× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

সড়কে মৃত্যুর আর্তনাদ

রাফায়েল আহমেদ শামীম

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪৩ পিএম

সড়কে মৃত্যুর আর্তনাদ

প্রতিটি ভোর যেন এক অনিশ্চিত শ্বাস নিয়ে শুরু হয়। রাস্তা ঘেঁষে হাঁটতে গেলে মনে হয়, কে কোথায় থেকে আর ফিরবে নাÑ এটি এখন জীবনের এক নিত্যসংবিধি। কেউ অফিসে যাচ্ছেন, কেউ স্কুলে, কেউ হাসপাতালের পথে, কেউ আবার বাজারের চাপে গাড়ি চালাচ্ছেন, আর কেউ আবার নিঃশব্দে চলে যাচ্ছেনÑ রাস্তায় প্রতিদিনের দুর্ঘটনায়। অথচ রাজনীতির কোলাহল, ক্ষমতার দৌড়ঝাঁপ, দলের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের চাপে এই মৃত্যুর আর্তনাদ সংবাদপত্রের শেষ পাতায় অথবা পরিসংখ্যানের ঠান্ডা সংখ্যায় হারিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ২১ অক্টোবর মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতারা বক্তব্য দেন। বাংলাদেশে গত ১২ বছরে ৬৭,৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১,১৬,৭২৬ জন নিহত এবং ১,৬৫,০২১ জন আহত হয়েছেনÑ এমন তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা দুর্ঘটনার তথ্য বিভিন্ন পত্রিকা ও গণমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করেছেন। গড়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ২৬ জন মানুষ। প্রতিদিনই নিভে যাচ্ছে ২৬টি পরিবার, ভেঙে যাচ্ছে স্বপ্ন, থেমে যাচ্ছে শৈশবের হাসি এবং ধ্বংস হচ্ছে মানুষের জীবনধারা। 

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিপর্যয়কে বাস্তবভাবে মোকাবিলা করার কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। আজকের বাংলাদেশে সংবাদ মানেই রাজনীতি। কে ক্ষমতায়, কে পদ হারাল, কোন জেলায় দলীয় বিবাদÑ এসব নিয়েই চলে টেলিভিশনের টকশো, সংবাদপত্রের লিড নিউজ, অনলাইন পোর্টালের ব্যানার। কিন্তু একই দিনে যখন এক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা কোনো ছাত্র রাস্তায় নিহত হয়, তখন সেটি প্রকাশিত হয় দুই অনুচ্ছেদের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে। এই সমাজ এখন রাজনীতির এমন এক ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ, যেখানে মানুষের মৃত্যু কোনো সংবাদ নয়, বরং কেবল সংখ্যার খেলা। মিডিয়া ও রাষ্ট্র উভয়েই যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই নীরব মৃত্যুর সঙ্গে। কারণ এই মৃত্যুতে ‘ভোট’ নেই, ‘রেটিং’ নেই, ‘ক্লিক’ নেই। ফলে সড়কে ঝরে পড়া রক্ত আমাদের আর আলোড়িত করে না, বরং সংবাদ পাঠের অংশ হিসেবে আমরা নিঃশব্দে তা মেনে নিই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সরাসরি সরকারের ভুল নীতিমালাকে দায়ী করেছে এই বিপর্যয়ের জন্য। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা বরাবরই ছিল অবহেলার শিকার। যানবাহনের ফিটনেস যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া অনিয়মে ভরপুর এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান রাস্তায় চলছে প্রকাশ্যে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই হাজারো চালক দিনে-রাতে পরিবহন চালাচ্ছে। যেখানে পুলিশের চোখের সামনেই ওভারটেক, রোড-রেজ বা উল্টো লেনে গাড়ি চালানো হয়, সেখানে শাস্তি কার্যকর হয় না। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক ছায়া এত গভীর, যেকোনো চালক বা মালিককে আটক মানে রাজনৈতিক সংঘাতে জড়ানো। এই ভুল নীতির ধারাবাহিকতায় সড়ক এখন হয়ে উঠেছে মৃত্যুপুরী, আর রাষ্ট্র কেবল পরিসংখ্যানের হিসাব রাখেÑ মৃতদের আত্মার কোনো হিসাব নেই।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু মানবিক নয়, এটি অর্থনৈতিকও বটে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। অর্থাৎ আমাদের উন্নয়ন যখন এগোচ্ছে বলে দেখায়, তার এক বড় অংশ ঝরে যাচ্ছে এই দুর্ঘটনায়। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবারের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। একজন শ্রমজীবী পিতা মারা গেলে সন্তান স্কুল ছেড়ে কাজে নামে। একজন মায়ের মৃত্যু মানে এক শিশুর ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়া। এভাবে প্রতিদিন শত শত পরিবার দারিদ্র্যের ঘূর্ণিপাকে পড়ে সমাজে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার এই অদৃশ্য অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ আমাদের উন্নয়নের গল্পকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, কিন্তু তার রিপোর্ট কখনও প্রকাশিত হয় না। প্রতিশ্রুতি আসে, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবেÑ কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। কারণ পরিবহন খাতের প্রতিটি স্তরে রাজনীতির গভীর প্রভাব। বাস মালিক সমিতি, ট্রাক চালক ইউনিয়ন, এমনকি পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনÑ সব সংগঠনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া। এই প্রভাবের বলয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থারাও অসহায় হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, বিচারহীনতা আজ এক স্থায়ী সংস্কৃতি হয়ে গেছে। যে দেশে মৃত্যুর দায় কেউ নেয় না, সে দেশে জীবন কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।

সব দোষ শুধু সরকারের নয়। আমাদের নাগরিক আচরণও এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করছে। রাস্তা পার হতে গিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত থাকা, ওভারটেকের প্রবণতা, সিটবেল্ট বা হেলমেট ব্যবহার না করাÑ এসবই আমাদের অসচেতনতার প্রতিফলন। রাষ্ট্র যতই আইন করুক, মানুষ যদি নিজে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে দুর্ঘটনা কমবে না। সড়ক নিরাপত্তা মানে শুধু রাস্তায় নিয়ম নয়; এটি এক সামাজিক সংস্কৃতি, যা আমাদের পরিবার, শিক্ষা ও গণসচেতনতার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। সমাধানের পথ স্পষ্ট জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কমিশন গঠন করতে হবে, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করতে হবে। দুর্ঘটনা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে সময়সীমাবদ্ধ ও জনসমক্ষে আনতে হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের রাজনীতিকরণ বন্ধ করতে হবে।


রাফায়েল আহমেদ শামীম 

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা