× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

৭ নভেম্বর

গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের এক মাহেন্দ্রক্ষণ

আবু জুবায়ের

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১০:২৮ এএম

গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের এক মাহেন্দ্রক্ষণ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের এক অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার মহাবিপ্লব দেশকে একদলীয় শাসনের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে এনেছিল। ৭ নভেম্বরের গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লব বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সংকটময় সময়ে, যখন স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বুঝতে হবে সেই অন্ধকার অধ্যায়, যা বাকশাল নামে পরিচিত।

স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী উত্থাপন করেন। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর যে বিলটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন, তা মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে ২৯৪-০ ভোটে পাস হয়ে যায়। একই দিনে রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেন এবং কার্যকর হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সংবিধান এবং জনগণের মৌলিক অধিকার এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। বাকশাল ছিল মূলত একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা। দেশের ৩৫টি সংবাদপত্রের মধ্যে মাত্র চারটি ছাড়া সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাকি চারটি সংবাদপত্রও রাষ্ট্র-নিযুক্ত সম্পাদকদের অধীনে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বাক-স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা হয়। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সব পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭২ সালের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি ‘গণতন্ত্র’ এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তিরোহিত হয়ে যায়।

৭ নভেম্বরের বিপ্লবের নায়ক জিয়াউর রহমান শুধু ১৯৭৫ সালেই নয়, বরং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর বাংলাদেশ নিমজ্জিত হয় এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে। খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় এলেও প্রকৃত ক্ষমতা ছিল অভ্যুত্থানকারী সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেই আসে আরেকটি কালো অধ্যায়Ñ ৩ নভেম্বর।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করে রাখেন। ৪ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন।

কিন্তু এই অভ্যুত্থান নিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে গভীর উদ্বেগ ও সন্দেহ। বাংলাদেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে গুজব রটে যায় যে খালেদ মোশাররফ এবং তার সহযোগীরা ছিলেন ভারতীয় এজেন্ট, যারা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করে দিতে চান। ৩ নভেম্বরের ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাÑ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে একটি শোক মিছিল যায়, যাতে খালেদ মোশাররফের ভাই এবং মা অংশ নেন। এতে শহরে রটে যায় যে এটি ‘আওয়ামী লীগ-বাকশালীদের’ পক্ষে অভ্যুত্থান।

কর্নেল আবু তাহের তার জবানবন্দিতে বলেছিলেন, ‘৩ নভেম্বর বহু সেনা সদস্য, এনসিও এবং বেসিও আমার নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে এলেন। তারা আমাকে জানালেন, ভারত খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে মদদ জুগিয়েছে এবং বাকশালের সমর্থকরা আবার ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে।’ দেশজুড়ে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল বাকশাল ফিরিয়ে আনা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা।

৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে বিরাজ করে এক শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চয়তা। সেনাবাহিনীর জনপ্রিয় নেতা জিয়াউর রহমান ছিলেন বন্দি। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন। জনগণ উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে দেশকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে সিপাহি ও জনতা।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ভোর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দিনের সূচনা। সেদিন ভোরের প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গেই সিপাহিরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসেন। তারা অস্ত্রাগার থেকে স্টেনগান, রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র সংগ্রহ করেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে পড়ে একটি অভূতপূর্ব বিদ্রোহ। ‘সিপাই-সিপাই ভাই ভাই, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিন্দাবাদ’ Ñ এসব স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক।

জেনারেল মাহবুবুর রহমান তার বিখ্যাত বই ‘কিছু স্মৃতি কিছু কথা’-তে লিখেছেন, ‘৭ নভেম্বর দেশজুড়ে সৈনিক-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব উত্থান ঘটে। আর জেনারেল জিয়া সে অভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গমালার শৃঙ্গে আরোহণ করে উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বের পাদপ্রদীপে।’

বেঙ্গল ল্যান্সারের হাবিলদার সারওয়ারের নেতৃত্বে একদল জওয়ান গেল জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রেডিও থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বলা হয়, ‘সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। ৭ নভেম্বর ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি’। জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। ওইদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহি-জনতা আলিঙ্গন করে একে অপরকে। 

বিদ্রোহী সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে। তারা ট্যাংক, ট্রাক, জিপে করে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বেরিয়ে এসে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে। তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেয়। স্লোগান দেয় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ, সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিন্দাবাদ। সেদিন সিপাহি এবং জনতা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিল যে বাংলাদেশের মানুষ কখনোই স্বৈরতন্ত্র মেনে নেবে না। তারা চায় গণতন্ত্র, চায় স্বাধীনতা, চায় সার্বভৌমত্ব। এই বিপ্লবে খালেদ মোশাররফ এবং তার কয়েকজন সহযোগী নিহত হন। 

৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর জিয়াউর রহমান শুরু করেন দেশ গড়ার এক নতুন অধ্যায়। ১৯৭৬ সালের ২১ এপ্রিল তিনি চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেখানে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তিনি পান শতকরা ৭৬ দশমিক ৬৩ ভাগ ভোট। এই নির্বাচন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের জনগণ তাকে তাদের নেতা হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে প্রথমেই বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল করেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি দেন। যেসব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো পুনরায় চালু করার অনুমতি দেন। বাক-স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। গণতন্ত্রের যে স্বপ্ন বাকশাল চূর্ণ করে দিয়েছিল, জিয়াউর রহমান সেই স্বপ্ন পুনর্জীবিত করেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি পায় ২০৭টি আসন। এই নির্বাচন আবারও প্রমাণ করে যে জনগণ জিয়াউর রহমান এবং তার নীতি ও আদর্শকে সমর্থন করে।

জিয়াউর রহমান শুধু রাজনৈতিক সংস্কারই করেননি, তিনি দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি গ্রামের মানুষের কাছ থেকে এসেছি, আমি তাদের দুঃখকষ্ট বুঝি।’ তিনি শুরু করেন ‘গ্রাম সরকার’ প্রকল্প, যার মাধ্যমে গ্রামের উন্নয়নে স্থানীয় মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যেখানে ছিল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার প্রসার, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য।

জিয়াউর রহমানের আমলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৮০ সালে তিনি এই প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করেন। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (OIC), জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের উপস্থিতি শক্তিশালী করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তার হাতে শহীদ হন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার এই অকাল মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন, যে দেশ গড়তে চেয়েছিলেন, তা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।

আজ যখন আমরা ৭ নভেম্বর উদযাপন করি, তখন আমরা স্মরণ করি সেই সকল দেশপ্রেমিক সিপাহি এবং সাধারণ জনগণকে, যারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিলেন। আমরা শ্রদ্ধা জানাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি, যিনি বাংলাদেশকে দিয়ে গেছেন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিশা।


আবু জুবায়ের 

কবি ও গবেষক, প্যারিস

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা