অপচয় রোধ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৯ পিএম
বাংলাদেশ এখনও দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সহজ কথায়, আমাদের অবস্থান এখনও বিশ্বের ‘দরিদ্রতম’ দেশগুলোর কাতারে। এমন এক বাস্তবতায় জানা গেল, খাদ্য অপচয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এশিয়ার শীর্ষ ৫ দেশের একটি। সম্প্রতি ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনইপি) ‘ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স ২০২৪’ ও ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি) ২০২৫’-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যানটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। যেখানে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, সেখানে এভাবে খাদ্য অপচয় বা নষ্ট হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। পরিসংখ্যান বলছে, বছরে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশই নষ্ট হয়। এভাবে প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার অপচয় হচ্ছে, তা দিয়ে লাখ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষের মুখের আহার নিশ্চিত করা যেত। অপচয় রোধে প্রথমে দরকার সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ।
২৮ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘খাদ্য অপচয়ে এশিয়ার শীর্ষ পাঁচে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশের একটি বাড়িতে বছরে ৮২ কেজি খাদ্য নষ্ট হয়। খাদ্য নষ্টের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষস্থানে মালদ্বীপ। সেখানে পরিবারপ্রতি ২০৭ কেজি খাদ্য নষ্ট হয়। পাকিস্তানে হয় ১৩০, আফগানিস্তানে ১২৭, নেপালে ৯৩, বাংলাদেশ ৮২, শ্রীলঙ্কা ও চীনে ৭৬, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৩ ও ভারতে ৫৫ কেজি। অন্যদিকে গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস অনুযায়ী, ২০১৬-২০২৪ সাল পর্যন্ত ৮ বছর বিশ্বের যেসব দেশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার উচ্চস্তরে অবস্থান করছিল সেখানে বাংলাদেশ ছিল তৃতীয়। জিআরএফসির রিপোর্ট মতে, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার উচ্চস্তরে ছিল নাইজেরিয়ার মানুষ ৩১.৮ মিলিয়ন, সুদান ও কঙ্গোর ২৫.৬, বাংলাদেশের ২৩.৬, ইথিওপিয়ার ২২, ইয়ামেনের ১৬.৭, আফগানিস্তানের ১৫.৮, মিয়ানমারের ১৪.৪, পাকিস্তানের ১১.৮ মিলিয়ন। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের প্রস্তুতির পূর্বে পোস্টহার্ভেস্ট পর্যায়ে ধান নষ্ট হয় ১৭.৮০ শতাংশ। ফসল কাটার পর ধানের গড় ক্ষতি বা নষ্ট হয় ১৭.৮০ শতাংশ। ফসল কাটার আগে ক্ষতিসহ মোট ধানের ক্ষতি হয় ২৩ থেকে ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য হচ্ছে গম। কাটার পর এই গমের গড় ক্ষতি ১৭.৫৯ শতাংশ। ফল এবং শাকসবজি কাটার পর ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ধনী পরিবারগুলোতে খাদ্যের অপচয় সবচেয়ে বেশি হয়।
আসলে খাদ্য অপচয় একটি বৈশ্বিক সংকট। অপচয়ের মূল কারণগুলো আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। কৃষি উৎপাদনের পর সঠিক সংরক্ষণ ও পরিবহনের অভাবে বিপুল খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে শস্য, ফলমূল ও শাকসবজির একটি বড় অংশ সংগ্রহ ও বাজারজাত করার আগেই নষ্ট হয়। তাই সবার আগে প্রয়োজন খাদ্য অপচয় হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করা। লক্ষ্য করা গেছে, গ্রামীণ জনপদে খাদ্যপণ্যের বেশির ভাগ অপচয় ঘটে ফসল কাটা, সংরক্ষণ ও পরিবহণের সময়। আর শহরাঞ্চলে অপচয় বেশি হয় ভোক্তা পর্যায়ে-বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁগুলোয়।
খাদ্য কেবল ভোগের উপকরণ নয়, এটি মানবজীবনের মৌলিক অধিকার ও মানবতার প্রতীক। প্রতিটি দানা খাদ্যের পেছনে থাকে কৃষকের পরিশ্রম, প্রকৃতির দান এবং জাতির সম্পদ। তাই অপচয় মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি একধরনের সামাজিক অন্যায়ও। তাই দরকার রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি- সবার সম্মিলিত উদ্যোগে খাদ্য অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। না হলে ক্ষুধার্ত মানুষ বাড়বে, অন্যদিকে আমাদের বিবেক ও পরিবেশ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এভাবে খাদ্য অপচয় কাম্য নয়। আমরা মনে করি, উৎপাদন পর্যায়ে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এবং উপযুক্ত স্থানে ও তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে খাদ্যপণ্যের অপচয় অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। শহরের রেস্তোরাঁগুলোয় এবং সচ্ছল শ্রেণির মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিমাণে খাদ্য অপচয় হয়ে থাকে। এ প্রবণতা রোধে ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা ও নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজকেও। তবে আশার কথা, সরকার পোস্টহার্ভেস্ট পর্যায়ে খাদ্য অপচয় রোধে কৃষকদের কোল্ড স্টোরেজ ও মিনি কোল্ডস্টোরের ব্যবস্থা করেছে। এর মাধ্যমে সবজি, ফল ও অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়িয়ে খাদ্য অপচয় রোধে ভূমিকা রাখছে। দেশে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও নষ্টও হয় বেশি। এজন্য সরকার জলবায়ুর প্রতিকূল প্রশমনে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ‘অভিযোজন প্রকল্প’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এ ছাড়া অপচয় রোধে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর নানা কর্মসূচি পালন করছে।
আমরা মনে করি, খাদ্যের অপচয় না করে এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। নাগরিক যদি সচেতনভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে, তবে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এই ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের খাদ্যের মূল্য ও অপচয়ের ক্ষতি সম্পর্কে নিয়মিত শিক্ষা দেওয়া, একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে খাদ্য অপচয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। মনে রাখতে হবে, খাদ্যের অপচয় কেবল অর্থের অপব্যয়ই নয়, নষ্ট করা খাদ্য প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। খাদ্য অপচয় রোধ এবং ব্যয় কমাতে দরকার মিতব্যয় ও জনসচেতনতা।