× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভাসানী-জিয়া

আদর্শ ও চেতনার সম্মিলন

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১০:০৪ এএম

আদর্শ ও চেতনার সম্মিলন

৭ নভেম্বরের বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তার ভূমিকাও আলোচনার দাবি রাখে। যদিও ১৯৭৫ সালের এই দিনের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি তার অংশগ্রহণ ছিল না, তবে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি যে নীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ৭ নভেম্বরের চেতনাকে প্রভাবিত করে। মওলানা ভাসানী সব সময় ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ৭ নভেম্বরের চেতনাকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে, ভাসানীর আদর্শ এই চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাকশাল প্রতিষ্ঠার ৬ মাস ২০ দিনের মাথায় ১৯৭৫-এর ১৪-১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার সংঘটিত করে ইতিহাসের নৃশংস ঘটনা। সেদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র অল্প সময়ের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে. এম শফিউল্লাহ, বিমানবাহিনী প্রধান এ. কে. খন্দকার ও নৌবাহিনী প্রধান কমডোর এম. এইচ. খান পৃথক পৃথক বেতার ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৩ আগস্ট থেকে মওলানা ভাসানী সন্তোষে তার ইবাদত গৃহে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। ১৫ আগস্ট ফজরের নামাজের পর তিনি ইবাদতগৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন। এরই মধ্যে বেতারে তিনি ঢাকার অভ্যুত্থানের ঘটনা ও শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন।

পরদিন ১৬ আগস্ট জেনারেল ওসমানী প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের নির্দেশে সন্তোষে মওলানা ভাসানীর কাছে গিয়ে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তার বিবৃতি প্রত্যাশা করলে তিনি বলেন, ‘সবই যখন শেষ তখন আর এই বুড়োর বিবৃতির প্রয়োজন কী?’ ২১ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করলেও তিনি কোনো বিবৃতি দেননি। ২৪ আগস্ট কয়েকজন রাজনীতিবিদ মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করলে তিনি বিবৃতি প্রদান করেন, যাতে তিনি ‘মেহনতি মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মচারী, সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী, বে-সামরিক নাগরিক ও মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের প্রতি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই নয় সকলের জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্জনের জন্যে নিরলসভাবে কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান।’ (দৈনিক বাংলা ২৫ আগস্ট ’৭৫)

৪ অক্টোবর এক বেতার ভাষণে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা মওলানা ভাসানীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি ‘সকল রাজবন্দির মুক্তি, প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে (প্রেসিডেন্টের) যে ভাষণ দেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানান। ৯ অক্টোবর তিনি এক বিবৃতিতে ৭ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের সন্তোষে এক কৃষক সম্মেলনের ঘোষণা দেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদের ৮২ দিনের শাসনকালে মওলানা ভাসানী কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হননিÑ এ সময় তিনি সন্তোষে অবস্থান করেন। মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা সন্তোষে যেতেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

৩ নভেম্বর রাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। ৩ নভেম্বর ঘটে যায় ইতিহাসের আরেকটি নৃশংস ঘটনা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ৪ জাতীয় নেতাÑ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম. মনসুর আলী ও এ. এইচ. এম কামারুজ্জামানকে। খন্দকার মোশতাক আহমেদ সে সময় গণভবনে থাকলেও কার্যত তিনি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত। খালেদ মোশারফকে ‘১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর পূর্বাহ্ণে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করিয়া চিফ অফ আর্মি স্টাফ নিয়োগ করা হয়।’

এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয় যে, ‘একই দিনে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম পিএসসি পদত্যাগ করায় তিনি (খালেদ মোশারফ) তাহার স্থলাভিষিক্ত হইয়াছেন।’ ৬ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এখানেই শেষ নয় ৭ নভেম্বর আরেক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রক্ষমতায় নতুন বাক সৃষ্টি হয়। যাকে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বলে অভিহিত করা হয়। বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমান মুক্তি পান। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত বাম নেতা হায়দার আকবর খান রনো মাসিক অনুসরণ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘অভ্যুত্থান হিসাবে ৭ নভেম্বর সিপাহি অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। … মধ্যরাত থেকে দলে দলে সিপাহিরা আর্মি গাড়ি করে স্লোগান দিতে দিতে শহরে প্রবেশ করল। ট্যাংক বাহিনী ট্যাংকসহ শহরে ঢোকেন। সিপাহিদের স্লোগান ছিল ‘সিপাহি বিপ্লব-জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই’, ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’, ‘রুশ ভারতের দালালরা হুঁশিয়ার’। শেষ রাতের দিকে রেডিও স্টেশন থেকে আবেগজড়িত কণ্ঠে ঘোষণা করা হলো যে, মেহনতি মানুষের সন্তান সিপাহিরা বিপ্লব করেছে। … ঢাকা শহর সিপাহি-জনতার উৎসবমুখর মিছিল আর মিছিলে ভরে গেল। এ যেন জনতার এক মহাবিজয় উল্লাস। এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য আমরা আর কোনো দিন দেখিনি।

…৭ নভেম্বর ভোরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রেডিওতে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। …৭ নভেম্বর থেকে জিয়া ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সেনাবাহিনীতে পুরাতন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। সিপাহিদের ক্যান্টনম্যান্টে ফিরে আসার জন্য তিনি আহ্বান জানালেন। সিপাহিদের মাঝে একাধিক বক্তৃতা করলেন।’ ৭ নভেম্বর দুপুরে বঙ্গভবন থেকে সন্তোষে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ওইদিনই জেনারেল জিয়ার কাছে তিনি এক তারবার্তা প্রেরণ করেন। 

পরদিন মওলানা ভাসানী জিয়াউর রহমানের কাছে এক পত্র প্রেরণ করেন, যাতে লিখেছিলেন, ‘আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা, তুমি বিরাট দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছ, তাহা পালন করিতে সক্ষম হও।’ ১২ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট সায়েম ও জিয়াউর রহমানের অনুরোধে আতাউর রহমান খান ও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন সন্তোষে মওলানা ভাসানীর নিকট যান একটি বিবৃতি দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। তারা মওলানা ভাসানীর বক্তব্য রেকর্ড করে নিয়ে আসেন, যা ১৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ দৈনিক বাংলা ও হক কথায় প্রকাশ করা হয়। যেখানে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করিবার সাম্প্রতিক এক গভীর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা হইয়াছে। তাহাতে বীর মোজাহেদ প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার ও দেশপ্রেমিক জনসাধারণ যে ভূমিকা পালন করিয়াছেন তজ্জন্য অন্তরের অন্তস্তল হইতে সকলকে মোবারকবাদ জানাইতেছি। কিন্তু, পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের নগণ্যসংখ্যক মীরজাফরকে অবলম্বন করিয়া এখনও দেশি-বিদেশি শক্তি আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বানচাল করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছে। … যেকোনো ত্যাগের বিনিময়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ও আনসারদের শৃঙ্খলা বজায় রাখিতে হইবে। দেশরক্ষায় আমাদের তিন বাহিনীর বিশেষ দায়িত্ব রহিয়াছে। … এতদসঙ্গে জনগণ কেউ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিলে চলিবে না। … বাংলাদেশ পৃথিবীতে মর্যাদার সহিতই বাঁচিয়া থাকিবে। জাতি-ধর্ম-গোত্র-বর্ণনির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসাবে যাহাতে আমরা বিশ্বের দরবারে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারিÑ আল্লাহ পাকের দরবারে এই মোনাজাত করিতেছি। আল্লাহ আমাদের সহায় হউন। নাসরুম মিনাল্লাহা ওয়া ফাতহুন কারীব।’

৭ নভেম্বর-পরবর্তী শুধু জিয়াউর রহমানকে সমর্থন দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। বরং জিয়াউর রহমান ও তার সরকার এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মওলানা ভাসানী তার বৃদ্ধ বয়সে ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে। জনসভায় বক্তব্যের মাধ্যমে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার করেছেন। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে করেছেন ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। এই সকল বিবেচনাই মওলানা ভাসানীকে যদি আমরা জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক শক্তি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করতে ব্যর্থ হই তাহলে নিজেদেরকে কীভাবে দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী বলি? ৭ নভেম্বরের চেতনার সঙ্গে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। 

সুতরাং, মওলানা ভাসানীকে বাদ দিলে ৭ নভেম্বরের চেতনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তার আদর্শ ও নীতি নৈতিকতার প্রসঙ্গ এই চেতনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়। তাই মওলানা ভাসানীকেও যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, মওলানা ভাসানী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য লড়াই করেছেন এবং সে কারণে নীতি ও নৈতিকতা রক্ষার গুরুত্ব তিনি সব সময় তুলে ধরেছেন। ৭ নভেম্বরের চেতনাও একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।


এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা