পাঠ্যবইয়ে বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ
রাণী উখেংচিং মারমা
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫১ পিএম
পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত মারমা জনগোষ্ঠীর ‘মারমা ভাষা’ তিব্বত-বর্মী ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। মারমা ভাষার নিজস্ব ধ্বনিতাত্ত্বিক কাঠামো, উচ্চারণব্যবস্থা এবং লিখনরীতি রয়েছে। বাংলা ভাষার মতোই মারমা লিপিতে বিভিন্ন ধ্বনিচিহ্ন বা স্বরচিহ্ন রয়েছে, যা মূল অক্ষরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উচ্চারণগত, স্বর বা ধ্বনিগত পার্থক্য নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ সরকার Mother Tongue Bases Multilingual Education (MTB-MLE) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৭ সাল থেকে গারো, ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা ও সাদ্রি ভাষায় প্রাথমিক স্তরে বই প্রকাশ ও বিতরণ করেছে। তবে ২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যপুস্তকে চাকমা ও মারমা ভাষার বইসমূহে সংশ্লিষ্ট ভাষার লিপির পাশাপাশি বাংলা লিপির বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে এই দ্বৈত বর্ণমালার পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনে এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে, চরমভাবে বিঘ্ন ঘটাবে বলে মনে করি আমরা। প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে মারমা শিশুদের বইয়ে বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ (Transliteration) মারমা শিশুদের মধ্যে ভাষাগত আত্মপরিচয় সংকট তৈরি করবে।
প্রতিবর্ণীকরণ (Transliteration) হলো কোনো ভাষার শব্দকে অন্য ভাষার লিপিতে লেখার পদ্ধতি। ভিন্ন ভাষায় প্রতিবর্ণীকরণ বা লিপ্যন্তরে সমস্যা হয় মূলত বানান ও উচ্চারণের পার্থক্যের কারণে।
প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মজবুত ভিত্তিতে গড়ে তোলা। সেটার প্রথম ধাপ হলোÑ মাতৃভাষায় নিজস্ব অক্ষর ও লিপির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কিন্তু একই বইয়ে দুই ধরনের লিপি (নিজস্ব বর্ণমালা ও বাংলা ট্রান্সলিটারেশন/প্রতিবর্ণীকরণ) সংযোজন সদ্য শিক্ষাজীবনে পা দেওয়া শিশুদের মনোযোগ বিভ্রাট ঘটাবে এবং মাতৃভাষা শেখার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে। এর ফলে শিশুরা নিজস্ব লিপি যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব বর্ণমালা এবং নিজস্ব লিপির মর্যাদা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগবে এবং পরিণতিতে ভাষাগত আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হতে পারে, যা তাদের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
একজন মারমা শিশুকে প্রকৃত বাংলাদেশি মারমা নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তার নিজস্ব ভাষা শেখার এবং জানার সুব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষা শেখার সঠিক পদ্ধতি যথাযথভাবে প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়াটাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে আমরা মনে করি। ভাষাবিদসহ অনেক বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়েই যদি বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ যুক্ত করা হয়, সেটা শিশুদের ভাষাগত আত্মপরিচয়কে বিপন্ন করে তুলবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি অনেক কুফল তার শিক্ষাজীবন ও সামাজিকজীবনে প্রতিফলিত হবে।
দ্বিতীয়ত, ট্রান্সলিটারেশন করে আরও যেসব জরুরি শব্দ, বিশেষত নামের বানান (মানুষের নাম, Proper Noun/ প্রপার নাউন মূলত) সেগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয় না। নামের ভুল বানান তো এক ধরনের আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে। যেমন, ‘মাহ্লাচিং’ এর ‘হ্লা’ হয়ে যায় ‘লা’ / মালাচিং, কংহ্লাফ্রু, হয়ে যায় কংলাপ্রু।
মারমাদের নামগুলোতে উচ্চারণের পাশাপাশি অর্থ, স্বকীয়তা এবং নিজস্বতাও থাকে। তবে যদি সঠিক বানান বা উচ্চারণ জানা না থাকে, তা বিকৃতভাবে ধারণ করা হয়। এর উদাহরণ দেখা যায় মারমা শিশুর টিকা কার্ড বা জন্ম সনদেÑ মারমাদের নামের বিকৃতি যেটা জন্মের পরপরই শুরু হয়। যার কারণ অনেকটা কর্তৃপক্ষের অসতর্কতা এবং পরবর্তীতে অভিভাবকদের অনীহা/অসচেতনতা। অনেক মারমা কখনোই বাংলায় নিজের মাতৃভাষার সঠিক উচ্চারণ করতে শিখতে পারে না।
কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি খোলাসা করা যাক। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই আমরা তিনটি মারমা শব্দ শেখার চেষ্টা করি : ငါ /ঙ্গা (/ŋà/) =আমি, ငါ့ /ঙ্গা (/ŋàʔ/) = আমার, ငါး /ঙ্গা (/ŋâː/)= মাছ (নিঃশ্বাসযুক্ত ধ্বনি/নিঃশ্বাসমিশ্রিত স্বর)। মারমা শব্দগুলোর পাশে বাংলায় প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে যা লেখা হয়েছে (ঙ্গা), সেটা যদি একজন মারমা ভাষায় নিরক্ষর কিন্তু বাংলা ভাষায় অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে পড়তে দেওয়া হয় তাহলে সে বাংলায় শব্দগুলো একই স্বরে উচ্চারণ করবে এবং উচ্চারণবিভ্রান্তির মাধ্যমে মারমা ভাষা ভুলভাবে শিখবে। মারমা ভাষা শেখার অন্যতম প্রধান ধাপ হলো এই ‘টোন বা স্বরভেদ’ আয়ত্ত করা, যা মারমা ভাষায় অর্থ পরিবর্তনের একটি মূল বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ একই শব্দভিত্তিক ধ্বনি শুধু স্বরের ‘উঁচু-নিচু, ফোনেশন/ ধ্বনন প্রকার পরিবর্তনের মাধ্যমে’ একাধিক অর্থ ধারণ করতে পারে।
১. উচ্চস্বর/ High Tone এবং কাঁপনযুক্ত বা খসখসে স্বর/ Creaky Voice
က /কা (/ká)= মারমা ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম শব্দ, নাচ (কাউকে নাচতে বলা), ২. নিম্ন স্বর /Low Tone , ကာ /কা (/kà)= কোনোকিছুকে ঢেকে দিতে বলা ( লো টোন বা নিম্নস্বরযুক্ত শব্দ, ကျာ /ক্যা (/kjà/) = কাক
৩. পতনশীল টোন / নিম্নগামী স্বর/ Falling Tone এবং নিঃশ্বাসযুক্ত ধ্বনি / নিঃশ্বাসমিশ্রিত স্বর/ Breathy voice
ကျား / ক্যা (/kjâ̤ː/) = বাঘ (নিঃশ্বাসযুক্ত ধ্বনি / নিঃশ্বাসমিশ্রিত স্বর), মারমা এই শব্দগুলোর মধ্যে যে স্বরগত /ধ্বনিগত পার্থক্য রয়েছে সেটা সরাসরি বাংলায় প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব না।
“ধরুন, আপনার নাম ‘হ্রুই পেইং। মারমাদের নামের একটি সুন্দর অর্থ আছে, যার অর্থ ‘ফুলের রঙ স্বর্ণের মতো’ বা ‘স্বর্ণের তৈরি ফুল’। কিন্তু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসে যদি আপনাকে ‘রুইপাই’ বলে ডাকা হয়, যার কোনো অর্থ নেই, তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে?” । অন্যদিকে, একজন মারমা ভাষায় দক্ষ শিশু যদি নিজের নামের অর্থ বোঝে, সে স্কুলে নিজের নাম এবং ভাষা সঠিকভাবে উচ্চারণের মাধ্যমে পরিচয় দেয়, তখন এটি তার আত্মবিশ্বাসকে জোরদার করে। এর ফলে সে তার নাম নিয়ে আর হীনম্মন্যতায় ভোগে না এবং তার মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নেও বড় একটা ভূমিকা রাখে, তার শেখার পরিবেশও শক্তিশালী হয়, যা ক্লাসরুম পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।
তাই নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধÑ মারমা ছেলেমেয়েদের ছোটবেলা থেকেই নিজের ভাষা সঠিকভাবে চর্চার সুযোগ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
চাকমা ও মারমা ভাষার পাঠ্যপুস্তক তাদের নিজস্ব লিপিতেই প্রকাশ করা হোক। সংশ্লিষ্ট বইসমূহ প্রত্যাহার করা না হলে, তা কেবল শিক্ষক-সহায়িকা হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হোক। কোনোক্রমেই ছাত্রছাত্রীদের নিকট দুই লিপি সংবলিত পুস্তক বিতরণ করা না হোক।