× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

নিখোঁজ শব্দ পার্সোনালিটি

মাসুদ কামাল হিন্দোল, রম্য লেখক

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১২ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা ভাষার কিছু শ্রুতিমধুর ও সমৃদ্ধ শব্দ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। বহুল ব্যবহৃত সে শব্দগুলো এখন তেমন একটা শোনা যায় না। কথায় বা লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ব্যবহারও হয় না। উধাও হয়ে গেছে। কিছু শব্দ আর্কাইভে চলে যাওয়ার অবস্থা। অনেক প্রচলিত শব্দ বাদ পড়ছে দৈনন্দিন ব্যবহারের তালিকা থেকে। সেইসব শব্দ কোথায় হারিয়ে গেল? কেন হারিয়ে গেল? সে প্রশ্ন অনেকের। 

এ অবস্থায় হারিয়ে যাওয়া সেইসব শব্দ (অনুশীলনের অভাবে সময়ের প্রবাহে আজ যে শব্দগুলো প্রচলিত নয়) খোঁজার চেষ্টা চলছে বছর সাতেক আগে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে। হারানো সেই শব্দগুলো ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং চর্চা বৃদ্ধি করাই ছিল এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা আবেদন হারিয়ে ফেলছে। বাংলা ভাষা থেকে হারিয়ে যাওয়া শব্দের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং ব্যবহারে উৎসাহিত করতে শুরু হয়েছিল মাসব্যাপী ক্যাম্পেইন নিখোঁজ শব্দের খোঁজে। নিখোঁজ শব্দের এই ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের ওয়েবসাইটে হারিয়ে যাওয়া বা কম ব্যবহৃত বাংলা শব্দগুলো জমা দিতে উৎসাহিত করা হয়। অনেকেই শব্দ জমা দিয়েছেন। সেখান থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রায় ৫,০০০ শব্দ পাওয়া গেছে।

হারানো শব্দের খোঁজে ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে মঞ্চে এসেছে ভাষার আগ্রাসন নিয়ে নাটক ‘নিখোঁজ সংবাদ’। গাউসুল আলম শাওন ও আদনান আদিব খানের গল্পে নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন রেজা আরিফ। নাটকের প্রডাকশন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর গাউসুল আলম শাওন বলেন, ধরুন অনুধাবন শব্দটি এখন হয়তো আমরা আর ওভাবে ব্যবহার করি না কিংবা অভিভাবক শব্দটি না বলে এখন আমরা প্যারেন্ট বা গার্ডিয়ান শব্দ দুটো বেশি বলি। এমন শব্দ আমাদের কথায় বা লেখায় খুব একটা নেই।এমন একটি বিষয় নিয়ে ‘নিখোঁজ সংবাদ’। নাটকের মূল প্রেক্ষাপট বাংলা ভাষা থেকে হারিয়ে যাওয়া শব্দগুলোকে ফিরিয়ে আনা।

হারানো শব্দ নিয়ে গানও রচিত হয়েছে।গানে কণ্ঠ দিয়েছেন দি রকস্টার খ্যাত শুভ ও এলিটা করিম (গীতিকার-রাসেল মাহামুদ ও সুরকার-আরাফাত মোহসিন)। কই গেলো কই ওই চেনা সব শব্দ/সময়ের জাঁতাকলে হয়ে যা তা জব্দ/ কই গেলো অমর্ত্য কই যায় অয়োময়/ অস্তিত্বের খোঁজে খাবি খায় মৃন্ময়/ নিখোঁজ ওই শব্দরা আজ বড় অভিমানী/ চলো নামি একসাথে ওদের ফিরিয়ে আনি।গানে গানে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেÑ কেউকেটে, কেতাদুরস্ত, প্রিয়ংবদা, উমেদারি, বহুব্রীহি, বিপ্রতীপ, পদ্মলোচন,মনোহারিণী ইত্যাদি শব্দকে।

নাটক গানের পাশাপাশি শব্দ নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বইও প্রকাশিত হয়েছে। শব্দ নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে। এখন হয়তো জানা যাবে শব্দরা কেন হারিয়ে যায়। হারিয়েই-বা কোথায় যায়? নাকি বাতাসে ভেসে বেড়ায়। চলছে অনুসন্ধান গবেষণা। গ্লোবালাইজেশনের যুগে মাতৃভাষা সংকটে। আমরা আসলেই নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছি। জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে ভাষা-সংস্কৃতি আমাদের আত্মপরিচয়। হারানো বাংলা শব্দগুলো হয়তো আমরা আবার ফিরে পাব আমাদের প্রতিদিনের জীবনে।

ভাষা নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান। প্রতিটি ভাষা নিজের নিয়মে চলে। অন্য ভাষা থেকে শব্দ নেয়Ñ এটা স্বাভাবিক। বিভিন্ন ভাষার শব্দ নিয়ে যেমন ইংরেজি ভাষা গঠিত হয়েছে। বাংলা ভাষাতেও অনেক বিদেশি শব্দ রয়েছে। শব্দগুলো গৃহীত হয়েছে। ৯০ দশকের পর বাংলা ভাষায় প্রায় ৩ হাজার নতুন বিদেশি শব্দ যুক্ত হয়েছে। আরবি, ফার্সি থেকে অনেক শব্দ এসেছে। ইদানীং বাংলা ভাষায় প্রচলিত আরবি, ফার্সি শব্দও নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। আরবি, ফার্সি কিছু শব্দ এখন কেউ কেউ ব্যবহার করতে চান না। যেমনÑ লাশ, মরহুম (পুরুষের জন্য) মরহুমা (নারীর জন্য) ইন্তেকাল, ইন্নালিল্লাহ ইত্যাদি। এসব শব্দের বিকল্প শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা তো চন্দ্রবিন্দুকেও অর্ধচন্দ্র দিতে চেয়েছিলাম। তাই এখন কাদা (মাটি) আর কাঁদা (কান্না)’র পার্থক্য করতে পারছি না (চন্দ্রবিন্দু সতর্কতার সঙ্গে যোগ করলে শব্দর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সহজ হয়)।

আমরা যখন হারানো শব্দ নিয়ে আক্ষেপ করছি, তখন আমাদের মাঝ থেকে পারসোনালিটি শব্দটি হারিয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি হলেও এ শব্দটিকে আমাদের প্রয়োজনেই রক্ষা করতে হবে। 

চরিত্রের মতো পারসোনালিটিও মানুষ ও সমাজ জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পারসোনালিটির অভাব হলে সমাজদেহে প্রভাব পড়ে। জাতীয়ভাবে একটি জাতির পারসোনালিটির অভাব হলে কী হয় তার পরিণতি আমরা দেখেছি। ইদানীং পারসোনালিটি শব্দটি শুনলে অনেকই অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। মনে হয়, এ শব্দটি তারা কখনও শোনেনি। অথচ একসময় খুবই ব্যবহার হতো। আমরা আগে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব বলে একটি কথা প্রায়ই শুনতাম। এটাও আর তেমন শোনা যায় না। এখন শোনা যায়, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তির দ্বন্দ্ব, লাভ-লোকসান, লোভ-লালসার বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব এখন ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে ভোগবাদী সমাজে। এসব নিয়ে কেউ আলোচনাও করতে চায় না। 

ইংরেজি পারসোনালিটি শব্দের বাংলা অর্থ ব্যক্তিত্ব। একজন মানুষের জীবনে ব্যক্তিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্বহীন মানুষ দেশ ও জাতির কোনো কাজে লাগে না। ছোটবেলায় পড়েছি পারসোনালিটির চর্চা করতে হয়। পুরুষকে ব্যক্তিত্ববান হতে হয়। পারসোনালিটি বিল্ড আপের জন্য কোর্স যেমন আছে, তেমনি সংবাদপত্রে টিপসও দেওয়া হয় কীভাবে ব্যক্তিত্ববান হবেন। অথচ সেই শব্দটিকেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের জীবন থেকে। হারানো বা নিখোঁজ শব্দের তালিকায় চলে যাচ্ছে এই করপোরেট যুগে।

আমরা দেখেছি, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে পারসোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব খোয়াতে। সংবাদ সম্মেলনের নামে পারসোনালিটি বিসর্জন দিতেও দেখেছি। কী নগ্ন প্রতিযোগিতা চলেছে। একবারও তাদের কারও মনে হয়নি অনেকে হয়েছে। আর না। চাটুকারিতাকে তারা শিল্প পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিদিনই কিছু মানুষ একটু একটু করে পারসোনালিটি হারাচ্ছি। 

কবি আল মাহমুদের কবিতাকে একটু ঘুরিয়ে এভাবে বলা যায়Ñ আমাদের পারসোনালিটি হারিয়ে গেল কিসে/ হেথায় খুঁজি, হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে/ দেশের অভিভাবকদের কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমাদের কাছে? হাত দিও না আমাদের শরীর ভরা রঙ্গ-রসে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা