেটে পড়ে। কারণ তারা মনে করেছিল ক্ষমতাসীন উচ্চপদস্থ সেনারা জাতীয়তাবাদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেয়। ফলে ঢাকার রাস্তায় ঘটে যায় অভূতপূর্ব সংঘর্ষ ও ঐক্য এবং জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে সিপাহি-জনতা।

৫ আগস্ট ২০২৪ : ছাত্র-জনতার বিপ্লব : প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ আবার এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখে পড়ে। এবার নেতৃত্বে ছিলেন দেশের তরুণ-প্রজন্ম। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীরা। মূল দাবিটি ছিল চাকরিতে কোটা সংস্কার, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানসহ সর্বমোট ৫৬% কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি অসাম্য ও বৈষম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। দাবি শুরু হয় শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু প্রশাসনের কঠোর দমননীতি, গুলিবর্ষণ, প্রায় ১৫০০ ছাত্র-জনতা হত্যা, ৩০ সহস্রাধিক মারাত্মক আহত ও হাজার হাজার গ্রেপ্তারের ফলে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। অল্প সময়ের মধ্যে তা শুধু কোটা নয়, বরং সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে পরিণত হয়। 

৫ আগস্ট ২০২৪-এ আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ দেখা দেয়। দেশব্যাপী লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও নাগরিক রাস্তায় নামে। প্রশাসন ব্যর্থ হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। দিন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ প্রবেশ করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। অনেক বিশ্লেষক এই ঘটনাকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় গণবিপ্লব বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে শুধু কোটা সংস্কার নয় বরং ১৫ বছরের সর্বনিকৃষ্ট দুঃশাসনে অতিষ্ঠ জনগণই হাসিনাকে ভারতে পালাতে বাধ্য করে।

দুই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি : ৭ নভেম্বর ও ৫ আগস্টের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় ৫০ বছর। কিন্তু দুটি ঘটনার পেছনের চালিকাশক্তির মাঝে আশ্চর্যজনকভাবে মিল রয়েছে। দুটিই ছিল ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র জনক্ষোভ। বাহ্যত উভয় ক্ষেত্রেই শাসকগোষ্ঠীর প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর ক্ষোভ কাজ করেছে। ১৯৭২-৭৫-এ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বিকৃত করা শুধু আ.লীগের সম্পদে পরিণত করা এবং ২০২৪ সালে এসেও মুক্তিযুদ্ধের একই ন্যারেটিভ এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দমননীতি উভয়েই জনগণের মাঝে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার চেতনাগত তাৎপর্যে দুই বিপ্লবই প্রকৃত স্বাধীনতার পুনরুদ্ধার প্রতীকের ধারক ও বাহক। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে ছিল সিপাহি ও নিম্নবিত্ত। ৫ আগস্টে ছিল ছাত্র ও মধ্যবিত্ত যুবসমাজ। বস্তুত উভয়ই ক্ষমতার বাইরে থাকা শ্রেণি। তবে পার্থক্য হলো, প্রথমটি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান থেকে জনগণের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়টি শুরু হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ থেকে, যা পরে সারা দেশে বিস্তৃত হয় চেইন বিক্রিয়ার মতো। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে দৃশ্যমান পক্ষ-প্রতিপক্ষ ছিলÑ সেনা অফিসারগণ। বিপ্লব সফল হবার পটভূমিতে সর্বস্তরের জনসাধারণ এর সমর্থনে পথে নেমে আসে। অন্যদিকে ৫ আগস্টের বিপ্লব ছিল পুরোপুরি নেতাহীন বা স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন ছাড়াই ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব ও অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংগঠিত করে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এভাবে প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ সমাজ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করে, যা ৭ নভেম্বরেও অকল্পনীয় ছিল। তাই একটির ছিল সামরিক শৃঙ্খলাপূর্ণ নেতৃত্ব। অন্যটির ছিল বিকেন্দ্রীভূত জননেতৃত্ব, যা আধুনিক নেটওয়ার্ক রেভল্যুশনের প্রতীক।

৫ আগস্টের দাবি ছিলÑ কোটা সংস্কার, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ। রাষ্ট্রীয় দমননীতি বন্ধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান। ৭ নভেম্বর ছিল রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বিপ্লব; ৫ আগস্ট ছিল সামাজিক ন্যায় ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের বিপ্লব। ৭ নভেম্বরের ফলাফল হলোÑ জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন, শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। একদলীয় শাসন (বাকশাল) বিলুপ্ত হয়ে বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন ঘটে। সেনাবাহিনী সরাসরি রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তবে বিপ্লবের উদ্দেশ্য জনগণের শাসন পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি; সেনা-রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বহাল থাকে। 

৫ আগস্টের ফলাফল হলোÑ শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ছাত্র ও নাগরিকদের শক্তি আবার প্রমাণিত হয়। ইন্টেরিম সরকার গঠিত হয় এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ঘোষণা আসে। এই বিপ্লব ডিজিটাল যুগে গণআন্দোলনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব-পরবর্তী সময় সেনাশাসনে রূপ নেয়, তেমনি ৫ আগস্টের পরেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচারের বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, সেটাই প্রশ্ন। দুই বিপ্লবের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের মিল রয়েছে। উভয় বিপ্লবই জনগণকে সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে ফিরিয়ে এনেছে। উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছিল, যা পুনর্গঠনের আহ্বান সৃষ্টি করেছিল। 

৭ নভেম্বর ১৯৭৫ ও ৫ আগস্ট ২০২৪ দুটি তারিখ বাংলাদেশের ইতিহাসে জনতার জাগরণের দুই ভিন্ন অধ্যায়। একদিকে ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব। অন্যদিকে ছিল শিক্ষার্থীদের গণআন্দোলন। সাধারণ ছাত্র-জনতার জনঅভ্যুত্থান। তবে দুই বিপ্লবের মর্ম একই। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও ন্যায়ের অভাবে জনগণ নীরব থাকে না। সময়, প্রজন্ম ও প্রযুক্তি বদলালেও বাংলাদেশ বারবার প্রমাণ করেছে যে গণমানুষের শক্তিই রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ামক। অতএব ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ছিল অতীতের ক্ষোভের প্রতিশোধ। আর ৫ আগস্টের বিপ্লব হলো ভবিষ্যতের ন্যায়নির্ভর জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা। একটিতে জন্ম নেয় সামরিক গণতন্ত্রের ধারণা, অন্যটিতে নবপ্রজন্মের গণআন্দোলনের যুগ। উভয়ই বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও ইতিহাসে অমোচনীয় চিহ্ন রেখে গেছে। এবার যেন ৫ আগস্টের বিপ্লব ব্যর্থ না হয়, সেই প্রত্যাশা করে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ।


মেশকাত সাদিক

কলাম লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা