× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স

সবজান্তা যন্ত্র বনাম সহজাত প্রবণতা

হাসনাত মোবারক, সাংবাদিক

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৫ এএম

সবজান্তা যন্ত্র বনাম সহজাত প্রবণতা

‘টিপ দেয় ভেড়ামারা, আটা বেরোয় কাশিনাথপুর।’ এ বাক্যটি লিখে চ্যাটজিপিটি, এআই’র (কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা) কাছে ব্যাখ্যা চাইলে তারা জানায়Ñ এটি রূপক বা প্রবাদধর্মী উক্তি, যা মূলত ব্যঙ্গ বা কৌতুকপূর্ণ ভাষায় অন্যায় প্রক্রিয়া বা দুর্নীতিপূর্ণ ব্যবস্থার সমালোচনায় ব্যবহৃত হয়।’ শুধু এটুকু পড়ে হয়রান হলে গেলেন? তাহলে একটু হেসে নিই বাক্যটি সম্পর্কে সবজান্তা যন্ত্রের দেওয়া আক্ষরিক অর্থ পড়ে। জানিয়েছেÑ ভেড়ামারা : কুষ্টিয়া জেলার একটি এলাকা। কাশিনাথপুর : পাবনা জেলার আরেকটি স্থান, ভেড়ামারা থেকে অনেক দূরে। ‘টিপ দেয় ভেড়ামারা, আটা বেরোয় কাশিনাথপুর’Ñ মানে কেউ যদি ভেড়ামারায় ‘টিপ দেয়’, অর্থাৎ কোনো কাজের সূচনা করে, তার ফল বা পণ্য (আটা) কিন্তু বের হয় অন্য জায়গা, কাশিনাথপুরে।’

কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার কাছে যদি ভেড়ামারা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠার সাল জানতে চাওয়া হতোÑ তারা হয়তো নিমেষেই এভাবে উত্তর দিত, ‘ভেড়ামারা তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে ১৯৭৬ সালে। অবস্থান : ভেড়ামারা উপজেলা, কুষ্টিয়া জেলা, বাংলাদেশ। নদী সংলগ্ন : গঙ্গা নদীর শাখা নদীÑ গড়াই নদীর পাশে।’এরকমই তথ্য পাওয়া যেত যন্ত্রটির কাছ থেকে।

চ্যাটবট জায়গার নামটি অবশ্য ঠিক বলে দিতে পেরেছে। কেননা গুগল ম্যাপ থেকে স্থানের নাম লুফে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ব্যাখ্যা হিসেবে যা দিয়েছে, সেটি পড়ে হাসির উদ্রেক করে তাদের কাছে, যারা বাক্যটির পটভূমি জানেন। তাহলে এখন বাক্যটির ইতিহাসটি বলি। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় কাশিনাথপুর নামে একটি বাজার আছে। সেখানে গম, ধান ভাঙানোর মিল বসানো হয় ভেড়ামারা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরপরই। এর থেকে ওই এলাকার মা-বোনদের ঢেঁকি-নৃত্যের অবসান ঘটতে থাকে। সময়ও সাশ্রয় হয়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত চলে কাশিনাথপুর বাজারে ধান, গম ভাঙানোর কাজ। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এসে মুহূর্তে ধান, গম ভাঙিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে মিল বন্ধ হয়ে পড়ে। ধান, গম নিয়ে লোকজন অলস বসে এ-গল্প, সে-গল্প জুড়ে দিতেন। সরল কিসিমের এক লোক কৌতূহলবশত বলেছিলেন, ‘এমন যুগ আইলো বাপু। টিপ দেয় ভেড়ামারা, আটা বেরোয় কাশিনাথপুর।’ অর্থাৎ ভেড়ামারা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুতের সুইচ চালু করলে কাশিনাথপুর বাজারের মিল চলে। তখন মিলের মুখ থেকে গড়গড় করে পড়ে আটা, চাল।

‘টিপ দেয় ভেড়ামারা, আটা বেরোয় কাশিনাথপুর।’ গল্পটি এক মুখ, দুই মুখ করতে করতে সারা এলাকায় প্রচার হয়ে যায়। লোকমুখে খুব সাধারণ একজন মানুষের বলা কথাটি কিংবদন্তিতে রূপ নিয়েছিল। এখনও কোনোকিছুতে কেউ বিস্মিত হলে ওই গল্পটি উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন।

সেই ধান ভাঙানোর মিল নিয়ে চালু গল্পের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর এসে নতুন করে বলতে হচ্ছেÑ কী যুগ আইলো, ডিভাইসের মধ্যে ছবি আপলোড করার সঙ্গে সঙ্গে একটা পোট্রেট হয়ে বেরিয়ে আসে। সেই প্রতিকৃতিটি নামিয়ে নানান মাধ্যমে তা ব্যবহারও হচ্ছে। শাবাশ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স! প্রযুক্তির অবারিত কৃপায় শিল্পীরা হাতে আঁকা থেকে নিস্তার পাচ্ছেন কি? যদি কেউ নিস্তার দিয়েই থাকেন! তাহলে সব্বনাশের বাঁশগাড়ি। কেননা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফল যে শুরুর গল্পের মতো পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত। 

ব্রিটিশ ইলেস্ট্রটর স্যার কুয়েন্টিন স্যাক্সবি ব্লেক। তার জন্ম ১৯৩২ সালে। তার সম্পর্কে গুগোলে নানান তথ্য পাওয়া যাবে। সার্চ করলেই মিলবে। কিন্তু তার যথাযথ পোট্রেট কি এআই বানিয়ে দিতে পারবে? না। পারবে না। লুসি ব্যানারম্যান একবার চ্যাটজিপিটির কাছে কুয়েন্টিন ব্লেকের স্টাইলে কুয়েন্টিন ব্লেকের একটা স্কেচ তৈরি করতে বলেছিলেন। ফলাফল এসেছিল উল্টো।

মস্ত আর্টিস্টের কারবার রঙ নিয়ে। তাই একজন প্রকৃত শিল্পী শব্দহীন এবং অন্ধকার ঘরের মধ্যে দেখতে পান নানান রঙ ও রেখা। তাই এআই জেনারেটের যুগে এসেও হাতের কবজিতে কালি লেগে থাকা শিল্পীদের কদর আরও বাড়বে বইকি! যারা মেশিন দিয়ে ছবি বানায় তাদের ছবি প্লাস্টিক প্লাস্টিক লাগে। তা না হলে কি আর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একটা ছবি নিলামে বিক্রি হয় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। 

আচ্ছা। মনে করুন, চারুকলাকে ঠিক আগের অবস্থানে নেওয়া হলো! মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ থেকে চারুকলাকে আলাদা করে দেওয়া হলো। তাইলে কি আপত্তি করবেন! করার কথা নয়। কারণ যারা এআই জেনারেট করে ছবি বানাচ্ছেন, আর একটা চাকরির জন্য চারুকলাতে পড়তে আসেন তারা এখানে ভর্তি না হয়েও এই কাজটি করতে পারবেন সে সুযোগ তো করে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। 

জীবনানন্দ দাশকে চিনবেন না, তাহলে খামাখা চারুকলাতে ভিড় জমান কেন? হামিদুজ্জামান খান আর্ট গ্যালারির পরিচালককে অবশ্যই জানতে হবে শিল্পী মনিরুল ইসলাম হামিদুজ্জামান খানের শিক্ষক। 

সম্প্রতি বাংলাদেশের অনেক লোকই হাপিত্যেশ করছেন। কেন করছেন? বই পাঠের অবস্থানের দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ পড়ে গেছে প্রায় তলানিতে। আহারে! হাহাকার দেখে লজ্জা লাগছে। পাঠক বই পড়ছেন না। বই বিক্রি কমে গেছে। বিপদ। অনেক প্রকাশকই যে চিত্রকর্মের কপিরাইটের ধারের কাছ দিয়ে হাঁটেন না। নিজে ছবি জেনারেট করে ব্যবহার করে যাচ্ছেন অহরহ। আর বই পড়া তলানিতে নেমে গেছে সেটা নিয়ে হা-হুতাশ করছেন।

বইপড়া প্রসঙ্গটির ইতি টানব খ্যাতনামা প্রচ্ছদশিল্পী জন গল এবং পিটার মেনেডলসান্ডের কথোপকথন দিয়ে। পিটার জানালেন, গত এক বছরে তিনি আইপ্যাডে অনেক বই পড়েছেন, কিন্তু কোনোটিতেই তার মনে দাগ কাটতে পারেনি। তার এ কথার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জন গল বলেন, এর কারণ হতে পারে ছাপানো বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যে আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়, ডিজিটাল মাধ্যমে তা হয় না। সেখানে বইয়ের সঙ্গে কোনো বন্ধন গড়ে ওঠে না, বরং সম্পর্ক তৈরি হয় আইফোন বা আইপ্যাডের মতো যন্ত্রের সঙ্গে।’

কথা কি বোঝা গেল? আমরা বই পড়ার সময় ডিজিটালের নানান ডিভাইস পাশে রাখি। মন তো পড়ে থাকে পাশের যন্ত্রের মধ্যে। বই পড়া হবে কখন! তাই আমরা আগে নিজেকে দিয়ে বিচার শুরু করি। নিজেকে জানো। এভাবেই তো আড়াই হাজার বছর আগে সক্রেটিস বলে গেছেন। দার্শনিকের এই সরল বাক্যের চেয়ে আর সহজ কথা আছে! নিজের ঘরের সন্তানের কাছে কয়টা ডিজিটাল ডিভাইস দিয়ে রেখেছি, সেই হিসাব করলে বইয়ের পাঠক কম কেনÑ এটা নিয়ে আর আফসোস থাকবে না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা