× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতির সদরে-অন্দরে

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়া

আবির মাহমুদ

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:০৯ এএম

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়া

 শেষ-পর্ব

দীর্ঘ ১৯ বছর যদি কেউ বঞ্চিত থাকে তবে সেটা ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু বিস্মিত করার মতো হলেও এটাই সত্যি যে, গত ৫ আগস্টের পর বেগম খালেদা জিয়া কোনো রাগ, ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। একবারের জন্যও বলেননি এই দেশটা যাদের নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছেÑ আমি তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আহ্বানে, বলিষ্ঠ নেতৃত্বে হাজার হাজার বীর বাঙালি অস্ত্র ধরে, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেশটা স্বাধীন করেছেন। গণতন্ত্রের জন্য, এদেশের মেহনতি, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, তাদের আর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য রাজনীতি করতে গিয়ে আমি স্বামী হারিয়েছি, সন্তানদের আদর, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছি, জীবনের শেষ সময়টা কারাগারে কাটিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবাধিকারটুকু পর্যন্ত আমি পাইনি। তিনি বলেননি কারণ এটাই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এটাই তার ব্যক্তিত্ববোধ। 

বেগম খালেদা জিয়া যে ঠিক কেমন সে সম্পর্কে চলতি বছরের জুন মাসে প্রকাশিত ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ নামক বই থেকে কিঞ্চিৎ উল্লেখ করার প্রয়োজনবোধ করছি। বইটির লেখক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাক্তন প্রেস সচিব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি যার লেখার ভক্ত প্রিয় মারুফ কামাল খান। তার সৌভাগ্য হয়েছে দীর্ঘদিন ম্যাডামের সঙ্গে কাজ করার। তার বয়ানে বেগম খালেদা জিয়া কেমন তা তুলে ধরার চেষ্টা করব। বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে মারুফ কামাল খান একটা ডিসক্লেইমার দিয়েছেন এভাবেÑ আমি নিজে একজন সামান্য লেখক-সাংবাদিক। দলীয় রাজনীতির পদ-পদবির বাইরে থাকলেও আমার নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসগত একটা অবস্থান রয়েছে এবং সেটা বেশ শক্ত। আমি একটা সময়ে দলীয় না হলেও রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করেছি। সে কারণে আমার একটা রাজনৈতিক বলয়ভুক্ত পরিচয়ও গড়ে উঠেছে। এমন বিশ্বাস ও পরিচয় ধারণ করে রাজনৈতিক ঘটনা ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে লিখতে গেলে নির্মোহ ও পক্ষপাতমুক্ত থাকা বেশ কঠিন। কিন্তু আমি আমার গল্পগুলোয় পুরোপুরি নির্মোহ বা পক্ষপাতহীন না হলেও সত্যনিষ্ঠ থাকার শতভাগ চেষ্টা করেছি। সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি রাজনৈতিক কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নিয়ে না লিখবার। আমি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যতদূর সম্ভব এড়িয়ে ঘটনা বলে গেছি। পাঠককে সুযোগ ও স্বাধীনতা দিয়েছি তার নিজের মতো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছার। 

একজন লেখক হিসেবে নিজের লেখা, রাজনৈতিক আদর্শ পাঠকদের নিকট তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই যে, অকপট স্বীকারোক্তি বা বিনয় সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। প্রিয় লেখককে খাটো করার বিন্দুমাত্র অভিপ্রায় আমার নেই। কিন্তু কেন জানি মনে হয়, হয়তো বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই বিনয়ের এই গুণটি তিনি পেয়েছেন। আবার এমনও হতে পারে তিনি আগেই বিনয়ী ছিলেন ম্যাডামের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তা আরও শক্তিশালী হয়েছে। কথায় আছে, ভদ্রতা-বিনয় পেতে হলে ভদ্র-বিনয়ী হতে হয়। যাই হোক, মারুফ কামাল খানের একটা বিষয় অসাধারণ লেখেছে। তিনি বইটা শুরু করেছেন ‘একটি ঐতিহাসিক বিবৃতির গল্প’ শিরোনামে একটি লেখা দিয়ে। শিরোনাম থেকেই কিছুটা আন্দাজ করা যায় যে লেখাটা কি নিয়ে হতে পারে। 

২০০৭ সালের সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (ওয়ান-ইলেভেন বা এক এগারোর সরকার নামে পরিচিত) ৩ কোটি টাকা চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। গ্রেপ্তারের পরদিন সংবাদপত্রে তার ছবি ছাপা হয়েছিল। রাজনীতিক সহকর্মীর এমন ছবি দেখে খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বলা চলে বিক্ষুব্ধও হয়েছিলেন তিনি। শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। সেই বিবৃতির গল্প করতে গিয়ে মারুফ কামাল খান তার বইতে উল্লেখ করেন, তিনি (বেগম খালেদা জিয়া) বললেন : এটা কি ঠিক হয়েছে? তার সঙ্গে এমন আচরণ করা চলে? সে এক্স প্রাইম মিনিস্টার এবং এক্স অপজিশন লিডার। একটা বিরাট পলিটিক্যাল পার্টির চিফ। একজন ন্যাশনাল লিডারের মেয়ে। একজন সিনিয়র সিটিজেন এবং সবকিছুর ওপরে একজন ডিগনিফায়েড লেডি। এই আচরণ কি সে ডিজার্ভ করে? খুবই কুৎসিত আচরণ করেছে। 

আমার খুব খারাপ লেগেছে ছবিটা দেখেই। এটা মোটেও ঠিক হয়নি। আদালত এলাকায় তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা উচিত ছিল। এখন মিলিটারি ব্যাকড গভর্নমেন্ট। আর্মিতে মেয়েদেরকে একটা আলাদা সম্মানের চোখে দেখা হয়। এরা কি সেই কালচারটাও নষ্ট করে ফেলবে? আমি (মারুফ কামাল খান) প্রশ্ন করলাম : মুক্তির দাবিও জানাব? ম্যাডাম জিয়া বললেন : কেন নয়? সে তো আর পালিয়ে যাবে না। তাকে জামিনে মুক্ত রেখেও তো মামলা চালানো যায়। একটু থেমে তিনি আরও বললেন : দেখেন, এগুলো কোনো মামলা? করতে হয় করেছে। জোর করে কাউকে দিয়ে অভিযোগ আনা কোনো ব্যাপারই নয়। এসব অভিযোগ ও মামলা-মোকদ্দমার একটাই উদ্দেশ্য, হেনস্থা করা। শেখ হাসিনার পর তো আমরা সরকারে ছিলাম। কই তখন তো কেউ এই অভিযোগ নিয়ে আসেনি। এতদিন পরে এই অভিযোগ কেন? বইতে আরও উল্লেখ করা হয়ে যে, এই বিবৃতি প্রকাশের পর রিপোর্টারেরা এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তখনকার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন : তিনি (বেগম জিয়া) একজন মহান নেত্রী এবং একজন মহান নেত্রীর মতোই তিনি তার স্টেটমেন্ট দিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়া কেমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, তার নৈতিকতাবোধ ও বিবেক কতটা জাগ্রত তা অনুধাবন করা যায় আরেকটা ছোট্ট ঘটনায়। দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি ঠিক কতটা উদারÑ এই ঘটনা তারও সাক্ষ্য দেয়। এমন একটা বিষয় বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে উপস্থাপনের জন্য বইটির লেখক অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য। ‘সৌজন্যের বিনিময়ে’ শিরোনামে লেখা অধ্যায়ে লেখক বলেন, শিল্প-বাণিজ্য গোষ্ঠী ট্রান্সকম-এর চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার আত্মীয়। সম্পর্কও ভালো ছিল তাদের। ভদ্রলোক মাঝেমধ্যে দেখা করতে আসতেন। তার বিনয় ও ভদ্রতায় আমরা সকলেই মুগ্ধ ছিলাম। ম্যাডাম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকতে তার সঙ্গে বিজনেস ডেলিগেশনের মেম্বার হয়ে তিনি কয়েকবার বিদেশ সফরেও গিয়েছেন। লতিফুর রহমানের মালিকানার প্রভাবশালী দুটি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। দুই কাগজই ম্যাডাম জিয়ার গভর্নমেন্ট ও বিএনপির বিরুদ্ধে মুখিয়ে থাকত। তো একদিন আমি সুযোগ পেয়ে বললাম, ম্যাডাম, লতিফুর রহমান সাহেব তো আপনার আত্মীয়। তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কও ভালো। তিনি তো আসেন মাঝে মাঝে। উনার কাগজে এত বিরোধিতা কেন? আপনি তো উনাকে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন। ম্যাডাম বললেন, লতিফুর রহমানকে কেন? কিছু যদি বলতে হয় তবে মতি-মাহফুজকে (সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম) বলব। তারাই তো পত্রিকা চালায়। 

পত্রিকার পেশাগত বিষয়ে এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় মালিককে হস্তক্ষেপ করতে বলা কি আমার উচিত হবে? ক্ষমতার চেয়ারে বসে থেকেও পত্রিকার পেশাগত দিক এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার এই যে উদারতাÑ এমন আচরণই তাকে মহৎ করে তুলেছে। প্রচার-প্রচারণায় বিএনপি অনেক আগে থেকেই পিছিয়ে। সেটা হোক মূলধারায় গণমাধ্যম বা ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। পূর্বের মতো বর্তমান সময়ে রাজনীতিক বয়ান তৈরিতেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তারপরও পত্রিকার পেশাগত দিক এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার বিষয়ে দেশনেত্রীর উদার, নমনীয় আচরণÑ ইতিবাচক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য, দেশের আগামী প্রজন্মের তরুণ রাজনীতিকদের জন্য শিক্ষণীয়।  

দীর্ঘ ১৯ বছর শোষণ-বঞ্চনা সহ্য করেও বেগম জিয়ার বলিষ্ঠ উচ্চারণ- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। তিনি বলেননি, আমরাই এই জুলাইয়ের বড় স্টেকহোল্ডার। ক্ষমতায় বা পদে না গিয়ে পোদ্দারি করার কথা তিনি উচ্চারণ করেননি। সেইসঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের শহীদদের শ্রদ্ধা এবং আহতদের সমবেদনা জানাতে তিনি ভুল করেননি। গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজনীতি নিয়ে দেশের তরুণ ও সাধারণ মানুষের যে জন-আকাঙ্ক্ষা তা বুঝতেও ভুল করেননি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।


আবির মাহমুদ

কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা