জিএসএ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৪ পিএম
আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৫ পিএম
জেনারেল সেলস এজেন্ট বা জিএসএ মূলত এয়ারলাইনস ও যাত্রীদের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে জিএসএ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের উপস্থিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমনকি প্যান অ্যাম, ইউনাইটেড, লুফথানসা ও কেএলএমের মতো বিখ্যাত এয়ারলাইনস চালু করতেও সহায়তা করেছে দেশীয় জিএসএগুলো। অথচ বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য আমাদের দেশীয় জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার বিধান বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আর এরই প্রেক্ষিতে
দাবি উঠেছে দেশীয় কর্মসংস্থান রক্ষা, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার
রোধ ও বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এয়ারলাইনস জেনারেল সেলস এজেন্ট
(জিএসএ) নিয়োগ আইন বহাল রাখার। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা
যায়, এ বিষয়ে এরই
মধ্যে মানববন্ধন করেছেন জিএসএতে নিয়োজিত
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ একটি প্রভাবশালী মহল জাতীয় স্বার্থবিরোধী
উদ্যোগ নিয়ে জিএসএ-বিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
আমাদের স্মরণে আছে, গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর একটি মহল হঠাৎ
করেই বিমানের টিকিটের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এ সময় মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচের
যে দেশগুলোতে যেতে চাওয়া আমাদের শ্রমিকরা বিপাকে পড়ে। বাড়তি দামের কারণে তাদের অনেকের
পক্ষেই টিকিটের অতিরিক্ত টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয় না। অনেকের যাত্রা বাতিলও হয়। বিমানের
বিভিন্ন রুটের টিকিটের এভাবে দাম হঠাৎ কেন বাড়ছে সেটিসহ একাধিক বিষয়ের ওপর কিছু প্রস্তাব
উত্থাপিত হয়। তাতে বলা হয়েছিল, বিদেশি এয়ারলাইনসের এদেশীয় জিএসএ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের
কারণেই বিমানের টিকিটের দাম বাড়ছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতেই জিএসএ নিয়োগ বিধানের বাতিলের
উদ্যোগ।
আমরা জানি, বিদেশি এয়ারলাইনস বা বিমান সংস্থাগুলোর সাধারণত স্থানীয় বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই টিকিট বিক্রয় ও বিপণনের দায়িত্ব দেয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএসএরা বিমানের টিকিট বিক্রি, গ্রাহকসেবা, প্রচার, বিপণন ও ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কাজ করে। অন্যদিকে বিমান সংস্থাগুলোও কোনো দেশ বা অঞ্চলে সরাসরি নিজস্ব অফিস না খুলে জিএসএ নিয়োগ করে। ফলে বিমান সংস্থাগুলোরও খরচ কমে, তাদেরও পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় চালানোর প্রয়োজন হয় না। আবার যে দেশে জিএসএর দায়িত্ব পালন করে সেখানেও শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে দেশে ৭০টির বেশি বিদেশি বিমান সংস্থা স্থানীয় জিএসএর মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি উড়ান পরিচালিত হয়। একটি পরিসংখ্যান বলছে এতে করে কোম্পানিগুলো বছরে কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে বিমানসেবা দেয় এবং ন্যূনতম আড়াই লাখ টন কার্গো পরিবহন করে। এই পরিষেবা ব্যবসার সঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার উদ্যোক্তা জড়িত। এ খাতে প্রায় সোয়া লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। আবার বিভিন্ন বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহী ও উদ্যোগী করতেও স্থানীয় জিএসএ প্রতিষ্ঠানদের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের বিমান পরিবহন খাত এগিয়ে নিতে ও বাংলাদেশকে বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এ ধরনের ফোরামের গুরুত্ব রয়েছে। সেই সঙ্গে জিএসএ কাঠামো আমাদের রাজস্ব আহরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিএসএ স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের ওপর কর, ভ্যাট এবং বৈদেশিক মুদ্রা আইনের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে টিকিট বিক্রয় ও কমিশনের ওপর উৎসে কর এবং করপোরেট ট্যাক্স আরোপের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় যেমন বাড়ে, তেমনি এ খাতটি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে যাওয়ারও সুযোগ কম। কিন্তু যদি টিকিটের দাম বৃদ্ধি অথবা সিন্ডিকেটের অজুহাতে আমরা জিএসএ ব্যবস্থাটিকেই অকার্যকর করে ফেলি, তাদেরকে প্রতিষ্ঠান গোটাতে বাধ্য করি, তা আখেরে আমাদের জন্য কি সত্যিই হিতকর হবে? কারণ এই ব্যবস্থাটির মাধ্যমে আমাদের রাজস্ব আদায়, দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া এবং সর্বোপরি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, তা কি ঠেকানো যাবে? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, অতীতে কার্যকর জিএসএ না থাকায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের মতো সংস্থাগুলো পার্শ্ববর্তী দেশের কার্যালয়ের চাপে বাংলাদেশ থেকে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আবারও এমন পরিস্থিতির শিকার যেন আমাদের না হতে হয়, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো যেন মুখ ফিরিয়ে না নেয়, সে দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। তাই জিএসএ বহাল রেখে কীভাবে তাদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ রাখা, তাদেরকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা যায়, তাদের সিন্ডিকেট তৈরির পথ বন্ধ হয় সেই উপায়গুলোই আমাদের খুঁজে দেখতে হবে। আমরা মনে করি, সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা উচিত। কিন্তু মাথাব্যথা বলে মাথাটাই কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হটকারিতা ছাড়া কিছু নয়।