নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২৮ পিএম
দেশজুড়ে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনের হাওয়া। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ ও ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে যেভাবে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার হচ্ছে, তা শঙ্কিত হওয়ার মতো। সংবাদগুলো নিঃসন্দেহে জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এদিকে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি সুযোগ নিচ্ছে অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রও। এই চক্রই রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে এসব অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ৫ নভেম্বর গণসংযোগকালে চট্টগ্রামে বিএনপির একজন প্রার্থীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। সেই সময় গণসংযোগে থাকা বিএনপির একজন কর্মী গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনার পর জনমনে শঙ্কা আরও বেড়েছে। পরের দিন রাউজানেও বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের সংঘাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৫ জন।
৭ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘অবৈধ অস্ত্রের ঝনৎকার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে পিলে চমকাবার মতো তথ্য উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে চলছে সংঘাত ও সহিংসতা। আর এ কারণে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন দল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে স্থানীয় পর্যায়েও অস্ত্রের মজুদ তৈরি করছে। চেষ্টা চলছে রাজধানী ঢাকায়ও বড় ধরনের অস্ত্রের চালান প্রবেশের। সবার ধারণা ভোটের মাঠ দখলে রাখতে এসব অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা এসব তথ্য সামনে এনেছে। সংস্থাটি দেশের অস্ত্র চোরাচালানের রুট চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সুপারিশ করেছে।
জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুসরণ করে বিজিবির পক্ষ থেকে সব সীমান্তে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলার এসপিরাও তাদের গোয়েন্দা ইউনিটকে আরও সজাগ করেছে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের চালান যেন রাজধানীতে না ঢোকে, সেজন্য কাজ করছেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তারা ধারণা করছেন, ঢাকায় আগেই কিছু অস্ত্রের চালান চলে এসেছে। পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে এখন থেকেই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি। এই ব্যাপারে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অস্ত্রের অনুপ্রবেশ সব সময়ই কম-বেশি ঘটে থাকে। এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেমন ‘পুশইন’ ঘটছে, তেমনি অস্ত্রের চোরাচালানও বাড়ছে। পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হলে এখনই সব ধরনের পদক্ষেপ জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচন সামনে রেখে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টার আলামত মিলছে। সম্প্রতি একাধিক হত্যাকাণ্ডে ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের। এসব অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, অস্ত্র আসছে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫১টি গোলাবারুদ, যা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, এসব লুণ্ঠিত অস্ত্রের বেশিরভাগেরই আকার পাল্টে ফেলে সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। তারা বলছেন, দেশের বর্ডার এলাকায় পুরোপুরি নজরদারি চলছে। যেসব এলাকা অস্ত্র চোরাচালানের জন্য বেশি আলোচিত, সেখানে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ নজরদারির নির্দেশনা দেওয়া আছে।
এটা মানতেই হবে, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, ভীতি প্রদর্শনÑ এসবের পেছনে থাকে অস্ত্রের ব্যবহার। অপ্রিয় হলেও সত্য, একসময় যেসব এলাকায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল উৎসবের মতো, আজ সেসব জায়গায় আতঙ্ক ও সংঘর্ষের আশঙ্কা বিরাজ করছে। এর ফলে গণতন্ত্রের মূল চেতনাÑ নিরাপদ ও নিরপেক্ষ ভোটাধিকার গভীরভাবে ক্ষতির মুখে।
অবৈধ অস্ত্র সাধারণত সীমান্তের নিদিষ্ট কিছু পথে দেশে প্রবেশ করে। তবে ইদানীং সমুদ্রবন্দর, পাহাড়ি অঞ্চলসহ নৌপথ এখন এই অস্ত্র ব্যবসার রুটে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে কিছু কারখানাতেও হাতে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র উৎপাদনের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার জানিয়েছে। এসব অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ে জড়িত রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহল। যাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানও অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের কারণে সীমিত পর্যায়ে আটকে থাকে। এ অবস্থায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর অভিযান, সীমান্তে নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। নির্বাচন কমিশনকেও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হবেÑ প্রার্থী যাচাই, নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া চাই, তারা কোনোভাবেই অস্ত্রধারী বাহিনী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহায়তা নেবে না।
আমরা মনে করি, জনগণের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান। অবৈধ অস্ত্রমুক্ত নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক দাবি নয়Ñ এটি জাতির নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এখন সময় এসেছে সকলের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলারÑ অস্ত্র নয়, ভোটই হোক গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচনের একমাত্র শক্তি।