প্রাকৃতিক বিপর্যয়
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৭ এএম
বাংলাদেশের মানুষের কাছে দুর্যোগ একটি পরিচিত শব্দ, যা তাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দেশটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়Ñ কখনও প্লাবন, কখনও ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত, আবার কখনও বিদ্যুৎ পতন বা ভূ-কম্পনের ঝুঁকি। এসব প্রাকৃতিক বিপদ মানুষের জীবনযাত্রা, জীবিকা নির্বাহ এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অবিরাম হুমকি সৃষ্টি করে। তবে দুর্যোগের পরিধি কেবল প্রকৃতিজনিত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতি এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশে একটি গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচিত। শরণার্থী বসতিগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষত প্লাবন এবং ভারী বৃষ্টিপাতের সময়। এই পরিস্থিতিতে মানবিক সেবা প্রদানকারী সংগঠনগুলো আশ্রয়, খাদ্যসামগ্রী এবং পানীয়জল সরবরাহের পাশাপাশি শিবিরগুলোর দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অবকাঠামো সংস্কার, জরুরি সতর্কীকরণ পদ্ধতি স্থাপন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে প্রাথমিক সাড়া প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেন শরণার্থীরা নিরাপদে থাকতে পারে এবং বিপদের প্রভাব সীমিত করা যায়। সুতরাং, বাংলাদেশে দুর্যোগ বলতে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনাবলি বোঝায় নাÑ এটি জনগণের জীবন, অর্থনৈতিক কার্যক্রম, সামাজিক ভারসাম্য এবং জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বাংলাদেশকে একটি দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিবছর অক্টোবর মাসে উদযাপিত আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস শুধু একটি স্মরণীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রচার করেÑ ঝুঁকি কমানো, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সকলকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং নদীকেন্দ্রিক পরিবেশ দেশটিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। বিশেষত তিস্তা, মেঘনা, পদ্মা এবং ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চলগুলো প্লাবনের প্রধান কেন্দ্রস্থল। বন্যার সময় শুধু জলাবদ্ধতা নয়, বরং মানবিক এবং আর্থ-সামাজিক সংকটও দেখা দেয়। মানুষের বাসস্থান এবং জীবনধারা ব্যাহত হয়, কৃষিজ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে।
২০২৫ সালের মে-জুন মাসে প্রবল বর্ষণ এবং ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে পানিপ্রবাহের কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা এবং নোয়াখালীতে ব্যাপক প্লাবন হয়। এতে জনজীবন এবং জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে সাইক্লোন এবং ঘূর্ণিঝড় নিয়মিতভাবে জীবন ও সম্পদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে ১৯৯১ সালের ভয়াবহ সাইক্লোন দেশের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে স্মরণীয়। এই সাইক্লোনে প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার মানুষ মারা যায় এবং লখ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বজ্রপাত প্রতিদিনের জীবনে মানুষের জন্য অপ্রত্যাশিত বিপদ ডেকে আনে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে মানুষের জীবন আবহাওয়া এবং ঋতুচক্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত, সেখানে বিদ্যুৎ পতনের ঝুঁকি অনেক বেশি। অপরদিকে, ভূমিকম্প বাংলাদেশে বর্তমানে কম পরিচিত একটি দুর্যোগ হলেও হঠাৎ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। পার্বত্য অঞ্চল এবং দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশের ভূমিকম্প-সংবেদনশীল ভবন এবং পুরাতন কাঠামোর জন্য এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। দুর্যোগের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি কমানোর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পদক্ষেপ এখনও পর্যাপ্ত নয়।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মানবিক দুর্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যা ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো প্রাকৃতিক বিপদের প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবল বৃষ্টিপাত, প্লাবন এবং পাহাড়ি ভূমিতে ভূমিধসের ঘটনা এই শিবিরগুলোর জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিদ্যমান। এ ধরনের ঘটনায় ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে। তাই স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল আশ্রয়, খাদ্য এবং পানীয়জলের ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; তারা শিবিরগুলোর দুর্যোগ সামলানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্যও কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এই কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, আগাম সতর্কতা কার্যকর করা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে প্রাথমিক সাড়া প্রদান এবং স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এর ফলে শরণার্থীরা জরুরি পরিস্থিতিতে স্বাবলম্বীভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হয় এবং বিপদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মানবিক সংকটও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতোই পরিকল্পিত, সমন্বিত এবং সচেতন প্রস্তুতির দাবি রাখে।
বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দেশের দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ এবং অন্যান্য নীতিমালা ও আইন দেশের দুর্যোগ প্রতিরোধ কৌশলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিবিডিএমসি) গঠনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। বন্যার পূর্বে সতর্কবার্তা প্রদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণা, স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং উদ্ধার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুর্যোগ পূর্বাভাস এবং জরুরি বার্তা দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস উল্লম্ব একীকরণের মাধ্যমে কার্যকর হচ্ছে, যা স্থানীয়, জেলা, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের প্রতিফলন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় যে সেরা পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়, সেগুলো বাংলাদেশেও কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশেষত, জাপানের বোসাই সংস্কৃতির মতো উদ্ভাবনী এবং কার্যকর পদ্ধতি আমাদের দেশে গ্রহণ করলে দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি হ্রাসে নতুন মাত্রা যুক্ত করা সম্ভব। প্রথমত, প্রতিরোধ এবং প্রস্তুতির সাংস্কৃতিকীকরণ অপরিহার্য। বাংলাদেশে প্রতিটি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অনুশীলন বাধ্যতামূলক করা হলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে পরিচিত হবে। এতে তারা বিপদের সময় কীভাবে নিরাপদে সাড়া দিতে হবে তা শিখবে এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি তৈরি এবং তাদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা গেলে জরুরি মুহূর্তে স্থানীয় জনগণ দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হবে। স্থানীয় সদস্যরা প্রাথমিক উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, যা জীবন এবং সম্পদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য। বাঁধ, সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা প্রতিরোধক অবকাঠামো এবং ভূমিকম্প-প্রতিরোধক ভবনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে বিপদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। শুধু কাঠামোগত উন্নয়ন নয়, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং পূর্বাভাস প্রযুক্তি ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ, যা বিপর্যয়ের আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ প্রদান করবে।
চতুর্থত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে কার্যকারিতা বৃদ্ধি সম্ভব। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা দায়িত্ব বণ্টন সুসংহত করে এবং সময়মতো সাহায্য পৌঁছানো নিশ্চিত করে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও এটি সহায়ক। পরিশেষে, তথ্য প্রচার এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দুর্যোগ পূর্বাভাস, সতর্কবার্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনগণের কাছে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পৌঁছালে মানুষ ঝুঁকি বুঝে নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে। তথ্যপ্রাপ্তি যত দ্রুত এবং সঠিক হবে, বিপদের সময় ক্ষতিও তত কম হবে।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বন্যা, বজ্রপাত, ভূমিকম্প এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের মতো মানবিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বমানের উদাহরণ যেমন জাপানের বোসাই সংস্কৃতি অনুসরণ করে বাংলাদেশে দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি হ্রাসের মান বৃদ্ধি করা সম্ভব। দেশের প্রাকৃতিক ঝুঁকি এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক সেরা পদ্ধতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে, জনগণের জীবন এবং সম্পদ রক্ষা নিশ্চিত করবে এবং দেশের প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং সচেতনতার সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি। আমাদের উচিত শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা নয়, বরং দুর্যোগ সচেতনতা এবং প্রস্তুতিকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা, যাতে প্রতিটি মানুষ ঝুঁকি বুঝতে পারে, নিরাপদ থাকতে পারে এবং বিপদের প্রভাব কমাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
ড. আলা উদ্দিন
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়