বিশ্লেষণ
সাঈদ বারী
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৯ এএম
সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়Ñ এটি কোনো কাব্যিক উপমা নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষার এক মৌলিক ভিত্তি। বিচার বিভাগ, আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি সংবাদপত্রের কাজ হলো ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের পক্ষে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এই চতুর্থ স্তম্ভের স্বাধীনতা সব সময়ই ছিল অনিশ্চিত, কখনও সরাসরি দমন-পীড়নের শিকার, কখনও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের জালে আবদ্ধ।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জন্ম থেকেই সংগ্রামের গল্প বহন করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্র ছিল বাঙালির মুক্তির অস্ত্র। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পর, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থার অধীনে সরকার দেশের মাত্র চারটি দৈনিকÑ বাংলাদেশ অবজারভার, দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ সরকারি মালিকানায় রেখে অন্যসব সংবাদপত্র বন্ধ ঘোষণা করে। হাজার হাজার সাংবাদিক, সম্পাদনা কর্মী ও ছাপাখানার শ্রমিক মুহূর্তে বেকার হয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, যা সাংবাদিক সমাজ আজও ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে।
এই ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ মানে শুধু সাংবাদিকদের কর্মহীনতা নয়, এটি ছিল নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এমন এক শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে সংবাদপত্র আর সত্য বলার জায়গা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বাহনে পরিণত হয়। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়Ñ যখন সংবাদপত্রের কলম রুদ্ধ হয়, তখন রাষ্ট্রের আত্মাও বন্দি হয়ে যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়েও সংবাদপত্রের মুক্তি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে গণমাধ্যমও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলেছে। সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উন্নয়ন-অর্জনের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়, সেন্সরশিপ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যা পরে সাইবার নিরাপত্তা আইন নামে সংশোধিত হয় তা কার্যত সাংবাদিকদের জন্য এক অদৃশ্য বেড়া তৈরি করেছে। সরকার বা দলের সমালোচনামূলক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের ডেকে নেওয়া, জিজ্ঞাসাবাদ, এমনকি মামলাÑ এসব তখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহু সাংবাদিক হামলার, হয়রানির ও কারাদণ্ডের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ আত্মগোপনে গেছেন, কেউ বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক সম্পাদক ও প্রতিবেদক প্রকাশ্যে না বললেও জানেন, কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করা মানেই বিপদ। কিছু খবর প্রকাশের আগেই যদি ফোন আসেÑ ‘এটা না দিলেই ভালো হয়।’ স্বাধীন সাংবাদিকতা তখন ধীরে ধীরে পরিণত হয় আত্মরক্ষার প্রয়াসে।
তবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই একমাত্র সংকট নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আজ কর্পোরেট ও রাজনৈতিক স্বার্থের মাঝেও বন্দি। বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর হাতে মিডিয়ার মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সম্পাদকীয় নীতি অনেক সময় নির্ধারিত হয় পুঁজির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে নয়। বিজ্ঞাপনই হয়ে ওঠে নীতির নিয়ামক, ‘সত্য’ নয়। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্রমে অর্থনৈতিক নির্ভরতার হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে।
গণতন্ত্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা হলো জনগণের মুখপাত্র হওয়া। কিন্তু যখন সরকার সংবাদ মাধ্যমকে প্রতিপক্ষ মনে করে, তখন সেই গণতন্ত্র দুর্বল হয়। সংবাদপত্রের সমালোচনা কোনো রাষ্ট্রকে ছোট করে না; বরং তা আত্মসংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। অথচ বাংলাদেশে সমালোচনা প্রায়শই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ আখ্যায় পরিণত হয়। এমন মনোভাব সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথকে আরও সংকীর্ণ করে।
তবু আশার জায়গা আছে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ সাংবাদিকরা নানা বাধার মধ্যেও সত্য প্রকাশে অটল রয়েছেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দুর্নীতি, নারী নিপীড়ন, পরিবেশ ধ্বংস ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়গুলো তারা তুলে ধরছেন। প্রযুক্তির প্রসার তথ্যপ্রবাহকে গণতান্ত্রিক করেছে, যদিও এর সঙ্গে এসেছে ভুয়া সংবাদ ও প্রচারণার ঝুঁকি। তাই এখন প্রয়োজন এক নতুন ভারসাম্যÑ যেখানে স্বাধীনতা থাকবে, থাকবে দায়িত্ববোধও।
কারণ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়; এটি এক নৈতিক দায়িত্বের প্রতিশ্রুতি। সত্যনিষ্ঠতা, পক্ষপাতহীনতা ও মানবিকতার চেতনা সাংবাদিকতার মূলভিত্তি। কিন্তু যখন রাষ্ট্র বা কর্পোরেট শক্তি সেই ভিত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন গণতন্ত্রের ছাদের নিচে শূন্যতা তৈরি হয়। আজ বাংলাদেশের সংবাদপত্র এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাইÑ আমরা কি অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারব?
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিক অধিকারের অংশ। একটি রাষ্ট্র সত্যকে যতটা স্থান দেয়, তার গণতন্ত্রও ততটাই দৃঢ় হয়। তাই সংবাদপত্রের কলম যেন আর কোনো ১৬ জুনের মতো অন্ধকার দিনে থেমে না যায়।
যে দিন সংবাদপত্র স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পূর্ণতায় পৌঁছবে। আর সেই দিনটি আসবে তখনই, যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও পাঠকÑ তিন পক্ষ একসঙ্গে ঘোষণা করবে : সত্যকে ভয় নয়, সম্মান দেওয়া আমাদের কর্তব্য।
সাঈদ বারী
প্রকাশক ও কলাম লেখক