ইমেইল থেকে
সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৯ পিএম
শিক্ষকতা এমন এক মহৎ পেশা যেখানে কালো বোর্ডে সাদা চক দিয়ে শুধু অক্ষর লেখা হয় না, গড়ে তোলা হয় প্রজন্মের চিন্তা, নৈতিকতা আর মানবিকতার ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের সমাজে এই পেশার প্রতি সম্মান ও আকর্ষণ আগের মতো আর নেই। একসময় স্কুল বা মাদ্রাসার শিক্ষককে গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ বলা হতো, কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের সম্মান প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের বক্তব্য অগ্রাহ্য, এমনকি কখনও অপমানও সহ্য করতে হয়। সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি আর মানসিকতার পরিবর্তনের এই যুগে প্রশ্নটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষকদের মর্যাদা আসলে কেন কমছে? আর এই পেশা কি এখনও অনুপ্রেরণাদায়ক?
আজকের সময়ে শিক্ষা অনেকটাই জ্ঞান কিংবা চরিত্র গঠনের চেয়ে পণ্য বা বিনিয়োগের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকরা প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেন, আর সেই হিসেবে শিক্ষককে ধরে নেন সেবাদাতা হিসেবেÑ এই ধারণা শ্রদ্ধা ও শিক্ষামূলক সম্পর্ককে ছাপিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ব্যবসায়িক সম্পর্কের রূপ নিচ্ছে ধীরে ধীরে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতন অপ্রতুল, বাড়ির ভাড়া, সংসারের দায়িত্ব সামলে পেশার প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যখন একটি সম্মানিত পেশা মানুষকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সমাজেও সেই পেশার গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যায়।
একসময় শিক্ষক ছিলেন গ্রামের বিচারক, পরামর্শদাতা, আলো দেখানোর মানুষ। এখন সমাজে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ, প্রভাব ও বিলাসিতা। ফলে পৃথিবীর অনেক দেশে শিক্ষকতা উচ্চ মর্যাদার হলেও আমাদের বাস্তবতায় শিক্ষকতা যেন দ্বিতীয় সারির পেশায় পরিণত হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তির প্রভাব শিক্ষকদের মর্যাদাকে আরেকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। ইন্টারনেট, গুগল, ইউটিউব সবকিছুই যেন জ্ঞানের সহজ উৎস। শিক্ষার্থীরা মনে করে, ‘সবকিছু তো অনলাইনে আছে’। ফলে শিক্ষকের প্রতি মুগ্ধতা বা নির্ভরতা আগের মতো নেই। অনেক সময় শ্রদ্ধার জায়গায় এসে দাঁড়ায় সন্দেহ কিংবা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব।
পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার রাজনীতি শিক্ষকতার আদর্শিক সৌন্দর্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের বদলে রাজনৈতিক প্রভাব, অবিচার কিংবা স্বজনপ্রীতি দেখা গেলে পেশাটির প্রতি মেধাবী তরুণদের আগ্রহ কমে যায়। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শিক্ষকদের মতামতকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। নীতিনির্ধারকরা শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু শিক্ষকের ভূমিকা সেখানে থাকে শুধু বাস্তবায়নকারীর।
এতসব বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকতা কি এখনও অনুপ্রেরণাদায়ক? হ্যাঁ, এখনও কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা বিশ্বাস করেন যে একজন ছাত্রের চোখে পরিবর্তন আনতে পারা, কাউকে স্বপ্ন দেখাতে শেখানো, কিংবা পরাজিত এক শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে তার সামর্থ্য বোঝানোই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। টাকা নয়, করতালির প্রয়োজন নেই একটি বাক্যই যথেষ্ট : ‘স্যার, আপনি না থাকলে আমি পারতাম না।’ এমন স্বীকৃতি কোনো পদক বা উপাধির চেয়ে অনেক বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক।
তবে সত্য হলো শুধু আবেগ দিয়ে শিক্ষকতা ধরে রাখা যায় না। একটি পেশা তখনই অনুপ্রেরণাদায়ক হয়, যখন সেখানে সম্মান, নিরাপত্তা ও বিকাশের সুযোগ থাকে। তাই শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো, নীতিনির্ধারণে শিক্ষককে অংশীদার করা এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। গণমাধ্যমেও শিক্ষকদের ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে সমাজ বুঝতে পারে এই মানুষগুলো শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, জাতি গড়েন।
শিক্ষক শুধু পেশা নয়, এটি একটি দায়িত্ব। একটি মনের অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখানোর কাজ। শিক্ষককে সম্মান দেওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎকেই সম্মান জানানো। তাই এখনই সময় শিক্ষকতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনার, যেন আগামী প্রজন্মও বলতে পারে ‘একজন সৎ ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বদলে দিয়েছিল আমার জীবন।’
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়