× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

প্রবাসীদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিন

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১০:২৬ এএম

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:১৪ পিএম

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম।

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম।

চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসীরা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৩.৬% বেশি। সরকার কর্তৃক অর্থ পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ এবং হুন্ডি প্রবণতা কমার কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবরের প্রথম ২৬ দিন পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ ১১.১% বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য একটি হিসাবে এই সময়ে প্রবৃদ্ধি ১৪.৪% ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ১০.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮.৯ বিলিয়ন ডলার। শুধু অক্টোবর মাসেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৭% বেশি। এর কারণ হলো, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারের অর্থ পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং হুন্ডির প্রভাব কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি।

রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ভালো খবর। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি সত্ত্বেও চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। যাদের এখনও অবহেলার চোখে দেখা হয়। আর অবহেলার প্রমাণটা পাওয়া যায় বিমানবন্দরে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে যাই হোকÑ পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও উন্নত জীবনের আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার যুবক পাড়ি জমাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

সুদে টাকা নিয়ে ভিটেবাড়ি বন্ধক দিয়ে চড়া দামে ভিসা নিয়ে, অনেকেই আবার টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় সমুদ্রপথে। প্রবাসীরা রাতদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যায় শুধু পরিবারের সুখ আর শান্তির জন্য। দুই ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে সবাই মজা ও আনন্দ করে। প্রবাসে ঈদের দিনেও কাজে যেতে হয়। কর্মস্থলে সহপাঠীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নেয় নিজেদের মতো করে। আবার বেশিরভাগ দেশেই নিজ দেশের বাংলাদেশিদের কারণে বেতন, আকামাসহ নানা ধরনের ঝামেলার মধ্যে দিন কাটে প্রবাসীদের। মাস শেষে যখনই বেতন হাতে পায় সেই বেতনের টাকা কখন দেশে পরিবারের কাছে পাঠাবে সেই চিন্তায় অস্থির থাকে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কাজ করেও মাস শেষে ঠিকমতো বেতন পায় না। বেতন দিতে দেরি হলে দেশ থেকে ফোন আসে। মাস তো শেষ, টাকা কোথায়? পাড়ার দোকানে ও পাওনাদাররা আসছে আরও শোনায় নানান ধরনের কথা।

পরিবারের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নানাবিধ চিন্তায় বাসা বাঁধে হৃদরোগের মতো নীরব ঘাতক। প্রতিদিন শোনা যায় ওমুক নামের ওমুক উপজেলার এক প্রবাসী ভাই স্ট্রোক করে মারা গেছেন। এ ধরনের সংবাদ প্রতিদিনই চোখে পড়ে ফেসবুক খুললে। যাদের আত্মীয়স্বজন থাকে মৃত প্রবাসী মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে সম্পন্ন করতে শুরু করে আইনি কার্যক্রম। বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় কফিনবন্দি করে মরদেহ দেশে পাঠায়। কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে বাংলাদেশ সরকার লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরর্বতীতে তিন লাখ টাকা প্রদান করে। কিন্তু কেউ একজন বিদেশে মারা গেলে একটি লাশ কীভাবে দেশে আসে সেই খোঁজ কেউ রাখে না। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন গুঞ্জন করে লাশের সঙ্গে কত টাকা আসছে? শুধু মা-বাবা ছাড়া প্রায় সবার মনে এ কৌতূহল জাগে কত টাকা এসেছে কফিনের সঙ্গে। লাশ আসার আগে পাওনাদাররা এসে বসে থাকে টাকার জন্য। অনেক সময় লাশ দাফন দিতেও বাধা দেওয়ার ঘটনা শোনা যায়। বেশিরভাগ শ্রমিক হিসেবে কম বেতনে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলত। সংগঠন বা বন্ধুবান্ধব মিলে প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা তুলে যে যা পারে সহযোগিতা করে। 

এমনও প্রবাসীর মরদেহ হিমঘরে বক্সে পড়ে আছে, যার খোঁজখবর নেওয়ার কেউ নেই। দেখা যায়, এদের মধ্যে বেশিরভাগ নকল পাসপোর্ট বা অবৈধ পথে আসা প্রবাসী। অনেক সময় বাংলাদেশের নাগরিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, অন্য দেশের পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করেন। তথ্য গরমিল থাকার কারণে খোঁজ না পেলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন দিয়ে দেওয়া হয়। পরিবারে সুখের ও শান্তির জন্য আসা প্রবাসী যখন অসুস্থ হয়ে দেশে যায় কিছুদিন পর টাকার অভাবে সেই প্রবাসী ও তার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করে। আগে যে পরিবার দশজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে এখন চোখ শরমে আত্মীয়স্বজন কারও কাছে বলতে পারে না নীরব কান্না আর দুঃখে জীবন যায় তাদের। তাই প্রবাসীদের নিজের প্রতি নজর দেওয়া বেশি জরুরি। 

২০২৪ সালে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রবাসীর সংখ্যা কত তা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ রয়েছে। প্রতিবছরই প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায় এবং অনেকেই দেশে ফিরে আসে। তাই বাংলাদেশের মোট প্রবাসীর সংখ্যা কত তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা খুবই কঠিন। তবে আনুমানিকভাবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার জরিপের আলোকে ২০২৪ সালের বাংলাদেশি প্রবাসী সংখ্যার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। ২০২৪ সালে সারা বিশ্বে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১৩.৫ মিলিয়নে। এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তথ্যমতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখের বেশি। 

বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশে নিজেদের কর্মক্ষেত্র স্থাপন করে প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। তারা প্রতিবছর প্রায় বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। এই রেমিট্যান্স দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান খুঁজে নেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তারা নির্মাণ, গৃহস্থালি কাজ এবং অন্যান্য বিভিন্ন অদক্ষ শ্রমের কাজে নিয়োজিত থাকেন। অন্যদিকে, ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক বাংলাদেশি শিক্ষিত পেশাজীবী হিসেবে আইটি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কাজ করছেন।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কর্মসংস্থান সুরক্ষা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রায়শই কঠিন কাজের পরিবেশ। এ ছাড়াও, প্রবাসে বসবাসরত অনেকেই ভিসা ও অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে পড়েন। অনেক প্রবাসী তাদের পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে মানসিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েন।

প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সর্বদা চেষ্টা করেন। তারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় উৎসব এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বজায় রাখেন। এর মাধ্যমে তারা শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করেন না, বরং বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও স্বার্থরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কনস্যুলার সেবা, আইনি সহায়তা, এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও, সরকার প্রবাসী রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুবিধা প্রদান করে থাকে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী সংখ্যা কত তার ওপর বিভিন্ন রিসার্চ থেকে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। তবে একটি বিষয়ে একমত হতে পারি, প্রতিবছরই প্রবাসীদের সংখ্যা ক্রমন্বয়ে বাড়ছে এবং সারা বিশ্বেই তারা নিজেদের উপস্থিতি ও অবদান রেখে চলেছেন।


ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান- ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা