বিএসইসির উদ্যোগ
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪২ পিএম
অনেক দিন পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, বিএসইসি একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাবেক এমডিকে ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) টাকা জরিমানা করেছে দেশের পুঁজিবাজার সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের কারণে। আরও জানা যায়, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেশের পুঁজিবাজার থেকে বন্ড ইস্যু করে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছিল। সেই বন্ডের নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিয়েছিল অভিযুক্ত এমডির কর্মরত ব্যাংক। কিন্তু বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান সুকৌশলে সেই ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে ব্যাংকের বন্ড হিসেবে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। কেননা ব্যাংকের নিজস্ব ইস্যু করা বন্ডের চাহিদা বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেক বেশি। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ নিয়ে ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগকারীদের এমন আস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাজার থেকে সহজে অর্থ উত্তোলনের উদ্দেশ্যে বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের বন্ডকে ব্যাংকের বন্ড হিসেবে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল এবং এ কারণেই সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গ হয়েছে। আর সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গ হলে, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি পেতেই হবে এবং এ ক্ষেত্রে তেমনটাই হয়েছে।
বিষয়টি যেভাবে সংবাদ মাধ্যমে এসেছে তাতে সিকিউরিটিজ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে এবং এই অপরাধে বিএসইসি সেই ব্যাংকের এমডিকে বিশাল অঙ্কের জরিমানা করে সঠিক কাজটিই করেছে। অনেকেই ভাবতে পারেন যে সেই অভিযুক্ত এমডির ব্যাংক তো শুধু বন্ডের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। তারা তো বন্ড ইস্যুর সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় এবং এ ব্যাপারে বন্ড ইস্যুর জন্য যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িত নয়। তাহলে নিশ্চয়তা প্রদানকারী ব্যাংকের এমডি সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন কেন এবং তার ওপর বিশাল অঙ্কের জরিমানাই-বা হবে কেন। ভাবনাটি যে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক, তা বলা যাবে না। এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার নয়, তা হচ্ছে বন্ড ইস্যুর যে বিজ্ঞাপনে ব্যাংকের বন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা কি নিছক বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন, নাকি বন্ড ইস্যুর জন্য যে প্রসপেক্টাস তৈরি করা হয়, সেখানে উল্লেখ আছে।
যদি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকে, তাহলে সেটি যত না সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন, তার চেয়ে অনেক বেশি ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু যদি বন্ডের প্রসপেক্টাসে ব্যাংকের বন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই সিকিউরিটিজ আইনের লঙ্ঘন। তবে বিএসইসি যেহেতু তদন্ত করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই জরিমানা আরোপের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে বন্ড ইস্যুর প্রসপেক্টাসেই ব্যাংকের বন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। যদি তাই হয়, তাহলে সেখানেও কথা থেকে যায় যে বিএসইসি তো সেই প্রসপেক্টাস অনুমোদন করেছে এবং তখন কি তারা এই বিষয়টি দেখেনি। অবশ্য আইনের সাম্প্রতিক বিধান অনুযায়ী প্রসপেক্টাস অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। যা হোক, বিষয়গুলো বিএসইসি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে নিশ্চয়ই।
আলোচ্য ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, তা হচ্ছে যে ব্যাংক তৃতীয় পক্ষের ইস্যুকৃত বন্ডের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে, সেই ব্যাংকের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বন্ড ইস্যুর দায়িত্ব (ইস্যু ম্যানেজারের) পালন করেছে। এই ধরনের ব্যবস্থার মধ্যেই আছে আইনের সীমাবদ্ধতা বা ফাঁকফোকর, যাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগকারীদের বোকা বানানো সম্ভব। আর এই কাজটিই আলোচিত ব্যাংকের সাবেক এমডি সুকৌশলে করতে সক্ষম হয়েছেন। এই ধরনের বিধান কোনো মানসম্পন্ন আইনে থাকা উচিত নয় এবং থাকতে পারে না। যে নিশ্চয়তা দিবে এবং যে নিশ্চয়তা ব্যবহার করবে, তারা কী করে একই প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত হবে। যেকোনো অর্থনৈতিক বা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়। যত লাভজনক বা সম্ভাবনাময় সিদ্ধান্তই হোক না কেন, যদি স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না।
বিনিয়োগ বা পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকলে, তা অবশ্যই পরিহার করতে হয়। যে কোম্পানি বন্ড বাজারে নিয়ে আসার জন্য ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছে, সেই কোম্পানির মূল প্রতিষ্ঠান বা প্যারেন্ট কোম্পানি বন্ডের নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দেয় কীভাবে। এটি তো কোনোভাবেই হওয়ার কথা নয়। একই প্রতিষ্ঠান তার নিজের বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিতে পারে না। যেমন, একটি ব্যাংকের ইস্যু করা গ্যারান্টি বা স্ট্যান্ডবাই এলসি কোনো গ্রাহককে ঋণদানের বিপরীতে জামানত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু যে ব্যাংক স্ট্যান্ডবাই এলসি ইস্যু করবে, সেই ব্যাংক কর্তৃক অন্য কোনো গ্রাহকের ঋণদানের বিপরীতে জামানত হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ যে ব্যাংকের স্ট্যান্ডবাই এলসি, সেই ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রাখার সুযোগ নেই। আইনের মাধ্যমেই এই ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা থাকে। জানি না আমাদের দেশে এরকম লেনদেন নিষিদ্ধ কি না।
আমাদের দেশে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বেশ আলোচিত। সবাই এই শব্দ দুটোর সঙ্গে বেশ পরিচিত। শুধু আমাদের দেশ কেন, বিশ্বের সব দেশেই স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বেশ পরিচিত এবং অধিকাংশ মানুষ বিষয়টি জানে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের একটা পার্থক্য আছে।
আমাদের দেশে প্রায় সকলেই, বিশেষ করে যারা ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত, তাদের সকলেই শব্দ দুটোর সঙ্গে অনেক বেশি পরিচিত। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব কী এবং কীভাবে এটি মেনে চলতে হয়, সেটা খুব ভালোভাবে জানে, তেমনটা মনে হয় না। কিন্তু অন্যান্য দেশে, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে যারা বিষয়টি জানে, তারা এই বিধান মেনেও চলে। এ কারণেই আমাদের দেশের পুঁজিবাজারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট সেভাবে মেনে চলা হয় না। এর একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে ব্যাংক ইনস্যুরেন্স।
ব্যাংক-ইনস্যুরেন্স প্রডাক্টের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট মেনে চলার বিধান থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ একটি ব্যাংকের ইনস্যুরেন্স প্রডাক্ট কোনো অবস্থাতেই সেই ব্যাংকের লেনদেন কভার করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। যেমন, এবিসি ব্যাংক যদি ইনস্যুরেন্স প্রডাক্ট ইস্যু করে, তাহলে সেই ইনস্যুরেন্স এবিসি ব্যাংক ব্যতীত অন্য যেকোনো ব্যাংকের লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে। এবিসি ব্যাংকের লেনদেনের জন্য অন্য কোনো ব্যাংকের ইস্যু করা ইনস্যুরেন্স নিতে হবে। এক কথায় নিজের প্রিমিয়াম নিজে নেওয়া যাবে না। নিলেই স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের অভিযোগ চলে আসবে। বিষয়টি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ বিধায় বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই, তাই অন্য কোনো পরিসরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইল।
এতকিছুর পরও বিএসইসি যে সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের অপরাধে বিশাল অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করতে পেরেছে, সেটাই এই মুহূর্তে দেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি ভালো লক্ষণ। কেননা যত বেশি শাস্তি প্রদান করা যাবে, তত বেশি পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরে আসবে। পুঁজিবাজারে অপরাধের জন্য এই শাস্তি বিধানের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানাই সবচেয়ে ভালো কাজ করে। কেননা মানুষ তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ভয় পাবে এবং এই বাজারে অন্যায় করার সাহস দেখাবে না। যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যত বেশি জরিমানা করতে পারে, সেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি সমীহ করে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিশ্বের সবাই ভীষণ ভয় পায় এবং মেনে চলে। কারণ এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরোপিত জরিমানায় বিশ্বের বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ও ব্যাংকের ধরাশায়ী অবস্থা। তবে শুধু জরিমানা আরোপ করলেই হবে না। সেই সঙ্গে জরিমানার টাকা আদায় করতে হবে।
ইতঃপূর্বে বিএসইসি একটি ব্যাংকের একাধিক চেয়ারম্যানকে শতকোটি টাকার মতো জরিমানা করেছিল। কিন্তু সেই জরিমানার অর্থ আদায় হয়েছে এমন খবর আমরা এখনও শুনিনি। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে জরিমানা আরোপ করে সেই জরিমানার টাকা আদায় করতে না পারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই যেকোনো প্রকারেই হোক না কেন আরোপিত জরিমানার অর্থ আদায় করতে হবে। সেই সঙ্গে আইনের যে সীমাবদ্ধতা বা ফাঁকফোকরের কারণে এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেটিও বন্ধ করতে হবে। এরকম কিছু পদক্ষেপ নিলেই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে। এর পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে পারলেই দেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে এবং বিনিয়োগবান্ধব হবে।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা