সরকারি হাসপাতাল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:২২ এএম
রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। ফলে সেখানে রোগী, চিকিৎসক, নার্স ও স্বজনদের ভিড়ে প্রতিনিয়ত প্রাণবন্ত এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। ঢাকার বেশিরভাগ হাসপাতালই আগুন লাগার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একাধিকবার হাসপাতালগুলোকে নোটিস দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তা সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না। বহু বড় হাসপাতালেই দীর্ঘসময় কোনো অগ্নি-মহড়া নেই, নেই পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও। ভবনগুলোর প্রায় সর্বত্র জটলার মতো তার, নষ্ট ইলেকট্রিক বোর্ড ও এলোমেলো অক্সিজেন সিলিন্ডারÑ সব মিলিয়ে এক ভয়ানক বিপদের আশঙ্কা বিরাজ করছে। অথচ নিয়মিত মহড়া দেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আনা যেত। ১ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ঝুঁকিতে সরকারি হাসপাতালগুলো’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেবল রাজধানীতেই আগুন লাগার ঝুঁকিতে রয়েছে চারশর বেশি হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্থাপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার নোটিস করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি ধর্তব্যে নিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ। দেখা গেছে, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি হাসপাতাল, শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপণের যন্ত্র রয়েছে। কিন্তু তা কার্যকর বা সচল নয়। অভিযোগ রয়েছে, গত এক বছরে বেশিরভাগ হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপণের কোনো মহড়া অনুষ্ঠিত হয়নি। এমন চিত্র ঢাকার প্রায় সকল সরকারি হাসপাতালের।
জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২১ সালে ও ২০২৩ সালে পর পর দু’বার আগুন লাগে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শিশু হাসপাতালের কার্ডিয়াক আইসিইউতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। হাসপাতালের ১২ তলা ভবনের ৫ তলার আইসিইউ কেবিনের বাইরে বৈদ্যুতিক কেবল থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কেবল রাজধানীতেই নয়, চলতি বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়ে সেন্ট্রাল সিটি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ভবনের নিচতলার স্টোররুমে আগুন লাগে। একই বছরের জুন মাসে এই হাসপাতালেরই আরেকটি স্টোর রুমে আগুন লেগেছিল। এতে সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
হাসপাতালগুলোতে দুর্বল ও স্বল্প মহড়ার প্রসঙ্গ ছাড়াও বেশিরভাগ ভবনে ফায়ার অ্যালার্ম কাজ করে না, জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ বা দখলকৃত আর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র মেয়াদোত্তীর্ণ। এমনকি অনেক হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের কর্মীরাই জানেন না কীভাবে আগুন লাগলে তা নেভাতে হয়। এভাবে প্রশিক্ষণের অভাব, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সামান্য অগ্নিকাণ্ডও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ এই হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডার, দাহ্য রাসায়নিক ও প্লাস্টিক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়, যা আগুন লাগলে মুহূর্তেই বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। অগ্নিনিরাপত্তায় সামান্য অবহেলাও হতে পারে শতাধিক প্রাণহানির কারণ। অগ্নিনিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও নিয়মিত মহড়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে এই বিধান অনেকটা কাগজেই সীমাবদ্ধ। বরং দেখা যায়, নতুন ভবন নির্মাণে টেন্ডার ও বাজেট বরাদ্দ হয় ঠিকই, কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া হয় না। ফলে কোটি কোটি টাকার ভবনও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
চিকিৎসার আশায় মানুষ হাসপাতালগুলোতে আসেন, মৃত্যু আতঙ্কের জন্য নয়। তাই রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোকে অগ্নিনির্বাপক ঝুঁকি থেকে নিরাপদ করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও। হাসপাতালগুলোকে অগ্নিনির্বাপক ঝুঁকি থেকে রক্ষায় সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই প্রতিটি হাসপাতালের ফায়ার সেফটি অডিট সম্পন্ন করে কোথায় কোথায় ঝুঁকি রয়েছে তা নির্ধারণ করা জরুরি। পুরনো বৈদ্যুতিক লাইন, নষ্ট সুইচ বোর্ড ও শর্ট সার্কিটের সম্ভাব্য স্থানগুলো দ্রুত সংস্কার করতে হবে। হাসপাতালভিত্তিক স্থায়ী ফায়ার ইউনিট গঠন এবং প্রতিটি ভবনে কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন অপরিহার্য।
সরকার ইচ্ছা করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ উদ্যোগে হাসপাতাল কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে, যাতে দুর্ঘটনার সময় তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। পাশাপাশি প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালকে ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট নবায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত। যাতে নিয়মিত তদারকিতে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা সম্প্রসারণ প্রকল্পে অগ্নিনিরাপত্তা খাতে আলাদা বাজেট বরাদ্দ রাখা উচিত। আমরা মনে করি, সরকারের এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো আগুনের ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে, মানুষের জীবনও রক্ষা পাবে। শুধু রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোই নয়, দেশের সকল হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হোক।