প্রেক্ষাপট
ওসমান গনি
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২২ এএম
প্রযুক্তির বৈপ্লবিক উন্নয়নের ফলে বিশ্ব এক নতুন দিগন্তে উপনীত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবনযাত্রায় এনেছে আমূল পরিবর্তন, সংযোগ স্থাপন করেছে, দূরকে করেছে কাছে। তবে এই আশীর্বাদপুষ্ট প্রযুক্তিই যখন দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের হাতে পড়ে অপব্যবহৃত হয়, তখন তা সমাজের জন্য ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হয়।
বর্তমান বাংলাদেশে দেশের মানুষের অস্থিরতা ও উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্বারা সৃষ্ট লাগামহীন গুজব বা ভুয়া তথ্যের স্রোত। একটি ভিত্তিহীন বা বিকৃত তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে, যা সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার আগেই সমাজে গভীর সংকট, অবিশ্বাস এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ সহিংসতা সৃষ্টি করছে। এই ডিজিটাল যুগের ‘কানকথা’ বা গুজব আজ কেবল সাধারণ আলোচনার বিষয় নয়, এটি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি মারাত্মক ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অভূতপূর্ব গতি। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, টিকটক বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্লাটফর্মগুলোতে একটি পোস্ট বা বার্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে ছড়িয়ে যেতে পারে। এই দ্রুত গতির কারণেই গুজবের ডালপালা ছড়াতে কোনো সময় লাগে না। প্রচলিত গণমাধ্যম যেমন সংবাদপত্র বা টেলিভিশন খবর প্রকাশের আগে যে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ধরনের কোনো ‘ফিল্টারিং’ ব্যবস্থা নেই। ফলে, স্বার্থান্বেষী মহল অতি সহজে তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার এখানে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়। এই মহলগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা অথবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক ফায়দা লোটা। তারা মানুষের আবেগ, বিশেষত ভয়, ক্ষোভ, কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে চটকদার ও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম, মনগড়া ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে এমনভাবে তথ্য পরিবেশন করে যে, সাধারণ মানুষ সহজেই তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুঃখ বা খুশির উপলক্ষ তৈরি করা গুজবের চেয়ে ক্ষোভ বা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করা গুজব বেশি দ্রুত ও বেশি পরিমাণে শেয়ার করা হয়। কারণ মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগের বশে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে বেশি আগ্রহী হয়।
গুজবের ভয়াবহ পরিণতি দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে অসংখ্যবার। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঘটে যখন গুজব সরাসরি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। যেমন, ছেলেধরা বা গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিত্তিহীন তথ্যের সরাসরি ফল। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগার মতো অবিশ্বাস্য গুজব যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল, তখন নিরপরাধ বহু মানুষকে গণপিটুনির শিকার হতে হয়, এমনকি প্রাণহানিও ঘটে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত শুধু গণপিটুনিতে নিহত হন ৪৩ জন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, গুজব মানুষকে কতটা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তুলতে পারে এবং সমাজের আইন-শৃঙ্খলার ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ মুহূর্তের উত্তেজনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ক্ষেত্রেও গুজব মারাত্মক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অতীতে রামু, নাসিরনগর বা সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ইস্যুতে যে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তার মূল কারণ ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য। একটি ধর্মীয় প্রতীক বা ব্যক্তি সম্পর্কে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অথবা পুরনো ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে এমনভাবে অপপ্রচার চালানো হয় যে, তা মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ও বিভেদ সৃষ্টি করে। এই বিভাজন সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে এবং বহু বছরের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্যকে ধ্বংস করে দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির জন্যও গুজবকে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত সুকৌশলে। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন সামগ্রিক সচেতনতা, সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ।
গুজব সৃষ্টিকারী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইনের কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে অপরাধীরা ভয় পাবে। পাশাপাশি, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে দ্রুততার সঙ্গে সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে গুজব ডালপালা ছড়ানোর সুযোগ না পায়। আমরা মনে করি, সঠিক তথ্যের স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে গুজবের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
ওসমান গনি
সাংবাদিক