ইমেইল থেকে
সানি মহারথী
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
সন্তানকে মানুষ করার বাসনা চিরন্তন কিন্তু মানুষ হওয়ার সংজ্ঞা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়। কেবল সার্টিফিকেটসর্বস্ব জ্ঞান নয় বরং মননশীলতা ও মানবিকতার নির্যাসই প্রকৃত সুশিক্ষা। এই শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে পরিবার আর এর বিস্তৃতি ঘটে সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার মুক্ত প্রাঙ্গণে। একাডেমিক সাফল্যের সোনার খাঁচা নয়, মুক্তচিন্তার সুবিশাল আকাশই হোক তার বিচরণের ক্ষেত্র। অভিভাবকের আসল যুদ্ধ দুর্ভাবনার সঙ্গে নয় বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো একটি প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি সন্তানের মধ্যে সঞ্চার করার মধ্য দিয়ে।
শিক্ষকের পাঠদান এক লহমার আলো কিন্তু পিতা-মাতা ও পরিবারের শিক্ষা জীবনের শাশ্বত আলোকবর্তিকা। সামাজিক রীতিনীতি আজ শুধু ঐতিহ্য বা প্রথা নয়, তা হয়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে গভীর ও অর্থবহ করার এক গতিশীল মানচিত্র। আধুনিক জীবনে শিষ্টাচার কেবল বড়দের প্রতি নত হওয়া নয় বরং তা হলো প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর এবং স্বতন্ত্রতাকে সম্মান জানানোর শিল্প। অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবহার তাই সাবধানতা ও সহমর্মিতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য। পরিবারকে হতে হবে এমন একটি মুক্তাঙ্গন যেখানে সন্তান নির্দ্বিধায় তার প্রশ্ন, দ্বিধা এবং ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে। এই গণতান্ত্রিক পারিবারিক বাতাবরণই প্রগতিশীল মননের প্রথম বীজ বপন করে।প্রগতিশীলতার সবচেয়ে জরুরি ভিত্তি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা।
লিঙ্গভিত্তিক ভেদাভেদ এবং চিরায়ত ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে সন্তানকে শেখাতে হবে প্রতিটি মানুষের অখণ্ড মূল্যবোধ। ছেলে সন্তানের প্রতি এই শিক্ষাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করেÑ তাকে জানতে হবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ সমানাধিকার ও সম্মানের দাবিদার। নারীকে শুধু ‘রক্ষার বস্তু’ হিসেবে দেখা নয় বরং তাকে একজন সহকর্মী, সহযাত্রী এবং স্বাধীন সত্তা হিসেবে সম্মান জানানোই আধুনিক সভ্যতার অলংকার। তার আচরণে যেন কখনও প্রভুত্ব বা আধিপত্যের ছায়া না পড়ে বরং যেন থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সংবেদনশীলতা। এটি কেবল আচরণবিধি নয় এটি একটি দার্শনিক ভিত্তিÑ যেখানে মনে রাখতে হবে কোনো লিঙ্গই অন্যের অধীন নয়।
বর্তমানে সঙ্গদোষের ধারণা কিছুটা বহুমাত্রিক আকার ধারণ করেছে। শুধু মানুষ নয়, তথ্যের জগৎÑ অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল স্ক্রিনÑ সেখানেও সন্তানের বিচরণের ওপর সতর্ক অথচ বিশ্বাসী দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য। অভিভাবকের কাজ এখন কেবল খারাপ বন্ধু থেকে দূরে রাখা নয় বরং ফেক নিউজ, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এবং অনৈতিক বিষয়বস্তু থেকে মননকে রক্ষা করার কৌশল শেখানো। তাদের মধ্যে যাচাই করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা কোনো তথ্য বা মতবাদকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে বরং সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিচার করতে শেখে। এই সচেতনতা তাকে শুধু সমাজের খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচাবে না তাকে একজন দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলবে।
যে সন্তান জীবনকে একটি বহুস্বরিক অর্কেস্ট্রা হিসেবে দেখতে শেখে, যেখানে প্রতিটি স্বরই প্রয়োজনীয় ও মূল্যবানÑ সেই সন্তানই প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি পরিবারে যদি প্রগতিশীলতা, সাম্য এবং সহমর্মিতার বীজ রোপণ করা যায়, তবে কোনো দুর্ভাবনাই তার বেড়ে ওঠাকে স্তব্ধ করতে পারবে না। পরিবার হোক চেতনা বিকাশের লীলাভূমি, যেখানে সন্তানের মনন মুক্তি পাবে কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার শৃঙ্খল থেকে।
সানি মহারথী
ধোবাউড়া, ময়মনসিংহ