ইমেইল থেকে
মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩১ পিএম
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৭ পিএম
শীত মানেই এক বিশেষ আনন্দের ঋতু। কুয়াশায় ঢাকা ভোর, শিশিরভেজা ঘাসের ওপর সূর্যের আলো যখন ঝলমল করে ওঠে, তখন প্রকৃতি যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। এই শীতের আগমন শুধু মানুষের পোশাক বা প্রকৃতির আবহে পরিবর্তন আনে না, সঙ্গে নিয়ে আসে প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্যÑ অতিথি পাখিদের আগমন। তারা আসে দূর উত্তরের দেশ থেকে, হাজার হাজার মাইল উড়ে এসে, বিশ্রামের আশ্রয় খুঁজতে। এই পাখিরা আসে শান্তি ও উষ্ণতার টানে, আমাদের দেশের হাওর, বিল, নদীচর আর জলাভূমিকে প্রাণবন্ত করে তুলতে। তাদের আগমন যেন প্রকৃতির এক নিঃশব্দ উৎসব।
অতিথি পাখিরা পৃথিবীর নাগরিক। তাদের কোনো সীমান্ত নেই, কোনো পাসপোর্ট লাগে না। তারা প্রতিবছর দূর সাইবেরিয়া, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, চীন, নেপাল কিংবা হিমালয়ের তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসে আমাদের এই ছোট্ট দেশে। সেখানে যখন বরফে ঢেকে যায় মাঠ, নদী জমে যায়, খাদ্য ফুরিয়ে আসে, তখন এই পাখিরা দলবদ্ধ হয়ে উড়ে আসে দক্ষিণে, যেখানে আছে পানি, উষ্ণতা, খাদ্য আর জীবন। বাংলাদেশের বিস্তৃত জলাভূমি, হাওর-বাঁওড়, নদীচর, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকা তাদের জন্য স্বর্গের মতো। এখানে তারা খাবার খুঁজে পায়, বিশ্রাম নেয়, কখনও দীর্ঘ যাত্রার আগে শক্তি সঞ্চয় করে। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা আসে।
এই সময়টায় দেশের নানা প্রান্তে দেখা যায় নানা রঙের, নানা আকারের পাখি। চখাচখি, সরালি হাঁস, পাতিহাঁস, বালিহাঁস, ধলাপিঠ রাজহাঁস, কালিম পাখি, বেগুনি বক, খয়রা চখাচখি, চিতল হাঁসÑ সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক চলমান চিত্রকল্পে রূপ নেয়। হাওরের পানিতে তাদের ভেসে থাকা, ডানার ঝাপটা, কলতান, খেলাÑ সবকিছুতেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। গ্রামের শিশুরা তাদের দেখতে আসে, বৃদ্ধরা স্মৃতিচারণ করেন পুরনো দিনের, আর প্রকৃতিপ্রেমীরা বিমোহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই ডানার দিকে, যেখানে প্রকৃতির নৈঃশব্দ্য ও জীবনের গীত মিশে আছে।
অতিথি পাখিদের আগমন শুধু সৌন্দর্যের নয়, এটি আমাদের পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা জলাভূমির পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ পরিশুদ্ধ রাখে, অনেক সময় বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে। তাদের উপস্থিতি জলাশয়ের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রকৃত অর্থে তারা আমাদের বন্ধু, প্রকৃতির কর্মী, যারা নীরবে আমাদের জন্য কাজ করে যায়। তাদের বিলুপ্তি মানে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, সেই অতিথি পাখিরা নিরাপদ নয়। যে মানুষ একসময় তাদের কলরবে আনন্দ পেত, সেই মানুষই এখন তাদের সবচেয়ে বড় হুমকি। শীত এলেই শুরু হয় অবৈধ শিকার মৌসুম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে হাওর ও বিলের পাশে বসবাসকারী কিছু অসাধু ব্যক্তি পাখি ধরতে বসায় ফাঁদ, জাল, কখনও বন্দুক। তারা ধরে, মারে, বিক্রি করে। বাজারে বিক্রি হয় অতিথি হাঁসের মাংস, অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্টে ‘বিশেষ পদ’ হিসেবে তা পরিবেশন হয়। অথচ তারা জানে না, এটি কেবল আইনবিরোধী নয়, এটি নৈতিকতার বিরুদ্ধেও এক ভয়ংকর অপরাধ। অতিথি পাখি হত্যার মানে হলো প্রকৃতির প্রাণকেই হত্যা করা।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় অতিথি পাখির সমারোহ দেখা যেত। টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, সুন্দরবন কিংবা নদীর চরে হাজার হাজার পাখির আনাগোনা ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এখন সেই দৃশ্য অনেক জায়গায় বিলুপ্ত। নদী ও হাওরের জল দূষিত, অনেক জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে, গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে। শিকারিদের ভয়, মানুষের লোভ, আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবÑ সব মিলিয়ে তারা এখন বিপন্ন। এই বিপন্নতার জন্য শুধু শিকারি নয়, দায় আমাদের সবার। শহরায়নের নামে আমরা নদী দখল করছি, জলাভূমি শুকিয়ে ফেলছি, কৃষিজমিতে বিষ দিচ্ছি। এতে শুধু মাছ বা জলজ প্রাণ নয়, পাখির খাদ্যও নষ্ট হচ্ছে। তারা কোথায় যাবে? কোথায় আশ্রয় নেবে? মানুষ তার নিজের উন্নয়নের নামে প্রকৃতির প্রতিটি অংশকে ধ্বংস করছে, অথচ ভুলে যাচ্ছেÑ এই প্রকৃতিই মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি।
অতিথি পাখিদের বিলুপ্তি মানে শুধু এক প্রজাতির বিলুপ্তি নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। তারা প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে, জলাশয়কে পরিশুদ্ধ রাখে। যদি তারা না থাকে, তাহলে বাড়বে পোকামাকড়, বাড়বে জল দূষণ, কমবে জীববৈচিত্র্য। আর জীববৈচিত্র্য কমে গেলে মানুষের জীবনও বিপন্ন হয়ে উঠবে। এখন সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। অতিথি পাখিদের বাঁচাতে হলে তাদের আশ্রয়স্থল বাঁচাতে হবে। জলাশয় ভরাট বন্ধ করতে হবে, নদী ও বিলের দূষণ রোধ করতে হবে, শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবেÑ কারণ তারাই প্রকৃত রক্ষক। যেখানে অতিথি পাখি আসে, সেখানকার মানুষকে বোঝাতে হবে, এই পাখিরা তাদের বন্ধু, শত্রু নয়। তারা পর্যটন বাড়াতে পারে, জীবিকার নতুন উৎস হতে পারে। হাওর এলাকার যুবকদের যদি এই সচেতনতার আলোয় প্রশিক্ষিত করা যায়, তারা পাখি রক্ষক হিসেবে কাজ করবে, আর সেই সঙ্গে তারা আয়ের পথও পাবে।
অতিথি পাখিরা আমাদের দেশে আসে অতিথি হয়ে, তাই তাদের আতিথেয়তা নিশ্চিত করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব। অতিথিকে হত্যা নয়, সুরক্ষা দিতে হয়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে মানবতার প্রতি সম্মান জানানো। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেটি শুধু মানুষের নয়Ñ গাছ, পাখি, প্রাণী, নদীÑ সবাই মিলে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলেছে। তাই একে অপরের অস্তিত্বকে সম্মান জানাতে শিখতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়Ñ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও অতিথি পাখি সংরক্ষণের শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে। শিশুরা যদি পাখিকে ভালোবাসতে শেখে, তবে বড় হয়ে কেউ আর বন্দুক হাতে নেবে না।
অতিথি পাখির নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাফেরা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা কেউ যেন তাদের শত্রু না হই, বরং হই তাদের বন্ধু। আমরা যেন এমন এক দেশ গড়ি, যেখানে মানুষ ও পাখি একসঙ্গে বাঁচতে পারে, যেখানে আকাশে আবার ভেসে বেড়াবে তাদের ডানার ছায়া, আর হাওরের জলে ভাসবে তাদের কলতান। অতিথি পাখিরা প্রকৃতির দূত, শান্তির বার্তাবাহক। তাদের রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা, জীবনের সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখা। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই অঙ্গীকার করিÑ আমরা অতিথি পাখি মারব না, বরং তাদের জন্য এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও ভালোবাসায় ভরপুর করে তুলব। যতদিন আকাশে উড়বে পাখিরা, ততদিনই বেঁচে থাকবে মানুষ, প্রকৃতি, আর পৃথিবীর শান্তি।
মো. শামীম মিয়া
আমদিরপাড়া, সাঘাটা, গাইবান্ধা