বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৪ এএম
আধুনিক উন্নয়নের মৌলিক চিহ্নরূপে বিবেচনা করা হয় বিদ্যুৎ খাতকে। বিদ্যুৎ কেবল অন্ধকারের আলোই নয়, আমাদের উন্নত জীবনমানের মূলচালিকা শক্তি।দেশের উন্নয়নযাত্রা বিদ্যুৎ ছাড়া অসম্ভব। কেননা শিল্প, কৃষি, যোগাযোগ, যানচলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যÑ সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটিতে বিগত সরকারের সময়ে যে ধরনের দুর্নীতি হয়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি নয়, জাতীয় উন্নয়নকেও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয়, ঘুষ-দুর্নীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকির অপচয়Ñ সব মিলিয়ে খাতটি বর্তমানে নানাভাবে আস্থার সংকটে পড়েছে। দেখা গেছে, এসব প্রকল্পের যেসব চুক্তি সম্পাদন হয়েছে তাতে ব্যবসায়ীদের কোনো ঝুঁকি নেই, সব ঝুঁকি সরকারের। এটি কেবল সরকারের অদক্ষতাজনিত ব্যর্থতা নয়, এখানে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি জড়িত। সম্প্রতি সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির এক সংবাদ সন্মেলনে এসব তথ্য জানা গেছে।
পর্যালোচনা কমিটির তথ্য বলেছে, গত সরকারের দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে চারগুণ, খরচ বেড়েছে ১১ গুণ। এই বাড়তি উৎপাদনের বেশির ভাগই অস্থায়ী এবং ভাড়াটে প্ল্যান্টকেন্দ্রিক।মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনটি করাই হয়েছে দুর্নীতির উদ্দেশ্য নিয়ে। এখানে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো ভাড়া আদায়ের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানি করেছে নিজেরা। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপের নমুনা পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ছিলেন সাবেক দুই বিদ্যুৎ সচিব। পরে যারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবও হয়েছিলেন। তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও উঠে এসেছে এই সংঘবদ্ধ দুর্নীতিতে। এমনকি ভারতের আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তিতে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিগত সরকারের সময় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একতরফাভাবে একের পর এক চুক্তি করা হয়েছিল। প্রশ্ন করার অধিকার খর্ব করে এসব চুক্তিকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। চুক্তিতে সব সুবিধা দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে, সেখানে রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করা হয়নি। দেখা গেছে, প্রকল্পের অর্থের বেশিরভাগই চলে যেত কমিশন, বিদেশ সফর, অনিয়মিত ক্রয় ও পরামর্শ ফি বাবদ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে অপচয় হলে সাধারণ মানুষই শেষপর্যন্ত এর বোঝা বইতে বাধ্য হয়। যেমন বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে, কর বাড়িয়ে বা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে। তবে সরকার চাইলে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করতে পারে বলে কমিটির অভিমত।
বলে রাখা ভালো, বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনটি বাতিল করা হয় গত বছরের নভেম্বর মাসে। তার আগে এ আইনের অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত সরকারের করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি গঠন করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এখন এসব চুক্তি বাতিল করতে হলে অনুসন্ধান করে দুর্নীতির প্রমাণ খুঁজে বের করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা। উল্লেখ্য, বিশেষ বিধান আইনটি করা হয় ২০১০ সালে। এরপর দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। বলা হয়, এই আইনের অধীনে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। এ কারণে এটি দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত। ফলে এ আইনের অধীনে দরপত্র ছাড়াই একটার পর একটা চুক্তি করেছিল গত সরকার।
এ কথা সত্য যে, বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পগুলোতে টেন্ডারে কারসাজি, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া এবং কমিশন বাণিজ্য ছিল ওপেন সিক্রেট। অনেক সময় প্রকল্প শেষ না হতেই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার কেন্দ্র নির্মাণের পরেও প্রত্যাশিত পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারার ব্যর্থতাও দেখা গেছে। ফলে রাষ্ট্রকে গুনতে হয় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সে সময় ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হতো। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, কমিশন ভাগাভাগি ও নীতিনির্ধারকদের যোগসাজশই মুখ্য ভূমিকা রাখত। আমরা মনে করি, এসব অপরাধের উপযুক্ত সাজা হওয়া দরকার।
আসলে বিদ্যুৎ খাতে চলমান সংঘবদ্ধ দুর্নীতি রাষ্ট্রের জন্য এক বড় হুমকি। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও ফল মিলছে না প্রত্যাশিত। সাধারণ মানুষ নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও পাচ্ছেন না নিরবচ্ছিন্ন সেবা। এই অবস্থায় সরকারের এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি টেন্ডার প্রক্রিয়া অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে সিন্ডিকেটভিত্তিক কারসাজি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী যেই হোক, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে প্রমাণিত অকার্যকর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় রোধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ ও বিলিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল নজরদারি চালু করা উচিত। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশকে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে হবে। আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি এক ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি। রাষ্ট্র যদি এখনই সৎ ও সাহসী পদক্ষেপ না নেয়, তবে বিদ্যুৎ নিয়ে দেশ আরও গভীর সংকটে পড়বে। এখনই সময় সংঘবদ্ধ দুর্নীতির এই শিকড় উপড়ে ফেলার।