× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

বিভাগ ও জেলার দাবিতে নৈরাজ্য নয়

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:২৮ এএম

বিভাগ ও জেলার দাবিতে নৈরাজ্য নয়

অনেকদিন বিরতির পর সম্প্রতি আবার ফিরে এসেছে জেলা ঘোষণার দাবি। এটা এক অদ্ভুত বায়বীয় আন্দোলনের নাম। কারা আন্দোলনে যোগ দেয়, কেন দেয় তারা নিজেরাও পরিষ্কার করে জানে না। এ ধরনের আন্দোলনের মূল টার্গেট হয় রাস্তাঘাট, সড়কপথ, রেলপথ, নৌপথ ইত্যাদি। অবরোধ করা হয় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বা যাতায়াতের পথকে। আকস্মিক রুদ্ধ করে দেওয়া হয় জনজীবনের গতিকে। যাত্রাপথে দূরবর্তীগামী যাত্রী ও পথচারীর জীবনকে সাময়িক বিপন্ন করে তোলা হয়। রোগী, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, জরুরি বিদ্যুৎ, ওষুধ সরবরাহ ইত্যাদিকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। এটাও একপ্রকার ‘মব ভায়োলেন্স’। কারা করছে, কারা এর পেছনে আছে তা সব সময় আড়ালে থেকে যায়। এ-জাতীয় আন্দোলনে জনতা অরাজনৈতিকভাবে শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা রাজনীতির মুখাপেক্ষী হয়ে যায়।

জেলার দাবিতে স্থানীয় লোকজনের আন্দোলন বিক্ষোভ আশির দশকের গোড়া থেকে দৃশ্যমান হয়ে সামনে আসে। বিশেষ করে, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে তিনিই দেশে ৬৪ জেলা গঠন করেন। 

সে সময় বেশ ক’টি উপজেলা সরাসরি জেলায় পরিবর্তন হয়ে যায়। আবার কয়েকটি সাব ডিভিশন জেলা না হয়ে উপজেলাই থেকে যায়। তখনই স্থানীয় জনগণ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে রাস্তায় নামে। মূলত, সে সময় দেশের ১৯টি বৃহত্তর জেলার অধীন মহকুমাগুলোকে প্রথমে উপজেলা পরে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৭৮ সালে জামালপুরকে জেলায় রূপান্তর করা হয়েছিল। যা স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জেলা। বলাবাহুল্য, ১৯৮৪ সালে তখন বৃহত্তর চট্টগ্রামের রামগড় এবং পটিয়া সাবডিভিশন থাকা সত্ত্বেও জেলা হয়নি। আবার বৃহত্তর ময়মনসিংহের শেরপুর উপজেলা থেকে সরাসরি জেলা হয়েছিল।

সম্প্রতি লক্ষ করা যায়, কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার কতিপয় জনগণের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। আর তা হলো, প্রথমে কয়েকদিন ব্যানার নিয়ে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, দাবি ‘আমরা ঢাকা বিভাগে আছি ঢাকায় থাকব’। ময়মনসিংহ বিভাগের সঙ্গে কোনোক্রমেই যাবে না। তারা প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত। কী আশ্চর্য বিষয় হলো, সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না তা কেউ খতিয়ে দেখছে না। কিন্তু মানুষগুলো রাস্তা বন্ধ করে, টায়ার পুড়িয়ে উল্লাস করে চলেছে। আবার একই খবর পেয়ে টাঙ্গাইলের কিছু কর্মহীন মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলছে, তাদের ময়মনসিংহ বিভাগে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং তারা নিজেরাই একটা বিভাগ চায়। এতে গাজীপুর, মানিকগঞ্জ থাকবে ইত্যাদি। তাদেরকে নতুন বিভাগ করে দিতে হবে। বিভাগের পেছনে কী যৌক্তিকতা আছে তা কারও চিন্তায় নেই।

এরই মধ্যে ভৈরব বাজারকে জেলা করার দাবিটা সামনে চলে আসে। তারা নানা দলের ও মতের লোকজন একত্রিত হয়ে এক মহতী কাজে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। প্রথমে সড়কপথ পরে রেলস্টেশনে হামলা, যাত্রীবাহী ট্রেনে ইটপাটকেল ছুড়ে শতাধিক যাত্রীকে আহত করে। যেন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী আর সিলেটগামী ট্রেনযাত্রীরা ভৈরবকে জেলা হতে দিচ্ছে না। তাদের এমন বর্বরতা ও অপকর্মের নিন্দা জানিয়ে নানা সংগঠন থেকে এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হচ্ছে। রেলওয়ে পুলিশও এর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে হামলার ফিরিস্তি তুলে ধরে সিদ্ধান্ত চেয়েছে। তাদের এমন অমানবিক, অবিমৃষ্যকারিতা ও হঠকারিতার জন্য কাকে দায়ী করা হবে? এখানে নেতৃত্ব দানকারী কে বা কারা? তাদের কী লাভ বা লোকসান তারা নিজেরা জানে কী? এদিকে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলছে, ভৈরবকে জেলার দাবিতে আন্দোলনকারীরা নতুন করে আবারও সর্বাত্মক ব্লকেড কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। 

প্রসঙ্গত বলা যায়, ভৈরববাসীদের একজন বিখ্যাত রাজনীতিক ও ভাষা সংগ্রামী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর ক্ষমতায়ও ছিলেন। তিনি বারবার চেষ্টা করে গেছেন ব্রিটিশ ভারতের একটি ছোট্ট বন্দরনগরী হিসেবে ভৈরব বাজারকে জেলা ঘোষণা করার জন্য। শেষের দিকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রক্ত দিয়ে হলেও ভৈরবকে জেলা ঘোষণা করে যাব’। দুর্ভাগ্য যে, তিনি সফল হতে পারেননি। এবং এই আফসোস ও ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে তিনি পৃথিবী ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন।

আবার অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের আরেকটা ঐতিহ্যবাহী উপজেলা বাজিতপুর থেকে দাবি উঠছে দেশে যদি আর একটা জেলা হয় তা হতে হবে বাজিতপুর। এ জনপদের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য তুলে ধরে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে বা আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা ব্রিটিশ আমলের দৃশ্যপটে বাজিতপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে দেখাচ্ছে। তারা বলছে, কেবল কিশোরগঞ্জ নয়, ময়মনসিংহেরও আগে বাজিতপুরে পৌরসভা, কোর্ট-কাচারি হওয়ার তথ্য আছে। কাজেই এসব কারণে এবং তাদের উপস্থাপিত যৌক্তিকতায় ভৈরব নয় বরং বাজিতপুরকেই তারা জেলা চায়। এসব দেখে কিশোরগঞ্জের কিছু মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বলছে, ভৈরব বা বাজিতপুরকে জেলা করা হলে কিশোরগঞ্জকে বিভাগ ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় তারাও আন্দোলনে যাবে।

বর্তমান সরকারের উচিত হবে একটা সুস্পষ্ট প্রজ্ঞাপন দিয়ে এসব উচ্ছৃঙ্খল দাবি আদায়কারীদের সৃষ্ট নৈরাজ্য বন্ধ করা। নতুন উপজেলা, জেলা, বিভাগ ইত্যাদি করার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের নয়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতির হিসাবনিকাশ থাকায় এর দায় পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে জনজীবনের দুর্ভোগ লাঘবপূর্বক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা জরুরি। সাধারণ মানুষ তা-ই চাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া কোনো সরকারই এমন প্যান্ডোরার বাক্সের মুখ খুলে দিয়ে অহেতুক সমস্যাকে আমন্ত্রণ করতে পারে না। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এসব দাবির আন্দোলন অন্যান্য জেলা ও বিভাগে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলাফল যা-ই হোক, রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষদের অপ্রত্যাশিত ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।


হোসেন আবদুল মান্নান 

গল্পকার ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা