× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আর্থিক নিরাপত্তা

প্রবীণদের কথা আমরা যেন না ভুলি

মাহজাবিন আলমগীর

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৫ এএম

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৫ এএম

প্রবীণদের কথা আমরা যেন না ভুলি

দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এখন প্রবীণ জনগোষ্ঠী। দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির সুবাদে দেশে মৃত্যুহার কমে আসায় প্রবীণদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা অনুযায়ী ৬০ বছরের অধিক বয়সের ব্যক্তিরা প্রবীণ বলে অভিহিত হবেন। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, ২০২২ সালে এদেশে প্রবীণদের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার; যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশে উন্নীত হবে। 

প্রাকৃতিক নিয়মে বয়স বাড়তে বাড়তে মানুষ এক দিন প্রবীণ বয়সে পদার্পণ করে। এদেশের প্রবীণরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, একাকিত্ব, হতাশা আর পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলার শিকার হচ্ছেন জীবনের নানা ক্ষেত্রে। বিশ্বায়নের প্রভাব এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে আমাদের এখানে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একক পরিবারে আত্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাবে প্রবীণরা যথেষ্ট অবহেলার শিকার হচ্ছেন। আবার আমাদের দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। শহরের তুলনায় সেখানে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই বললেই চলে। সংগত কারণে গ্রামাঞ্চলে প্রবীণরা স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে সর্বাধিক দুর্দশার শিকার। 

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা যায়। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত রোগ-শোকে এবং নানাবিধ শারীরিক সমস্যা ও ভারসাম্যহীনতার কারণে স্মৃতিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হ্রাস ইত্যাদি শারীরিক সমস্যায় তারা ভুগে থাকেন। প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় তারা একাকিত্ব আর অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আমাদের সমাজে প্রচলন ছিল প্রবীণ সদস্যরা নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলো পরিবারের অন্য সদস্যরা যত্ন-আত্তির সঙ্গে বহন করতেন। 

কিন্তু বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাধীনে আত্মকেন্দ্রিকতা অতিমাত্রার সক্রিয় হওয়ার ফলে পরিবারের প্রবীণ সদস্যটিকে আজ আর কেউ সময় দিতে চান না। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। প্রবীণরা তাদের মনের কথা বলার মতো কাউকে খুঁজে পর্যন্ত পান না। তাদের দিন কাটে নিঃসঙ্গ একাকিত্বে আর হতাশায়। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা আর অভিবাসনের ফলে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নতুন প্রজন্মের একটা বড় অংশই বিদেশে পাড়ি দিয়ে স্থায়ী হচ্ছেন। দেশে বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখার মতো কেউ থাকছে না। আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো একসময় অনেক দৃঢ় ছিল; বিদ্যমান ব্যবস্থাধীনে বন্ধনগুলো ক্রমাগত শিথিল হতে শুরু করেছে। আগের দিনে যেকোনো পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়ির প্রবীণদের মতামতকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দেওয়া হতো। কেবল তাই নয়, তখন পরিবারে প্রবীণদের মর্যাদা আর সম্মানও ছিল সর্বাধিক। অথচ এখন পরিবারগুলোতে তারা যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার বিপরীতে উপেক্ষিত হচ্ছেন।

শহরে বসবাসরত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের আশ্রয় জুটছে বৃদ্ধাশ্রমে, পরিবারের বাড়তি বোঝা হিসেবে। কিন্তু এমন পরিবারও আছে যেখানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই চাকরিজীবী। পরিবারের খুদে সদস্যদের দেখাশোনা সেখানে দাদা-দাদিরা করে থাকেন। পরিবারে প্রবীণ সদস্যদের ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে দেখা যায় প্রবীণরা নাতি-নাতনী প্রতিপালনে পরিবার যুক্ত থাকার সুযোগ লাভ করে। নয়তো তাদের ভাগ্যে ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত আশ্রয়।

আমাদের দেশে উন্নত দেশের মতো স্বাস্থ্যসেবা আর পারিবারিক নিরাপত্তা কার্যক্রম মোটেও নেই। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে; যার প্রভাব পড়তে শুরু করবে শ্রমবাজারে। কেননা আমাদের দেশে ধরেই নেওয়া হয় যে, প্রবীণ জনগোষ্ঠী মানেই অনুৎপাদনশীল বোঝা। আমাদের দেশে প্রবীণদের জন্য যে বয়স্ক-ভাতা কার্যক্রম চালু আছে, তাতে ৩১ লাখ প্রবীণকে মাসে মাত্র ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই হাস্যকর। 

২০১৩ সাল থেকে ৬০ বছরের অধিক বয়স্কদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করা হয়েছে এবং বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখাশোনার দায়ভার সন্তানের ওপর বর্তাবে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার প্রয়োগ খুব স্বল্প ক্ষেত্রেই দেখছি। প্রায়শই খবর পাওয়া যায়, বৃদ্ধ বাবা-মাকে রাস্তায় ফেলে গেছে সন্তান কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি দখল করার জন্য বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত পর্যন্ত করা হয়ে থাকে। এ খবরগুলোর পরিমাণ নেহায়েত কম নয়।

আমাদের দেশে সরকারি চাকরির থেকে বেসরকারি পর্যায়ে যারা চাকরি করেছেন, সেইসব প্রবীণ জনগোষ্ঠী আরও বেশি অবহেলিত। কারণ সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি খাতে পেনশনের ব্যবস্থা নেই। অবসরকালীন জীবনটা তাদের সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তায় ভরা। সে সন্তানদের তারা কোলে-পিঠে করে প্রতি পালন করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে অনেকে সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে ওঠেন। সমাজে বাড়তে থাকা বৃদ্ধাশ্রমগুলো আমাদের সেই গল্পই বলে দেয়। 

প্রবীণদের স্বার্থরক্ষায় দেশে তেমন কোনো ভালো সংগঠনও নেই। ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ’ নামে যে একটি সংগঠন আছে তাও নানা দুর্নীতি আর অনিয়মে ডুবতে বসেছে। 

সমাজের প্রবীণদের নিয়ে চিন্তাভাবনার ধরন পাল্টালে বদলে যেতে পারে গোটা পরিস্থিতি। কেননা প্রবীণদের নানান মানসিক সমস্যাগুলো অনেকটা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে ঘটে থাকে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথ গুরুত্ব ও মূল্যায়ন করতে হবে। প্রবীণদের প্রতি সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ আর তাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার প্রবণতা বদলে দিতে পারে বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি, নৈকট্য আনতে পারে পরিজনদের সঙ্গে। তাদের অবসরকালীন জীবনটা যেন একাকিত্ব আর বিষণ্নতায় ভরে না ওঠে, এজন্য তাদের অবসরকে আনন্দময় করে তোলা চাই। কেননা অবসর মানে তো জীবন থেকে অবসর নয়।

আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, যারা প্রবীণ তাদের অবদান ও অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। স্বল্প পরিশ্রমের মেধা ও বুদ্ধিভিত্তিক কাজে তাদের নিয়োগ করা যেতে পারে যেমনÑ কোনো সংগঠনের পরামর্শদাতা। আবার বাড়ির ছোট সদস্যরা যদি দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে কিছুটা সঙ্গ দেয়, তাহলে বয়স্কদের প্রতি যেমন তাদের শ্রদ্ধাবোধ শৈশবকাল থেকেই জন্মাবে, তেমনি প্রবীণরাও একাকিত্বের কবল থেকে সামাজিক মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারবেন। 

মনে রাখা দরকার প্রবীণদের প্রতি আমাদের অনেক দায় রয়েছে। আমাদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের অবদান অপরিসীম। জীবন সায়াহ্নে পৌঁছানোর অর্থ মোটেই জীবনের শেষ নয়। বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকেই উপভোগ্য করে তোলা যায়, যদি প্রয়োজনীয় রশদ দেওয়া যায়। সমাজে প্রবীণদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় আমাদের যথাযথ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রবীণ সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রবীণ পরিচর্যা বা কেয়ার গিভার সিস্টেম জোরদার করা প্রয়োজন। প্রবীণ চিকিৎসাসেবা হিসেবে প্যালিয়াটিভ কেয়ার ব্যবস্থা ও জেরিয়াট্রিক মেডিসিন চালু করা দরকার। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখনও শিশুটি গুটি গুটি পায়ে পথ চলতে তার বাবা-মা-ই শেখায় এবং সেই বাবা মা-ই এক দিন বয়সের ভারে প্রবীণ হয়ে পড়ে। সুতরাং আমাদের ভিত্তি যারা গড়ে দেন তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় কোনো কমতি থাকলে চলবে না। বরং প্রবীণদের যথাযথ দেখভাল ও সেবা করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মধ্য দিয়েই একটি প্রবীণবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।


মাহজাবিন আলমগীর

শিক্ষিকা ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা