বিশ্লেষণ
রোকেয়া ইসলাম, চেয়ারম্যান, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩০ এএম
ঢাকা শহরের সকাল মানেই যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। কেউ ছুটছেন কর্মক্ষেত্রে, কেউ স্কুলে সন্তানকে পৌঁছে দিতে, কেউবা হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাচ্ছেÑ আর সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা, অসহ্য যানজট। এই যানজট এখন কেবল সময় নষ্টের কারণ নয়, এটি এক নীরব সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজধানীসহ অন্যান্য বড় শহরে এখন যানজট মানেই জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের রাস্তাগুলো যেন গিলে খায় মানুষের সময় ও ধৈর্য। অফিস সময়ের আগে, বিকালে অফিস ছুটি শেষেÑ দুই সময়েই রাস্তা যেন রণক্ষেত্র। কখনও কখনও রাস্তা আটকে মিছিল-মিটিং করার কারণে সারা দিন যানজটে ভয়াবহ রণক্ষেত্র।
রিকশা, বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার, সিএনজিÑ সবাই যেন একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে ‘কে আগে যাবে’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই এগোতে পারে না। একজন কর্মক্ষেত্রগামী মানুষ সকালে বেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে একই জায়গায়। যাত্রা শুরুর সময়টুকু যদি পরিকল্পিত হয়ও পৌঁছানোর সময়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তাই মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত ও হতাশ করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ ঢাকার যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় লাখ লাখ কর্মঘণ্টা অপচয় হয়। এই অপচয় কেবল সময়ের নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও ভয়াবহ ক্ষতির কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হয়। অফিসে দেরি, ডেলিভারি ব্যর্থতা, পণ্য নষ্ট হওয়া, জ্বালানির অপচয়Ñ সব মিলিয়ে এক বিশাল আর্থিক ক্ষতির চক্র তৈরি হয়েছে। একজন প্রাইভেটকার মালিক প্রতিদিন হয়তো তিন থেকে চার লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় করেন শুধু রাস্তা ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় থেকে। দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি যেন এই যানজট নামক দৈত্যের হাতে জিম্মি।
যানজট শুধু অর্থনীতিকে নয়, মানুষের মনকেও বন্দি করে ফেলেছে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা একই স্থানে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে রাগ, অস্থিরতা, অবসাদ। সামাজিক কর্মকাণ্ডে ও পরিবারে সময় দেওয়া যায় না, অবসাদজনিত কারণ ও সময়ের হেরফেরের কারণে ঠিক সময়ে খাওয়া-ঘুম হয় না, এতে স্বাস্থ্যহানি হয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।
বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রগামী নারী ও শিক্ষার্থীরা এই ভোগান্তির বড় শিকার। নারী যাত্রীরা যানজটে দীর্ঘ সময় বাসে বা রাস্তায় আটকে থেকে নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির শিকার হন।
অন্যদিকে স্কুলগামী শিশুরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তাদের শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিক আনন্দ যেন হারিয়ে যাচ্ছে রাস্তায়। যানজট মানেই স্থির গাড়ির ভিড় আর তার সঙ্গে অজস্র ধোঁয়া ও শব্দদূষণ। প্রতিদিন কোটি কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড নিঃসৃত হচ্ছে শহরের বুকে। এই দূষণ ফুসফুসের রোগ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এক গবেষণায় বলা হয়েছেÑ ঢাকায় বায়ুদূষণের ৪০ শতাশেরও বেশি দায়ী যানবাহন চলাচল ও যানজট। শব্দদূষণের মাত্রাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ যানজট এখন শুধু যানবাহনের সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকট।
এই অসহনীয় পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় কারণÑ
* অপরিকল্পিত নগরায়ণ : শহর বেড়েছে, কিন্তু রাস্তা বাড়েনি। নতুন আবাসিক এলাকা তৈরি হলেও সড়ক অবকাঠামো উপযুক্ত নয়।
* অপ্রতুল গণপরিবহন ব্যবস্থা : বাসের সংখ্যা ও মান দুটোই নগণ্য। মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছে।
* দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা : ট্রাফিক পুলিশ সংকট, সিগন্যাল অকার্যকর, নিয়ম ভঙ্গের শাস্তি তুচ্ছÑ সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল চিত্র।
* অসচেতন চালক ও পথচারী : ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান ও সম্মান দুই-ই কম। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো, দ্রুতগতির গাড়ির পরিবর্তে ধীরগতির রিকশা চলাচলের কারণ।
* হঠাৎ রিকশা থামানো, বাড়ি তৈরির উপকরণ পাশের দোকানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা দখলÑ সবই নিয়মিত দৃশ্য।
* অবৈধভাবে ফুটপাত দখল, দোকান বসানো, অবৈধ গাড়ি পার্কিং যানজটকে আরও তীব্র করে তোলে।
যানজট নিরসনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারেÑ
* গণপরিবহন সংস্কার : আধুনিক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, নির্ভরযোগ্য বাস সার্ভিস চালু করা। একই রুটে একাধিক পরিবহন কোম্পানির প্রতিযোগিতা কঠিনভাবে বন্ধ করা
ঢাকা মেট্রোরেল ইতোমধ্যে যুগান্তকারী ফল বয়ে এনেছে যানজট নিরসনে, অনন্য আশা জাগিয়েছে। এটি অন্যান্য অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
অবশ্য অবৈধ পার্কিং বন্ধ ও ফুটপাত মুক্ত করা, ফুটপাত শুধুমাত্র পথচারীর চলাচলের জন্য রাখতে হবে। অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন জরুরি।
প্রতিটি বহুতল মার্কেটে আন্ডারগ্রাউন্ড অথবা নিচতলায় নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তেমনি পার্কিং সুব্যবস্থা না থাকলে অনুমতি না দেওয়া। আগে থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁ চালু থাকলে অবিলম্বে তা বন্ধ করে দেওয়া।
ট্রাফিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। স্মার্ট সিগন্যাল, ক্যামেরা মনিটরিং এবং স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। স্কুল পর্যায় থেকেই ট্রাফিক আইন শিক্ষা দেওয়া উচিত। নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি না হলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না।
সাইকেল লেন, পায়ে হাঁটার পথ, কারপুলিং সংস্কৃতি তৈরি করা। যানজটের মূল সমস্যাটি কেবল অবকাঠামোগত নয়; এটি সংস্কৃতি ও মানসিকতার সমস্যা। আমরা প্রত্যেকে যদি একটু ধৈর্য, নিয়ম মেনে চলা ও অন্যের প্রতি সম্মান দেখাতে শিখি, তাহলে চিত্র অনেকটা বদলাতে পারে।
যে সমাজে সবাই নিজের সুবিধাকে আগে রাখে, সেখানে ট্রাফিক শৃঙ্খলা টিকতে পারে না। তাই সমাধানের শুরু হতে হবে আমাদের ভেতর থেকে। অসহ্য যানজট এখন শহুরে জীবনের প্রতিদিনের অভিশাপ। এটি শুধু যাতায়াতের ঝামেলা নয়, একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র, এমনকি মানুষের মানসিক ভারসাম্যের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
তবু আশার কথাÑ আমরা যদি এখনই উদ্যোগ নিই, সচেতন হই, সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করি, তাহলে এই দুরবস্থা বদলানো সম্ভব। যানজট কমানোর পথটি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু ইচ্ছা, নিয়ম আর নাগরিক দায়িত্ববোধ। তখনই হয়তো এক দিন আমরা বলতে পারবÑ রাস্তা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো জন্যই নয়, এটি আবার মানুষের চলাচলের আনন্দের পথ। আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ।