× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতির সদরে-অন্দরে

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়া

আবির মাহমুদ

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়া

(প্রথম-পর্ব)

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি সাধারণ মানুষের প্রাণের নেত্রী। গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের এক আপসহীন নারী। গণমানুষের ভোটে নির্বাচিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদের প্রাক্তন বিরোধীদলীয় নেত্রী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপির) চেয়ারপারসন। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। কত পরিচয়ই তার পরিচয় দেওয়া যায়। কিন্তু এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে, লক্ষ-কোটি বাঙালির কাছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পরিচিত এক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারী হিসেবে। একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে। ভীষণ রকমের স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া শুধু শব্দের ব্যবহারেই যে মার্জিত তা নন। কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা বাক্যবাণ করার ক্ষেত্রেও প্রচণ্ড রকমের সচেতন। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে যেখানে ব্রাউজারে খোঁজ করলেই কত কিছু জানা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনীতিকদের কত রকম বেসামাল ভাইরাল বক্তব্য পাওয়া যায়। কিন্তু এটা সত্যিকার অর্থেই একটা বিস্ময়ের বিষয় যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পক্ষ-প্রতিপক্ষকে আঘাত করে কুরুচিপূর্ণ বাক্যবাণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পেরেছেন। একজন রাজনীতিক হিসেবে বিশেষ করে, নারী হিসেবে তার এমন মার্জিত আচরণ, মূল্যবোধ ও বিনয় নিয়ে গবেষণা হতে পারে এবং তা হওয়া উচিত। 

স্থান, কাল, পাত্র নির্বিশেষে এই দেশে কত রাজনীতিবিদকেই তো আমরা দেখলাম। কিন্তু বেগম জিয়ার ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধ এক কথায় পাহাড়সম। তার ধারেকাছেও যেন কেউ নেই! এ কথা বলতে কোনো অত্যুক্তি নেই, বেগম খালেদা জিয়া যে একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী, অন্যদের থেকে অতুলনীয়Ñ তা অনেকটা বিনা বাক্যব্যয়েই সবাই মেনে নেন। রাজনীতিতে নানা মুনির নানা মত থাকতে পারে। আদর্শের বিচারে ভিন্ন ভিন্ন রাজনীতিক বয়ান তৈরি করতে পারে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে। এদেশের রাজনীতিতে এত উত্থান-পতন সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনোরকম উদ্ধত, দুর্বিনীত আচরণ পরিলক্ষিত হয়নি। 

রাজনীতি সচেতন যে কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়Ñ গত ১৯ বছর ধরে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিতকে। তাহলে নির্দ্বিধায় যে নামটি সবার আগে আসবে তা হলো বেগম খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শারীরিক ও মানসিক নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বালি বোঝাইকৃত ট্রাক দিয়ে পথ আটকে চলাফেরার মতো সাংবিধানিক অধিকার যেমন তার ক্ষেত্রে লঙ্ঘন করা হয়েছে, তেমনি তার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সন্তানদের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত প্রিয় ঠিকানা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে, আশ্রয় কেড়ে নিয়ে মৌলিক মানবাধিকার পর্যন্ত লঙ্ঘন করা হয়েছে। ফরমায়েশি রায়, আইন, আদালতের জুজু দেখিয়ে চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবাধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। তার বাকস্বাধীনতা হরণ করে গৃহবন্দি করেও রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন কারাগারে রেখে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া যে- একাধিকবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রী, বিএনপির মতো দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন, স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, রাষ্ট্রের সিনিয়র সিটিজেন ও একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সম্মানিত নারী কোনো পরিচয়ই তার ক্ষেত্রে আমলে নেওয়া হয়নি। এত পরিচয় সত্ত্বেও তাকে কম নির্যাতন, নিপীড়ন করা হয়নি। 

অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! গণঅভ্যুত্থানে ভীত হয়ে ‘স্বৈরাচার’ তকমা নিয়ে সেই নির্যাতনকারীকেই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। আশ্রয় নিতে হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর! সময়ের পরিক্রমায় তাকেই আজ জনগণ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। জনরোষে প্রাণভয়ে ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযমী আচরণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তা গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করে তোলে। সেদিক থেকে বেগম খালেদা জিয়া আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চার আদর্শ। একজন রাজনীতিক হয়েও তার এমন সহনশীল, মার্জিত, অনুকরণীয় আচরণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামষ্টিক আচরণের জন্য শিক্ষণীয়। আমাদের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক, অনুপ্রেরণামূলক। 

রাজনৈতিক শিষ্টাচার, গণতান্ত্রিক আচরণ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ কেমন হওয়া উচিত তার কয়েকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইতে তুলে ধরেছেন লেখক ও সাংবাদিক মারুফ কামাল খান। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ভাষা কেমন হওয়া উচিত। আমাদের পূর্বেকার রাজনীতিকরা এ ক্ষেত্রে কেমন ছিলেন। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে তারা কি ধরনের শব্দ চয়ন করতেন তা কিছুটা অনুমান করা যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী ছিলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তিনি ‘কথার জাদুকর’ বলে খ্যাত ছিলেন। বইটির লেখক মারুফ কামাল খানও তাকে যাদু ভাই বলে সম্বোধন করতেন। তো একবার মশিউর রহমান যাদু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বঙ্গবীর জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী সাহেবকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। মারুফ কামাল খান তার বইয়ের ‘জেনারেল ওসমানীর ফিল্ডমার্শাল কুকুর’ শিরোনামের অধ্যায়ে সেই গল্প তুলে ধরেছেন। বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি  লেখেন, ‘যাদু ভাই বলেন, ওসমানী সাহেব জীবনে ঘর-সংসার করেননি। একটা সংসার চালাবার যোগ্যতা যার হয়নি তিনি যে একটা দেশ চালাতে পারবেন না, সেটা তিনি নিজেও জানেন। তাই এ নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। শুধু বলব, জীবনে একটা এতিম বাচ্চাও তো পালতে পারতেন। তার বদলে তিনি পোষেন কুকুর। তার মানে তিনি মানুষের বন্ধু নন। তার বন্ধু তো কুকুর’। 

মশিউর রহমান যাদু মিয়ার কটাক্ষ করে দেওয়া এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানী। সে প্রতিক্রিয়ায়ও এক ধরনের রসবোধ ছিল। ধররে, মাররে প্রতিক্রিয়া ছিল না। ওসমানী সাহেবের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে মারুফ কামাল বলেন, সে দিন সন্ধ্যায় পুরনো ডিওএইচএস-এর ৬ নম্বর বাসায় ক’জন সিনিয়র সাংবাদিক গিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানীর কাছে যাদু ভাইয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া জানতে। জেনারেল সাহেব তার সেই ভাড়া বাসার দেড়তলার ছোট্ট বসার ঘরে ফিল্ডমার্শাল ও ইন্দিরাকে দু’পাশে রেখে তাদের গায়ে আদরের হাত বুলিয়ে বলেন : ‘কি হে, তোমরা তো বিখ্যাত হয়ে গেছো। আজ পাব্লিক মিটিঙে সেয়ানা মন্ত্রী (সিনিয়র মিনিস্টার পদবিকে বিদ্রুপ করে) তোমাদেরকে নিয়ে লম্বা ভাষণ দিয়েছেন।’ অবশ্য পরে জনতা পার্টির পক্ষ থেকে ওসমানী সাহেবের কুকুর পালনের বিষয়ে ব্যাখ্যামূলক একটা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল বলে বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক শিষ্টাচার, গণতান্ত্রিক আচরণ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ কেমন হওয়া উচিতÑ এমন আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায় মারুফ কামাল খানের বই থেকে। ‘মিজান চৌধুরীর গোলপোস্ট’ শিরোনামের অধ্যায়ে এই প্রসঙ্গের অবতারণা রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মিজান চৌধুরী ও সাজেদা চৌধুরীর একটা বক্তব্যের উল্লেখ করা হয় বইয়ে। মারুফ কামাল খান বলেন, মিজান চৌধুরী বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিরোধিতাকে লঘু করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে শহীদ জিয়ার ও শেখ সাহেবের খানিক প্রশংসা করে নিতেন। তারপর আসল বক্তব্য পাড়তেন। তার এই ভূমিকার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী একদিন সংসদে বিদ্রুপ করে বললেন, ‘মিজান চৌধুরী সাহেব যখন বক্তৃতা করতে দাঁড়ান তখন আমার মনে পড়ে পাগলা ফুটবলার রাজা মিয়ার কথা। রাজা মিয়ার পায়ে বল গেলে দু’দিকের গোলকিপারকেই সামাল থাকতে হতো। কারণ, রাজা মিয়া যে কখন কোন দিকে গোল দেবে তার কোনো ঠিক ছিল না।’ এরপর আত্মপক্ষ সমর্থনে মিজান সাহেব দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর নাম সাজেদা চৌধুরী। তাই এ নামের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। মিসেস সাজেদা চৌধুরী আমার সাবেক রাজনৈতিক সহচরী। সেই যৌবনকাল থেকে দুজনে আওয়ামী লীগ করেছি একসঙ্গে বহুকাল। আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার কোনো অভাব ছিল না। আজ দুঃখ পেলাম মিসেস চৌধুরীর এই অভিযোগ শুনে যে আমি নাকি সঠিক গোলপোস্ট চিনি না। অথচ মিসেস চৌধুরী নিজে খুব ভালো করেই জানেন যে, আমি সঠিক গোলপোস্ট খুব ভালো করেই চিনি এবং দক্ষ শটে আমি সঠিক জায়গাতেই গোল করতে জানি।’ এ সমস্ত বক্তব্য থেকে এটা খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে, আমাদের পূর্বেকার রাজনীতিকরা বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে রসবোধ সম্পন্ন ছিলেন। শব্দ চয়ন ও বাক্যবাণে প্রচণ্ড রকমের সচেতন ছিলেন। তারা পরমতসহিষ্ণু ও সহনশীল ছিলেন। সমালোচনা করার ক্ষেত্রে তারা শ্রদ্ধাবোধ সম্পন্ন ছিলেন। এখনকার মতো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন না। 

আবির মাহমুদ

কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা