প্রতারণা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:০১ এএম
ভেজাল ও মানহীন খাদ্যপণ্যে বাজার ছেয়ে গেছে আমাদের দেশে। সম্প্রতি বাজারে ‘মথ’ নামের নিম্নমানের ডালে রঙ মিশিয়ে ‘মুগ ডাল’ হিসেবে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চকচকে সোনারঙা মুগ ডালেও ভেজাল! এ এক ভয়াবহ প্রতারণা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। ভোক্তা মুগ ডাল ভেবে এই ভেজাল ডাল কিনে খাচ্ছেÑ অথচ জানে না, সেই ডালের রঙে রয়েছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। যা ধীরে ধীরে শরীরে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। এই তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএসএফএ)।
২৯ অক্টোবর, বুধবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘মথ’ নামক ডালের সঙ্গে হলুদ রঙ মিশিয়ে ‘মুগ ডাল’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে মুগ ডালের তুলনায় মথ ডাল দ্বিগুণ পরিমাণে আমদানি হলেও বাজারে মথ নামে কোনো ডাল পাওয়া যায়নি। কিন্তু স্থানীয় বাজারে মুগ ডাল নামে বিক্রি হওয়া ডালের সংগৃহীত নমুনার অর্ধেকের বেশিতে হলুদ রঙ মেশানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। হলুদ (টারট্রাজাইন) রঙে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় তা ডালে ব্যবহার অনুমোদিত নয়। বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবসায়ীদের রঙযুক্ত ডাল আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয় থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তাকে মুগ ডাল কেনার সময় বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আসলে মথ ডাল আর মুগ ডালের মধ্যে বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকলেও গুণগত পার্থক্য অনেক। মথ ডাল তুলনামূলক সস্তা এবং সহজলভ্য। আর মুগ ডাল দামি ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় সস্তা মথ ডালকে হলুদ রঙে রাঙিয়ে মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি করছে। এসব রঙ বেশিরভাগ সময় শিল্পজাত, যা খাদ্যপণ্যে ব্যবহার উপযোগী নয়। চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরে এ-জাতীয় রাসায়নিক প্রবেশ করলে লিভার, কিডনি ও পাকস্থলীতে জটিল রোগের জন্ম দিতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে, শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্টÑ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকি দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এই ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শরীর ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়।
খাদ্যে খাবার অনুপযোগী রঙ মেশানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বাজার ব্যবস্থায় এখনও পর্যাপ্ত আইনি নজরদারি গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় হাটবাজার থেকে শুরু করে বড় বড় পাইকারি আড়ত পর্যন্ত কোথাও তেমন কঠোর তদারকি দেখা যায় না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয় না।
অথচ দেশে খাদ্যে ভেজাল রোধে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছেÑ খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং দণ্ডবিধি ২৭২ ধারা। এসব আইনে খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানো বা ভেজাল বিক্রি করলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও তদারকির ঘাটতি থাকায় অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত বাজার তদারকি ও ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ রোধ করা দরকার। একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতন হয়ে এসব প্রতারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। মুগ ডালের রঙ যদি অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা কৃত্রিম মনে হয়, তাহলে সেটি না কেনাই উত্তম। একমুঠো ডাল পানিতে ভিজিয়ে দেখলে রঙ ছড়ায় কি নাÑ তা সহজেই বোঝা যায়। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রতারণা সম্পর্কে প্রচার বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে মানুষ প্রতারিত না হয়। পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি তদারকি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিও ভেজালের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে পারে।
আমরা মনে করি, দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। খাদ্যে রঙ মেশানো বা পরিচয় গোপন করে বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইনের সঠিক ব্যবহারই পারে এই স্বাস্থ্যবিধ্বংসী ভেজাল বাজার বন্ধ করতে। আমরা চাই, কেবল শাস্তির ভয়ে নয়, নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই ব্যবসায়ীদের খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করা উচিত।
মনে রাখা জরুরি, খাদ্য কেবল পেট ভরানোর উপকরণ নয়, এটি আমাদের জীবনের জ্বালানি। সেখানে যদি বিষ মেশানো হয়, তাহলে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই মথে রঙ মিশিয়ে মুগ ডাল বিক্রির মতো ভয়াবহ প্রতারণা রোধে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাÑ সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। সুরক্ষিত খাদ্যই নিরাপদ জীবনের প্রথম শর্তÑ এ সত্যটি সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে।