× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের এশিয়া সফর বিশ্ববাণিজ্যে কী বার্তা দেয়

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:০৬ এএম

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:২০ পিএম

নিরঞ্জন রায়।

নিরঞ্জন রায়।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করার পর এই প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময়ের জন্য এশিয়া সফরে এসেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এবারের মালয়েশিয়া সফরের উপলক্ষ আসিয়ান সম্মেলন হলেও মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত উচ্চশুল্ক হারের কারণে বিশ্বব্যাপী যে অস্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ বিরাজ করছে, সেই প্রেক্ষাপটে কিছু গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করাও ট্রাম্পের এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। এই সফর নিয়ে এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তাতে আমেরিকা ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া এবং কম্বোডিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বা ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পাদনে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা (ট্রেড ফ্রেমওয়ার্ক) সম্পন্ন করতে পেরেছে। এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিংয়ের মধ্যে সরাসরি আলোচনা।

এবার ট্রাম্পের এশিয়া সফর এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি ছিল এই সফরের দিকে। কেননা ট্রাম্পের উচ্চশুল্কের অস্ত্র নির্বিচারে প্রয়োগ করার কারণে বিশ্বব্যাপী যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার তীব্রতা কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেলেও বিশ্ববাণিজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। এদিকে উচ্চশুল্ক হারের নেতিবাচক প্রভাব আমেরিকার অর্থনীতিতে, বিশেষ করে রিটেইল মার্কেটে বা ভোক্তাদের মাঝে বেশ ভালোভাবেই পড়েছে। এশিয়া হচ্ছে ইমার্জিং অর্থনীতির অঞ্চল, যার সঙ্গে আমেরিকার অর্থনীতির সংযোগ আছে। বিশেষ করে, আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে সস্তায় ভোগ্যপণ্য সরবরাহের অন্যতম উৎস হচ্ছে এশিয়া। ফলে আসিয়ান সম্মেলন উপলক্ষে ট্রাম্পের সফরের গুরুত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি এবং এই সফরের প্রভাব ইতোমধ্যে পরিলক্ষিতও হয়েছে। যেমন, ট্রাম্পের এশিয়া সফর এবং আসিয়ান দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য সমঝোতা সম্পন্ন, বিশেষ করে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি সাক্ষাতের খবরে এশিয়ার সব শেয়ার মার্কেটে মূল্যসূচক বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি আমেরিকা এবং ইউরোপের অধিকাংশ স্টক মার্কেট ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এর পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে অধিকাংশ এশিয়ান কারেন্সির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, যা বেশ ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, ট্রাম্পের এশিয়া সফর এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা সম্পন্নের কারণে আসলেই কি বিশ্ববাণিজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে শুরু করবে কি না। এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আছে কি না আমার জানা নেই। কেননা শুরু থেকে ট্রাম্প তার উচ্চ হারের শুল্ক যেভাবে প্রয়োগ করেছেন, তা এক কথায় অকল্পনীয় এবং মানুষের হিসাবনিকাশের বাইরে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমেরিকার এই শুল্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনোরকম সামঞ্জস্য এবং ধারাবাহিকতা নেই। এক মুহূর্ত একরকম সিদ্ধান্ত এবং পরের মুহূর্তেই আরেক রকম সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া একেক দেশের ক্ষেত্রে একেক রকম সিদ্ধান্ত। এমনকি বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে শুল্ক হ্রাসের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার কার্যকারিতাও সেরকম দৃশ্যমান মনে হয় না। 

ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং এশিয়া সফরের পিছনে যে উদ্দেশ্য, তা বিশ্লেষণ করলে যে ধারণা পাওয়া যায় তা হচ্ছে, ১. আমেরিকার সঙ্গে যেসব দেশের ঋণাত্মক বাণিজ্য ঘাটতি আছে, তা কমিয়ে আনা, ২. এসব দেশ এবং দেশের কোম্পানিগুলোকে আমেরিকায় অধিক হারে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা, ৩. অধিক পরিমাণে আমেরিকা থেকে আমদানি করা এবং ৪. মূল্য কারসাজির মাধ্যমে আমেরিকার রপ্তানি মূল্য হ্রাস না করা। এই উদ্দেশ্যগুলো এতটাই জটিল যে অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এগুলো কার্যকর করা মোটেই সম্ভব নয়। প্রথমত, আমেরিকা থেকে অস্ত্র এবং ভারী যন্ত্রাংশ বাদ দিলে আমদানি করার মতো কিছু নেই। যেসব পণ্য আমদানি করা সম্ভব, সেগুলোর মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এত বেশি যে সেসব পণ্য আমদানি করা এশিয়া বা উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে সুবিধাজনক হবে না। দ্বিতীয়ত, আমেরিকার অর্থনীতি এত বিশাল যে সেখানে শত শত বিলিয়ন ডলারের নিচে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া যেসব খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে, সেখানে উন্নয়নশীল বিশ্বের পারদর্শিতা নেই বললেই চলে। আবার, যেসব খাতে পারদর্শিতা আছে, সেসব খাতে আমেরিকায় বিনিয়োগ করে মোটেই লাভজনক হবে না। যেমনÑ বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারীদের এই খাতে যথেষ্ট দক্ষতা এবং পারদর্শিতা আছে। কিন্তু আমেরিকায় তো এই খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। কেননা আমেরিকায় এই খাতে বিনিয়োগ করলে লাভের থেকে ক্ষতি বেশি হবে এবং সেই সঙ্গে সেখানকার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। 

থাইল্যান্ডের এয়ারলাইন থাই এয়ারওয়েজ কিছু বোয়িং এয়ারক্রাফট ক্রয়ের সক্ষমতা রাখলেও, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং মালয়েশিয়ার এয়ারলাইনের খুব বেশি বোয়িং এয়ারক্রাফট ক্রয়ের প্রয়োজন নেই। এমনকি বাংলাদেশের এয়ারলাইন বিমান বাংলাদেশেরও খুব বেশি বোয়িং এয়ারক্রাফট ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা নেই। ফলে এসব দেশ চাইলেও তো আমেরিকা থেকে আমদানি বৃদ্ধি করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে ঋণাত্মক বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বাণিজ্য ঘাটতির উন্নতি না হলে আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক হার কমাবে না। এর ফলে বাড়তি শুল্কের প্রভাবে উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়ার দেশগুলোর আমেরিকায় রপ্তানি হ্রাস পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পরিমাণও কমে যাবে। এর প্রভাবে এসব দেশের আমদানির পরিমাণও কমে যাবে, যার প্রভাবে আমেরিকা থেকে আমদানির সুযোগ আরও হ্রাস পবে। এ এক বাণিজ্য ঘাটতির দুষ্টচক্রে আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা। 

এই বিষয়গুলো আমেরিকার মতো বিশ্বের সেরা দেশের নীতিনির্ধারকরা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যে জানেন না, তেমন নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জেনেও কেন ট্রাম্প এমন করছেন। এখানেই ট্রাম্পের সঙ্গে অন্যান্য প্রেসিডেন্টের পার্থক্য। আমেরিকা সব সময়ই বিশ্বে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বজায় রাখতে পছন্দ করে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এমনকি লাতিন আমেরিকার কোনো না কোনো অঞ্চল বা দেশে উত্তেজনা লেগেই থাকে এবং এসব উত্তেজনা আমেরিকা বেশ ভালোই পছন্দ করে। ট্রাম্প যেহেতু নিজে একজন ব্যবসায়ী ব্যক্তি, তাই তিনি সেভাবে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা খুব বেশি পছন্দ করেন না। এ কারণে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের সময় স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৯ মাস অতিবাহিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলমান যুদ্ধ, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হননি। অতি সম্প্রতি ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধ হলেও অনেক সময় লেগে গেছে এবং প্যালেস্টাইন প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে এ কথা ঠিক যে বিশ্বে সামরিক যুদ্ধের উত্তেজনা অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের উত্তেজনা কমে গেলেও, আরেক ধরনের উত্তেজনা ঠিকই দেখা দিয়েছে এবং তা হচ্ছে বাণিজ্য উত্তেজনা।

ট্রাম্প অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ ছাড়াই বিশ্বে উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাখতে পেরেছেন। আর এই উত্তেজনা সৃষ্টির উপায় হিসেবে উচ্চ হারে ট্যারিফ আরোপের সিদ্ধান্তকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। যুদ্ধ ছাড়াও সমগ্র বিশ্বকে যে এক উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্যে ফেলে রাখা যায়, তা ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। 

ট্রাম্পের এশিয়া সফর আসলেই উচ্চশুল্ক হার সমস্যার সমাধান করে বিশ্ববাণিজ্যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করবে কি না, তা এই মুহূর্তে বলা বেশ কঠিন বা প্রায় অসম্ভব। তবে এই সফরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ এবং বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মধে যে আশার আলো দেখা দিয়েছে, সেটা এই মুহূর্তের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। এই ইতিবাচক ধারণার পিছনে যে স্টক মার্কেটের মূল্য সূচকের ঊর্ধ্বগতি এবং অনেক এশিয়ান কারেন্সির ডলারের বিপরীতে মূল্যবৃদ্ধিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। শেয়ারবাজার এবং কারেন্সি মার্কেট খুবই সংবেদনশীল এবং যেকোনো ঘটনার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। তাই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে এশিয়া সফর করছেন এবং সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং শুল্ক নিয়ে আলোচনা করবেন, এই সংবাদ স্টক মার্কেট এবং কারেন্সি মার্কেটকে প্রভাবিত করবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সফরের কারণে উচ্চশুল্ক হার সমস্যার সমাধান হবে এবং বিশ্ববাণিজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবেÑ এমন সম্ভাবনা খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। উল্টো আরও কিছুদিন যে এই উচ্চশুল্ক অব্যাহত থাকবে এবং বিশ্বে বাণিজ্য উত্তেজনাও বজায় থাকবে, সেটি বিবেচনায় রেখেই আমেরিকায় যারা পণ্য রপ্তানি করে, তাদের রপ্তানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং সে অনুযায়ী রপ্তানি কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।


নিরঞ্জন রায়

সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা