× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গণভোট

পাল্টাপাল্টি অবস্থান কেন

মো. আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১১ এএম

পাল্টাপাল্টি অবস্থান কেন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘গণভোট’ বিষয়টি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত নেওয়ার এই পদ্ধতি অনেক দেশে স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশে এটি সব সময়ই বিতর্কিত রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি বিএনপি ও জামায়াতÑ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র দুই দলÑ এই গণভোট ইস্যুতে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি যেখানে গণভোটকে ‘জনগণের সিদ্ধান্ত জানানোর গণতান্ত্রিক পথ’ হিসেবে দেখছে, সেখানে জামায়াত একে ‘সরকারের কৌশলগত ফাঁদ’ বলে আখ্যায়িত করছে। এই অবস্থান শুধু দলীয় রাজনীতিতে বিভক্তি সৃষ্টি করছে না, বরং জাতীয় রাজনীতির অগ্রগতির ওপরও ছায়া ফেলছে। প্রশ্ন উঠেছেÑ গণভোট ইস্যুতে এই মতভেদ কি জাতীয় নির্বাচনের গতিপথেও প্রভাব ফেলবে? বিএনপির মতে, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস, তাই কোনো জাতীয় সংকট বা নির্বাচনী প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়াই উচিত। তারা দাবি করছে, একটি নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে গণভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা সম্ভব। 

বিএনপির এই অবস্থান মূলত তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছেÑ ‘গণভোট হলো জনগণের বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার একমাত্র শান্তিপূর্ণ পথ।’ তারা মনে করছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশ পেলে জাতীয় নির্বাচন আরও অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য হবে। অন্যদিকে জামায়াতের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা মনে করে, বর্তমান সরকারের অধীনে গণভোট আয়োজন মানে ‘আগে থেকেই সাজানো খেলা’। তাদের আশঙ্কা, গণভোটের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে সরকার নির্বাচনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। ফলে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে বিরোধী দলের আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়বে। জামায়াতের নেতারা বলছেন, ‘যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি, তাদের অধীনে গণভোটে জনগণের সত্যিকারের মতামত প্রতিফলিত হবে না।’ একই মঞ্চে একসময় আন্দোলনকারী দুটি দলের মধ্যে এই বিরোধ রাজনীতির মাঠে বিভক্তির নতুন রেখা টেনে দিয়েছে। বিএনপি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, আর জামায়াত বলছে, এই অংশগ্রহণের আড়ালে গণতন্ত্রের নামে নতুন এক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দাঁড় করানো হচ্ছে।

এই ভিন্নমত শুধু বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ককেই নয়, বরং বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতির ঐক্যকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কারণ, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধী দলগুলোর ঐক্য ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু গণভোট নিয়ে অবস্থানগত এই সংঘাত সেই সম্ভাবনাকে নড়বড়ে করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই মতভেদের কারণে যদি জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত হয় বা কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ক্ষতি কার? বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে রাজনীতিবিদদেরই।

গণভোট ইস্যুটি আসলে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি নয়, বরং এটি হতে পারে জনগণের সরাসরি মতপ্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। তবে শর্ত একটাইÑ প্রক্রিয়াটি হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সব দলের আস্থার উপযোগী। এই মুহূর্তে প্রয়োজন পারস্পরিক দোষারোপ নয়, বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা। যদি দলগুলো নিজেদের অবস্থান থেকে অল্প হলেও নমনীয়তা দেখায়, তাহলে গণভোট বা নির্বাচনÑ দুটিই দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। কারণ, ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছেÑ রাজনীতিতে জেদ ও বিভাজন কখনও স্থায়ী সমাধান দেয় না। ক্ষণিকের রাজনৈতিক লাভের আশায় নেওয়া প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতিবিদদেরই ক্ষতির কারণ হয়।

দেশের রাজনীতি আবারও এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে। সামনে জাতীয় নির্বাচন, কিন্তু নির্বাচন ঘিরে চলছে ভিন্নমাত্রার বিতর্কÑ নির্বাচনের দিনেই গণভোট, নাকি একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে একসময়ের মিত্র দুটি দলÑ বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দুই দলের এই ভিন্ন অবস্থান শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই অনিশ্চিত করে তুলছে। এই অবস্থানগত পার্থক্য এখন দুই দলের মধ্যকার ঐক্যের দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে। একদিকে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্ক, অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশলের হিসাবÑ ফলে বিরোধী জোটের ভেতরে চলছে অঘোষিত টানাপড়েন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিভক্তি নিছক মতের অমিল নয়; এর পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণের আশঙ্কা। অনেকেই মনে করেন, বিএনপি ও জামায়াতের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান সরকারের হাতে খেলছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলও এই ভিন্নমতের সুযোগ নিতে পারে। গণভোটের প্রশ্নে বিরোধীদের দ্বন্দ্ব দেখিয়ে তারা নিজেদের অবস্থানকে ‘জনগণের প্রতিনিধি’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। 

ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশে যখনই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য হারিয়েছে, তখনই সুযোগ নিয়েছে অগণতান্ত্রিক শক্তি। ১৯৭৫, ১৯৮২ কিংবা ২০০৭Ñ প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটের পেছনেই ছিল দলীয় বিভাজন ও অবিশ্বাস। আজও একই চিত্র ফুটে উঠছে, শুধু প্রেক্ষাপট বদলেছে। গণভোট হোক বা না হোক, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘিরে এই বিভক্তি যে দেশের গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়, তা বলাই বাহুল্য। রাজনীতির মূল শক্তি হলো জনগণ; সেই জনগণ এখন চায় একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বিএনপি ও জামায়াতÑ দুই দলেরই উচিত নিজেদের কৌশলগত ভিন্নতা দূরে রেখে গণতন্ত্র রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছানো। কারণ, রাজনৈতিক বিরোধ যদি এমন পর্যায়ে যায় যে নির্বাচনই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষতি হবে শুধু দলগুলোর নয়Ñ ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা। 

আজকের বাস্তবতা বলছেÑ গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে দ্বন্দ্ব কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার পরীক্ষা। বিরোধী দলগুলোর উচিত এখনই দায়িত্বশীলতা দেখানো। কারণ, সময় যতই পেরিয়ে যাচ্ছে, নির্বাচন ততই জটিল হচ্ছে। যদি এই অবস্থা অব্যাহত থাকে, তাহলে জনগণ আর রাজনীতির ওপর আস্থা রাখতে পারবে না। তাই এখনই সময়Ñ রাজনীতি নয়, রাষ্ট্রকে আগে ভাবার।


মো. আবদুল মান্নান

সাংবাদিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা